পুলিশের ‘এনকাউন্টারে’ নিহত পুত্রের দেহ রাখা হাসপাতালে। বাইরে সকাল থেকে বসেছিলেন বাবা-মা। পাশে ঘিরেছিলেন পুলিশকর্মীরা। মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার খানিক পরে গাইঘাটার চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতাল হঠাৎ হইচই। এনকাউন্টারে নিহতের দেহ বার করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। এত ক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা মা ঝট করে উঠে দাঁড়ালেন। সামনে পুত্রের দেহ দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি। চিৎকার করে বলতে থাকলেন, ‘‘আমার কথা একবারও ভাবলি না! এ কী অন্যায় করলি বাবা...।’’ জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলেন বিছানায়।
নিহত পুত্রের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে। গাড়িতে তোলা হচ্ছে। গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে বাবা বললেন, ‘‘আমি খুব খুশি। যা হয়েছে, ঠিক হয়েছে।’’
এলাকার একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণ এবং খুনের অভিযোগে রবিবার গ্রেফতার হয়েছিলেন প্রহ্লাদ দাস। আদালত ১০ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছিল। সোমবার গভীর রাতে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য পুলিশ তাঁকে অকুস্থলে নিয়ে যাচ্ছিল। অভিযোগ, সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন প্রহ্লাদ। পুলিশের রিভলভার কেড়ে নিয়ে তিন রাউন্ড গুলিও চালিয়েছিলেন। পুলিশের ছোড়া পাল্টা গুলি লাগে প্রহ্লাদের বাঁ পায়ে এবং বুকে। মোট তিনটি। চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁকে। চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। সেই থেকে হাসপাতালে গিয়ে বসেছিলেন প্রহ্লাদের বাবা-মা।
প্রহ্লাদ এবং তাঁর বাবার দুটো দোকান ছিল বৈকুণ্ঠপুর বাজারে। সেলুন চালাতেন বাবা-ছেলে। নিম্ন মধ্যবিত্ত সংসার। মায়ের দাবি, ছেলে খুন-ধর্ষণের মতো এমন অপরাধ করে গ্রেফতার হয়েছিল বটে। কিন্তু তিনি তো কোনও প্রমাণ হাতে পাননি। এনকাউন্টার চাননি। কিন্তু পুলিশ বলল, পালাতে চাইছিল গুলি করে ছেলে। ‘‘তা হলে আর কী! ভাল হয়েছে’’, বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন মহিলা। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলেন। তার পর আবার বলেন, ‘‘আমার শিক্ষিত ছেলে... অন্যায় করেছে। শাস্তি পেল। পুলিশকেও বলেছি।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘আমার ছেলেকে তো পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। ওর কঠোর শাস্তি হোক চেয়েছিলাম। কিন্তু এনকাউন্টার চাইনি। বলল পালাচ্ছিল। এত গার্ড থাকতে কী ভাবে পালাচ্ছিল ও। পালাচ্ছিল নাকি! গুলি করেছে... যাক।’’
মহিলা জানান, রাত ২টোর সময় পুলিশ তাঁদের বাড়িতে গিয়েছিল। ছেলের সঙ্গে তাঁদের দেখা করিয়ে দেন আধিকারিকেরা। প্রহ্লাদের মা বলেন, ‘‘যে জামা-প্যান্ট আগে পরেছিল, সেগুলো আমাদের হাতে দিল পুলিশ। আমি কোনও কথা বলিনি।’’ খানিক বাদে সদ্য সন্তানহারা মায়ের মন্তব্য, ‘‘মা হিসেবে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু নাগরিক হিসেবে খুশি। আমার মেয়ের সঙ্গে এমন হলে তখন তো আমি শাস্তিই চাইতাম। আশা করব, আর কেউ যেন ঘৃণ্য কাজ না করে। ওর মতো কাউকে চলে যেতে না হয়।’’ আবার জ্ঞান হারিয়ে হাসপাতালের একটি বিছানায় পড়ে যান মহিলা।
পুলিশ সূত্রে খবর, ময়নাতদন্তের জন্য বারাসত মেডিক্যাল কলেজ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এনকাউন্টারে নিহতের দেহ। পুলিশ গাড়িতে উঠতে বলে প্রহ্লাদের বাবাকে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা প্রতিক্রিয়া চান তাঁর। প্রৌঢ় বলেন, ‘‘ উপযুক্ত কাজ হয়েছে। বিশাল খুশি হয়েছি আমি। আর কিছু?’’
