বর্তমান সরকারের ক্ষমতার প্রথমবারে সিলেটে ১০ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি সিলেট-১ আসনের এমপি। নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেক আগে থেকেই পরিকল্পনার কথা জানিয়ে আসছিলেন তিনি। কয়েকটি প্রকল্পের কাজ শুরুও করা হয়েছে। কিছু প্রকল্প অনুমোদনের জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। গতকাল সিলেটে এক দিনের সফর করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। দুপুরে তিনি টেলিভিশন সাংবাদিকদের সংগঠন ইমজা কার্যালয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেন। চলমান প্রকল্প এবং দ্রুতই যেসব প্রকল্পের কাজ শুরু হচ্ছে সেসব নিয়ে তিনি কথা বলেন। সিলেটের কৃষিপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে সিলেট বিমানবন্দরের পাশে প্যাকেজিং হাউস নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন- ঢাকার শ্যামপুরের আদলে সেখানে একটি প্যাকেজিং হাউস করা হবে। সঙ্গে থাকবে কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়নের লক্ষ্যে সিলেটে ১৮৮ একর জমিতে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) একটি প্রকল্প নেয়ার কথা জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
তিনি জানান, সিলেটে বর্তমানে দু’টি বিসিক শিল্প এলাকা রয়েছে। সেগুলোর আয়তন প্রায় ৩০ একর। এর বিপরীতে নতুন করে ১৮৮ একরের একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সিলেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটবে। এদিকে- সিলেট বিভাগের গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে প্রায় ৫ হাজার ৩২৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। বলেন, প্রকল্পটি আগামী দিনে একনেক সভায় উপস্থাপনের আশা রয়েছে। কিছু প্রক্রিয়াগত কারণে আগের দুই-তিনটি একনেক সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সভায় এটি উত্থাপনের চেষ্টা চলছে। সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের উন্নয়নকাজ প্রসঙ্গ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন- কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ মহাসড়কটি পূর্ণাঙ্গভাবে দেখা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সামান্য কিছু কাজ পরবর্তী দুই-তিন মাস চলতে পারে। তবে ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সড়কটি মূলত ব্যবহার উপযোগী হয়ে উঠবে বলে তিনি জানান। লালাবাজার থেকে সিলেট অংশের সড়ক চার লেনে উন্নীত করার বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারছেন না।
অনুষ্ঠান শেষে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন। কোনো জটিলতা থাকলে তা নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রকল্পটি আগামী দিনে একনেক সভায় উপস্থাপন করা হবে। সিলেট সিটি করপোরেশনের ৪২টি ওয়ার্ডে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এসব সড়কের বড় একটি অংশ এখনো পাকা করা সম্ভব হয়নি। সড়ক উন্নয়নের জন্য নতুন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। সিলেট নগরের পানি সংকটের কথা তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এই সমস্যা দীর্ঘদিনের। সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এ বিষয়ে উদ্যোগী ভূমিকা রাখছেন। নগরে পানি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়াতে চেঙ্গেরখাল এবং সুরমা-কুশিয়ারা নদী থেকে পানি উত্তোলন করে পরিশোধনের মাধ্যমে সরবরাহের একটি বড় প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। নগরে হাঁটাচলার জায়গা ও উন্মুক্ত স্থানের সংকট দূর করতে পুরনো কারাগারের জায়গায় আধুনিক পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। পুরনো কারাগারটি সিলেট সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে এর আগে সেখানে বিকল্প মেট্রোপলিটন কারাগারের ব্যবস্থা করতে হবে। ঐতিহ্যবাহী ক্বীন ব্রিজের পাশ দিয়ে নতুন একটি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। বলেন, সিলেটের ঐতিহাসিক স্থাপনা আলী আমজাদের ঘড়ি ও সার্কিট হাউসের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা অক্ষত রেখে কীভাবে নতুন সেতু নির্মাণ করা যায়, তা বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলে একই সংযোগ সড়ক ব্যবহার করে নতুন সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া সুরমা নদীর উপর কান্দিগাঁও ইউনিয়নের ধনপুর এলাকায় আরেকটি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। নগরের যানজট কমাতে কয়েকটি বিকল্প সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, খাদিমনগর ইউনিয়নের সাহেবের বাজার থেকে একটি ভাঙাচোরা সড়ক ২৪ ফুট প্রশস্ত করে কংক্রিটের সড়কে উন্নীত করা হবে।
এর ফলে ট্রাকগুলোকে নগরের আম্বরখানা এলাকা দিয়ে চলাচল করতে হবে না। বিকল্প পথ ধরে খাদিমপাড়া হয়ে কালাগুল বাজারের সড়ক ব্যবহার করে যানবাহন বাইপাসে পৌঁছাতে পারবে। এ ছাড়া সিলেট বিমানবন্দর থেকে আম্বরখানা পর্যন্ত চার লেনের সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। লাক্কাতুরা থেকে টেলিভিশন গেট পর্যন্ত আরেকটি সড়ক নির্মাণ করা হবে। এই সড়কটি চা-বাগানের ভেতর দিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাদাঘাট বাইপাসের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের কাজও অগ্রসর হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নগরের যানজট কমানো এবং যাতায়াত সহজ করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। নগরকে আরও বাসযোগ্য করে তুলতে নজরদারি ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কথা জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ড্রোন এবং ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং যান চলাচলে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ রয়েছে।
