স্প্যানিশ ফুটবলের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতার লড়াইয়ে আবারও আলো ছড়ালেন কিলিয়ান এমবাপে। ফরাসি তারকার জোড়া গোলে নিজেদের মাঠ ক্যাম্প ন্যুতে বার্সেলোনাকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। এই হারে চলতি লা লিগায় টানা নয় ম্যাচ জয়ের পর প্রথমবার পরাজয়ের স্বাদ পেল হান্সি ফ্লিকের দল। অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ এই জয়ে শিরোপার লড়াইয়ে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করল রিয়াল।
গত রাতে ম্যাচের আগে দুর্দান্ত ছন্দে ছিল বার্সেলোনা। লিগের প্রথম নয় ম্যাচে ৩৯ গোল করে প্রতিপক্ষের রক্ষণে একের পর এক আঘাত হেনেছিল কাতালান ক্লাবটি। নিজেদের মাঠেও ছিল টানা ২৩ জয়ের আত্মবিশ্বাস। কিন্তু এল ক্লাসিকোর মঞ্চে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি তারা। এমবাপের কার্যকর ফিনিশিং আর রিয়ালের রক্ষণাত্মক দৃঢ়তায় থেমে যায় বার্সার জয়যাত্রা।
প্রথমার্ধে দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে। তবে গোলের দেখা প্রথম পায় রিয়াল। ম্যাচের ৪১ মিনিটে ডান দিক থেকে আসা ক্রস সামলাতে গিয়ে ভুল করেন বার্সেলোনার ডিফেন্ডার মার্তিন। বলটি এমবাপের সামনে চলে এলে সুযোগ কাজে লাগাতে ভুল করেননি ফরাসি ফরোয়ার্ড। তার গোলে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় সফরকারীরা।
পিছিয়ে পড়ার পর দ্রুত সমতায় ফেরার সুযোগ পেয়েছিল বার্সেলোনা। পেদ্রির দারুণ পাস থেকে বল পেয়ে গোলরক্ষককে একা পেয়েও লক্ষ্যভেদ করতে পারেননি লামিনে ইয়ামাল। তার শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় হতাশ হতে হয় স্বাগতিক সমর্থকদের। প্রথমার্ধে একাধিক সুযোগ তৈরি করেও গোলের ব্যবধান গড়তে পারেনি বার্সা।
দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য ম্যাচে ফেরে কাতালানরা। ৬১ মিনিটে পেদ্রির পাস থেকে বক্সের ডান দিকে বল পেয়ে নিখুঁত শটে জাল খুঁজে নেন রাফিনিয়া। ব্রাজিলিয়ান তারকার গোলে সমতায় ফেরে বার্সেলোনা, গ্যালারিতে ছড়িয়ে পড়ে উচ্ছ্বাস। মনে হচ্ছিল, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আবারও নিজেদের হাতে নিচ্ছে স্বাগতিকেরা।
কিন্তু এমবাপে যে অন্য পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন, তা বোঝা গেল শেষ দিকে। ৮৭ মিনিটে এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গার ক্রস থেকে বল পেয়ে সহজ শটে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি। এই গোলেই নিশ্চিত হয় রিয়ালের ২-১ ব্যবধানের জয়। একই সঙ্গে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে নিজের গোলসংখ্যা ১০০-তে নিয়ে যান এমবাপে, যা তার ১১৬তম ম্যাচে অর্জিত একটি মাইলফলক।
শুধু গোল করেই নয়, এল ক্লাসিকোয় নিজের রেকর্ডও সমৃদ্ধ করেছেন এমবাপে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাত ম্যাচে তার গোলসংখ্যা আট। একুশ শতকে এল ক্লাসিকোয় প্রথম সাত ম্যাচে কোনো খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড এটি। এর আগে প্রথম সাত ম্যাচে ছয় গোল করে এই তালিকায় ছিলেন লিওনেল মেসি।
রিয়ালের জয়ের পেছনে গোলরক্ষক আন্দ্রে লুনিনের অবদানও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া অসুস্থ হয়ে পড়ায় একাদশে সুযোগ পান ইউক্রেনের এই গোলরক্ষক। ম্যাচে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে বার্সেলোনাকে এগিয়ে যেতে দেননি তিনি। বিশেষ করে ৬৫ মিনিটে জেরার্দ মার্তিনের হেড থেকে আসা বল ঠেকিয়ে দলের লিড ধরে রাখতে বড় ভূমিকা রাখেন লুনিন।
এই জয়ে লা লিগার পয়েন্ট তালিকায় বার্সেলোনার সঙ্গে ব্যবধান কমিয়ে এনেছে রিয়াল। ১০ ম্যাচে ২৭ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রয়েছে বার্সা, সমান ম্যাচে ২৪ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে রিয়াল মাদ্রিদ। দুই দলের মাঝখানে ২৫ পয়েন্ট নিয়ে রয়েছে আতলেতিকো মাদ্রিদ। ফলে এল ক্লাসিকোর এই জয় শিরোপার লড়াইকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছে।
রিয়াল ২০২১ সালের পর এই প্রথম ক্যাম্প ন্যুতে জিতল। পাশাপাশি দ্বিতীয় মেয়াদে কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৩ বছর বিরতিতে এল ক্লাসিকোয় ফিরে জয় পেলেন হোসে মরিনিও। বিপরীতে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ১১ জয়ের পর চ্যাম্পিয়নস লিগে পিএসজির কাছে হারের পর এবার লা লিগাতেও পরাজয়ের মুখ দেখল বার্সেলোনা।
মৌসুমের শুরুতে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা বার্সেলোনার জন্য এই হার সতর্কবার্তা। আর রিয়ালের জন্য এটি শুধু তিন পয়েন্টের জয় নয়, বরং শিরোপার দৌড়ে নিজেদের সামর্থ্যের জানান দেওয়া। ক্যাম্প ন্যুতে এমবাপের দুই গোলের রাত তাই এল ক্লাসিকোর ইতিহাসে আরও একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকল!
