মধ্যপ্রাচ্য আজ এক মহা সংকটের মুখোমুখি। ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরিতা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিমুখী হুংকার, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের লড়াই পুরো অঞ্চলকে এক অনিশ্চিত গতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। কূটনীতির টেবিলে দৌড়ঝাঁপ চললেও যুদ্ধের দামামা যেন যেকোনো মুহূর্তে সবকিছু গ্রাস করে ফেলার উপক্রম করেছে।
১. মার্কিন সামরিক হুংকার বনাম কূটনৈতিক শেষ চেষ্টা:
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। একদিকে ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, প্রয়োজন হলে তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আবার শুরু হতে পারে বা বাকি কাজ শেষ করা হতে পারে; অন্যদিকে ট্রাম্প এটাও বলেছেন যে চাইলে তারা এই সংঘাত থেকে সরেও আসতে পারেন।
এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের তেহরান সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কাতার ও পাকিস্তানের মতো মধ্যস্থতাকারীরা শেষ মুহূর্তের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে দুই পক্ষকে কোনো সমঝোতায় আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যাতে সর্বাত্মক যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ এড়ানো সম্ভব হয়। তবে সেন্টকমের (CENTCOM) পূর্ণ সামরিক প্রস্তুতি এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের পরিকল্পনাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, পরিস্থিতি যেকোনো সময় বিস্ফোরণমুখী হতে পারে।
২. ইসরায়েলি নির্বাচন এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ:
বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, মার্কিন পদক্ষেপে ইসরায়েলের স্বার্থ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এজেন্ডা গভীরভাবে জড়িত। ইসরায়েলে আসন্ন নির্বাচন এবং এর ঠিক আগের মুহূর্তে সামরিক উত্তেজনার পারদ চড়ে যাওয়াকে কাকতালীয় হিসেবে দেখছেন না আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা। অধ্যাপক মেইর শেইমারের মতো বিশিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপ বা চাপ মূলত ইসরায়েলি ভূ-রাজনৈতিক সুরক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েই পরিচালিত হয়।
৩. সম্ভাব্য হামলার রূপ এবং ট্যাকটিকাল নিউক্লিয়ারের জুজু:
যদি নতুন করে হামলা শুরু হয়, তবে তা কেবল সীমিত বিমান হামলায় সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে আশঙ্কা করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা। সাবেক মার্কিন কর্নেল ম্যাক গ্রেগারের মতো বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রথাগত সামরিক উপায়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এমনকি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বা কৌশলগত অস্ত্রের ব্যবহারের কথাও আলোচিত হচ্ছে। তবে কাউন্টার টেরোরিজমের বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ধ্বংসাত্মক অস্ত্র প্রয়োগ করেও ইরানকে পুরোপুরি দমানো যাবে না; বরং এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পুরো অঞ্চলের মার্কিন ও ইসরায়েলি স্থাপনা চরম বিপদের মুখে পড়বে।
৪. ইয়েমেনের হুতি ও সৌদি আরব: লোহিত সাগর ও আকাশসীমার নিরাপত্তা সংকট:
পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরের জলসীমার পাশাপাশি আকাশপথের নিরাপত্তাও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও তেল শোধনাগার লক্ষ্য করে হুতিদের তৎপরতা এবং ইয়েমেনের তাইজ শহর ঘিরে চলমান সংঘর্ষ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। হুতিদের তরফ থেকে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোকে অনিরাপদ ঘোষণা করার পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিমান সংস্থা ফ্লাইট স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে।
অধ্যাপক রবার্ট পেপের মতো বিশিষ্ট পন্ডিতদের সতর্কতা এবং প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রমাণ করে যে, এই সংঘাত কেবল ইরান বা ইসরায়েলের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং পুরো উপদ্বীপের অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করে তুলেছে। অথচ, হুতিদের মূল দাবি—তাদের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া এবং মানবিক ও অর্থনৈতিক স্বস্তি নিশ্চিত করা—আন্তর্জাতিক মোড়লদের কূটনীতির প্যাঁচে উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।
৫. ফিলিস্তিন সংকট ও আরব বিশ্বের নীরবতা:
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি আগ্রাসন এবং শত শত ঘরবাড়ি মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনার বিপরীতে আরব বিশ্বের কার্যকর কোনো প্রতিবাদ বা জোরালো ভূমিকা না থাকা বিশ্ববাসীর মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। একদিকে যখন ফিলিস্তিনিরা অস্তিত্বের লড়াই লড়ছে, অন্যদিকে পরাশক্তির তাঁবেদারিতে ব্যস্ত আরব শাসকগোষ্ঠীগুলোর নিষ্ক্রিয়তা মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে আরও প্রলম্বিত করছে।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারান্দির মতে, ইরান যেভাবে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক চাপের মুখেও নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রমাণ করে আসছে এবং নতুন নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষা চালাচ্ছে, তাতে এটি স্পষ্ট যে বলপ্রয়োগ করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আট মাস ধরে চলা এই দীর্ঘ সংঘাতে ইরান যেমন এক ইঞ্চিও মাটি ছাড়েনি, তেমনি আগামী দিনেও এই ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের অবসান সহজে হওয়ার নয়। কাতারের মধ্যস্থতা শেষ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি আনতে পারবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্য আরও বড় কোনো বিধ্বংসী যুদ্ধের দিকে পা বাড়াবে—এখন সেটাই দেখার বিষয়।
লেখক পরিচিতি:
ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম;
কলামিস্ট, সমাজসেবক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনীতিবিদ।
চেয়ারম্যান: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র।
