দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে পর্যটন মৌসুম শুরুর আগে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দ্বীপটিতে নেই ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, নেই অগ্নিনির্বাপণে নিয়োজিত প্রশিক্ষিত কর্মী। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৫০টি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ থাকলেও এসব স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম নেই। কোনো স্থাপনায় আগুন লাগলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা নিয়ে তৈরি হচ্ছে শঙ্কা।
গত ১৭ অক্টোবর কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু হয়।
স্থানীয়রা বলছেন, ইনানীর ঘটনার পর সেন্টমার্টিনের হোটেল-রিসোর্টগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জরুরিভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন। পর্যটন ব্যবসার প্রসার ঘটলেও আগুন নেভানোর সরঞ্জাম, জরুরি বহির্গমন পথ, প্রশিক্ষিত কর্মী ও দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঝুঁকি থেকে যাবে।
আগামী ১ নভেম্বর থেকে সেন্টমার্টিনে শুরু হচ্ছে পর্যটন মৌসুম। চলবে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত। এ সময়ে প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার পর্যটক দ্বীপে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন। ফলে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মৌসুম শুরুর আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি উঠেছে।
২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি ভোরে দ্বীপের পশ্চিম সৈকতের গলাচিপা এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে তিনটি রিসোর্টের ২৬টি কক্ষ পুড়ে যায়। প্রবল বাতাসে আগুনে এক রিসোর্ট থেকে অন্য রিসোর্টে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা চেষ্টার পর পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সহযোগিতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ওই ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা নূর মোহাম্মদ বলেন, দ্বীপে আগেও হোটেল-রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সে সময় ফায়ার সার্ভিসের ব্যবস্থা না থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা পানি সংগ্রহ করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তার স্বার্থে দ্বীপে ছোট পরিসরে হলেও একটি ফায়ার সার্ভিস ইউনিট স্থাপন করা জরুরি। আগুন লাগার পর মূল ভূখণ্ড থেকে সহায়তা আসার অপেক্ষায় থাকলে ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে যেতে পারে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান বলেন, সেন্টমার্টিনে ফায়ার সার্ভিস স্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এ দ্বীপে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। অন্তত পর্যটন মৌসুমে প্রশিক্ষিত কর্মী ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিয়ে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
টেকনাফ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন কমান্ডার কামরুজ্জামান সুমন বলেন, তিনি সম্প্রতি টেকনাফে যোগ দিয়েছেন। সেন্টমার্টিনে ফায়ার সার্ভিসের কোনো স্টেশন ও প্রশিক্ষিত কর্মী নেই। আগামী ২৯ অক্টোবর তারা দ্বীপটি পরিদর্শনে যাবেন। পরিদর্শনের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারবেন বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম বলেন, দ্বীপের রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে কথা হয়েছে। হোটেল ও রিসোর্টগুলোতে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখার বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে দ্বীপে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের সম্ভাবনা দেখছেন না তিনি। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ব্যবস্থা রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখার নির্দেশনা দিলেই হবে না, সেগুলো কার্যকর আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, প্রশিক্ষিত কর্মী, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ, রান্নাঘরের অগ্নিনিরাপত্তা এবং জরুরি বহির্গমন পথ নিশ্চিত করতে হবে। আগুন লাগলে পর্যটকদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার মহড়াও চালু করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়রা বলেন, দ্বীপের কোনো হোটেল, রিসোর্ট কিংবা রেস্তোরাঁয় আগুন লাগলে অনেক সময় বাড়িতে ব্যবহৃত পানির পাইপ দিয়ে পানি সংগ্রহ করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরাই এগিয়ে আসেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও সহায়তা করেন। তবে আগুন বড় আকার ধারণ করলে সীমিত সরঞ্জাম দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাদের দাবি, পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই দ্বীপের সব হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে অগ্নিনিরাপত্তা পরিদর্শন করতে হবে। পাশাপাশি অস্থায়ী ফায়ার সার্ভিস ইউনিট স্থাপন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত কর্মী মোতায়েন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
