পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্তের নতুন ভূরাজনীতি সাজেক সংকট এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব
দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্ত রাজনীতির গতিপথ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আঞ্চলিক ক্ষমতার টানাপোড়েন এবং ভূকৌশলগত হিসাব-নিকাশ এই অঞ্চলে এক নতুন উত্তাপের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার, চীন ও পাকিস্তানের অবস্থান বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে এই ভূখণ্ডের গুরুত্ব বহু গুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে সংঘটিত ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর ঢাকা ও দিল্লির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সনাতন রূপরেখায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। এই ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব এখন দৃশ্যমান আমাদের সংবেদনশীল সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে।
পূর্বে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অস্থিতিশীলতা এবং বার্মিজ মগ বাহিনী আরাকান আর্মির উত্থান বাংলাদেশকে এক নতুন নিরাপত্তা সংকটে ফেলেছে। তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দীর্ঘদিনের জটিল রোহিঙ্গা সমস্যা। অন্যদিকে, আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বহু পুরোনো অস্থিরতা নতুন রূপ ধারণ করছে। ঠিক এই উত্তাল প্রেক্ষাপটে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দিল্লির প্রশাসনিক ছক পরিবর্তন হয়েছে। একই সময়ে আমাদের খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির কোলঘেসে সাজেক উপত্যকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতির হঠাৎ অবনতি ঘটেছে। এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। এগুলো একই ভূরাজনৈতিক সুতোয় গাথা কি না—তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।
দীর্ঘ দুই দশক ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং বাংলাদেশের ভরাত-মিয়ানমান সীমান্ত নিরাপত্তা বিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। একজন সাংবাদিক ও গবেষক হিসেবে আমার অবস্থান সর্বদা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। দেশপ্রেম, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করার সুযোগ নেই। সেই নীতি থেকেই এই পুরো পরিস্থিতির একটি বস্তুনিষ্ঠ ও গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ তুলে ধরছি।
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মিজোরাম অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই রাজ্যটি একাধারে মায়ানমার এবং বাংলাদেশের পার্বত্য সীমানার সাথে যুক্ত। এখানকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতিগত আবেগ এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক গভীর ছাপ রয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে মিজোরামের স্থানীয় রাজনীতিতে এক বড় ধরনের রদবদল ঘটে। সাবেক আইপিএস কর্মকর্তা লালদুহোমা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। লালদুহোমা কেবল একজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাই নন, তিনি ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নিরাপত্তা প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৮৪ সালে আইপিএস চাকরি ছেড়ে তিনি মূলধারার রাজনীতিতে যোগ দেন এবং লোকসভার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। স্থানীয় মিজো জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাঁর বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের নজর সবচেয়ে বেশি কেড়েছে অন্য একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার মিজোরামের ২৫তম গভর্নর বা রাজ্যপাল হিসেবে ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব:) ভি. কে. সিংকে নিয়োগ দিয়েছে। একজন ঝানু সামরিক কৌশলবিদকে এমন স্পর্শকাতর স্থানে বসানো সাধারণ কোনো বিষয় নয়। সামরিক বিশ্লেষকরা এটিকে নিছক কোনো রুটিন প্রশাসনিক পদায়ন মনে করেন না।
ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ রক্ষাকারী কৌশলগত পথ হলো শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং মায়ানমারের গৃহযুদ্ধ মিজোরাম সীমান্তকে নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। দিল্লি এই সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কঠোর নীতি গ্রহণ করতে চায়। জেনারেল ভি. কে. সিংয়ের মতো উচ্চপদস্থ সামরিক ব্যক্তিত্বকে গভর্নর করার পেছনে দিল্লির সেই দূরবর্তী রণকৌশলই ফুটে ওঠে। বাংলাদেশ ও মায়ানমার সীমান্তঘেঁষা রাজ্যে সাবেক সেনাপ্রধানের এই উপস্থিতি নিশ্চিতভাবেই এক গভীর সামরিক ও রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।
এই আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের সরাসরি প্রভাব এসে পড়েছে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের কোলে গড়ে ওঠা সাজেক উপত্যকায়। সাজেক কেবল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পর্যটনকেন্দ্র নয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত সুরক্ষার এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ফ্রন্টলাইন।
বিগত হাসিনার সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে পার্বত্য অঞ্চল ও সাজেককে একধরনের বিশেষ প্রভাববলয়ে রেখে দেওয়ার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। কথিত ভূরাজনৈতিক সুরক্ষার নামে সেখানে রাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব চর্চাকে সংকুচিত করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের জনবিপ্লবের পর বাংলাদেশের মানুষের মনস্তত্ত্বে এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। এ দেশের সচেতন নাগরিকরা আজ আধিপত্যবাদবিরোধী চেতনায় উদ্বুদ্ধ। জনগণ আজ পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, কোনো বিদেশি শক্তির প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশ চলবে না। নতজানু পররাষ্ট্রনীতির দিন শেষ। বাংলাদেশ চায় নিজ পায়ে দাঁড়ানো এক মর্যাদাপূর্ণ ও শক্তিশালী স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থা।
এই রাজনৈতিক ও জনমানসের পরিবর্তনের ধাক্কাই হয়তো লেগেছে সাজেক ও তার আশপাশের পাহাড়ি জনপদে। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে যে সুপ্ত অশান্তি টিমটিম করে জ্বলছিল, তা হঠাৎ দাবানলে রূপ নিল কেন? সম্প্রতি সাজেক সড়কে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দফায় দফায় ভয়াবহ গোলাগুলি হয়েছে। সেখানে হাজার হাজার পর্যটক অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে গেছে। এই ঘটনাগুলোকে কেবল স্থানীয় চাঁদাবাজি বা অভ্যন্তরীণ কোন্দল বলে চালিয়ে দেওয়া মারাত্মক ভুল হবে।
গবেষণাধর্মী পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এই হঠাৎ অস্থিতিশীলতার পেছনে সীমান্তপারের গোপন কৌশলগত সমর্থন থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কোনো সুদূরপ্রসারী নকশা এখানে কাজ করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। ভারতে মিজোরামের নতুন কড়া নিরাপত্তানীতি এবং সাজেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আকস্মিক তৎপরতা বৃদ্ধির সময়ক্রম বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই বিষয়গুলোকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রামের এই নতুন পরিস্থিতির পেছনে মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক কারণও বিদ্যমান। অতীতে বাংলাদেশের পর্যটকদের একটি বড় অংশ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল কিংবা শিলিগুড়িমুখী ছিলেন। কিন্তু চব্বিশের বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে দেশের মানুষের মাঝে প্রবল স্বাজাত্যবোধ জেগে উঠেছে। ভারতের আগ্রাসী ও একপেশে নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে তরুণ প্রজন্ম দেশীয় পর্যটনকে আকঁড়ে ধরেছে। ফলে ভারতের পর্যটন ব্যবসায় ধস নেমেছে এবং সাজেকসহ আমাদের নিজস্ব পাহাড়ি অঞ্চলে পর্যটকদের ঢল নেমেছে।
সাজেক আজ কেবল প্রাকৃতিক বিনোদনের জায়গা নয়। এটি বাংলাদেশের নিজস্ব ভূখণ্ডের ওপর জনগণের পূর্ণ অধিকার ও জাতীয় আত্মমর্যাদার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আর ঠিক এই কারণেই একটি গোষ্ঠী সাজেককে অশান্ত করতে চাইছে। বিদেশি কোনো শক্তি বা তাদের স্থানীয় দোসররা চায় না যে বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের পাহাড়ি অঞ্চলের ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখুক। তারা চায় এই সীমান্ত অঞ্চলকে একটি চিরস্থায়ী বাফার জোন বানিয়ে রাখতে।
সামরিক ও সীমান্ত গবেষকদের মতে, মিজোরাম সীমান্ত দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের নিরাপদ রুট গড়ে উঠেছিল। সীমান্তপারের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর অবাধ যাতায়াতের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় থেকেই পার্বত্য অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে একাধিক চক্রান্ত হয়েছিল। তৎকালীন পূর্ব বাংলার সচেতন জনগণ ও স্থানীয় মাটি সেই চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়েছিল। আজও যখন মিজোরামে প্রশাসনিক শক্ত অবস্থান তৈরি হয়, তখন বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) ও সেনাবাহিনীসহ সশস্ত্র বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলের অভিযোগ অতি স্পষ্ট। বিগত আওয়ামী সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকে ভারতের সীমান্ত স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে একতরফা বিপুল ছাড় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার বিনিময়ে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা পায়নি। তিস্তা চুক্তি থেকে শুরু করে সীমান্ত হত্যা—সব কিছুতেই বাংলাদেশ বঞ্চিত হয়েছে। এর ফলে আমাদের সীমান্ত নিরাপত্তা এক বড় ধরনের শূন্যতার মুখে পড়েছিল।
তবে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে ক্ষমতার সমীকরণ বদলে গেছে। এ দেশের মানুষ প্রতিবেশীর সাথে সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক চায়। বন্ধুত্বের নামে দেশের ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব বা নিরাপত্তা বিকিয়ে দেওয়াকে এ দেশের মানুষ আর মেনে নেবে না।
পরিশেষে বলা যায়, সাজেকের বর্তমান সংকটকে নিছক কোনো স্থানীয় আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা হিসেবে দেখলে চরম ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর এক নতুন ভূরাজনৈতিক পরীক্ষা। সরকারকে অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি ইঞ্চিতে রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড়ি ও বাঙালি নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি সীমান্তপারের যেকোনো অশুভ চক্রান্ত শক্ত হাতে দমন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সাজেক আমাদের জাতীয় মানচিত্রের এক অবিচ্ছেদ্য মুকুট। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই মূলনীতিকে হৃদয়ে ধারণ করেই আমাদের সীমান্ত কূটনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল পরিচালিত হওয়া উচিত।
লেখক: এ এইচ এম ফারুক
সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক