নেতৃত্বের তীব্র কোন্দল, চরম আর্থিক অনিয়ম, তহবিল তছরুপ, সমিতির প্রশাসনিক ও আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে চট্টগ্রামের ৭৫ বছরের ঐতিহ্যবাহী সমবায় সমিতি দি চিটাগাং কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেডে। আইন অনুযায়ী সভা আহ্বানের ক্ষমতা সমিতির সাধারণ সম্পাদকের। হিসাব সংরক্ষণ, মামলা পরিচালনা, সোসাইটির পক্ষে অর্থ বা সম্পদ গচ্ছিত রাখা, ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের ক্ষমতাও তার। কিন্তু সভাপতির স্বেচ্ছাচারিতার কারণে কোনো কাজ করতে পারছেন না প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ সাইফুদ্দিন। এভাবে আইন ও বিধি লঙ্ঘন করে সমিতি পরিচালিত হওয়ায় সমিতির সাধারণ সদস্যদের স্বার্থও ক্ষুণœ হচ্ছে। সম্প্রতি সমবায় অধিদপ্তরের এক তদন্তে এই চিত্র উঠে এসেছে। এ অবস্থায় সমিতির সদস্যদের স্বার্থ রক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির নির্বাচিত ব্যবস্থাপনা কমিটি মেয়াদের আগেই ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সমবায় অধিদপ্তর।
তদন্ত
কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে কমিটি ভেঙে দেওয়ার এই নির্দেশ জারি করেছেন চট্টগ্রাম জেলা সমবায় অফিসার সিফাত উল্লাহ তাসনিম। আগামী ১৮ নভেম্বরের মধ্যে বিশেষ সাধারণ সভা করে ২০ নভেম্বরের মধ্যে কমিটি ভাঙার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনামায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিশেষ সাধারণ সভা আহ্বানে ব্যর্থ হলে আইন ও বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে ।
চট্টগ্রাম জেলা সমবায় অফিসার সিফাত উল্লাহ তাসনিম আমাদের সময়কে বলেন, সমিতির শৃঙ্খলা ভেঙে পড়া, অচলাবস্থা নিরসন, সদস্যদের স্বার্থ রক্ষায় আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় কমিটি ভেঙে দিতে বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, গত ৩ সেপ্টেম্বর দি চটিাগাং কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেডের সভাপতি ওয়াহিদ মালেক এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে সমিতির অর্থ তছরুপসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক ও মহাপরিচালক বরাবর অভিযোগ করেন প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ সাইফুদ্দিন। সমবায় সমিতি আইনের ৪৯(১)(খ) ধারায় তদন্ত এবং ২২ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে সমবায় অধিদপ্তর ২৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বভিাগীয় সমবায় দপ্তরের যুগ্ম নিবন্ধক দুলাল মিয়াকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করে।
কমিটি ৭ অক্টোবর সমবায় অধিদপ্তরে ১১ পৃষ্ঠার তদন্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। এরপর সমবায় অধিদপ্তরের ১১ অক্টোবরের এক আদেশে তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে জেলা সমবায় অফিসার চট্টগ্রামকে নির্দেশ দেওয়া হয়। সমবায় অধদিপ্তররে আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সমিতির ব্যবস্থাপনা, আইন, বিধি ও উপ-আইনের বিধান লঙ্ঘনের দায়ে ব্যবস্থাপনা কমিটিকে ব্যাখ্যা তলব করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে ১৭ অক্টোবর শুনানিতে ডাকেন চট্টগ্রাম জেলা সমবায় অফিসার সিফাত উল্লাহ তাসনিম। অভিযোগকারী মুহাম্মদ সাইফুদ্দনি ও ব্যবস্থাপনা কমিটির ৪ জন সদস্য তাদের লিখিত জবাব নিয়ে শুনানিতে অংশ নেন। অন্যদেিক অভিযুক্ত সভাপতি ওয়াহিদ মালেক, কোষাধ্যক্ষ ডা. মোহা. তৈয়ব সিকদারসহ ব্যবস্থাপনা কমিটির পাঁচ সদস্য সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি।
জানতে চাইলে মুহাম্মদ সাইফুদ্দিন আমাদের সময়কে বলেন, নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সভাপতি ওয়াহিদ মালেক এবং কোষাধ্যক্ষ ডা. মোহা. তৈয়ব সিকদার সমিতির উপ-আইন (বাই-লজ) লঙ্ঘন করে সমিতি পরিচালনা করছেন। এমনকি সমিতির উপ-আইনে সম্পাদককে দেওয়া অধিকার স্বৈরাচারী কায়দায় কেড়ে নিয়ে সমিতি পরিচালনা এবং আর্থিক লেনদেন করে তারা সমিতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। তাদের এসব অনিয়ম ও আইনবহির্ভূত কাজের জন্য কয়েকবার আদালতের শরণাপন্ন হই। তারা আদালতের আদেশও অমান্য করে স্বৈরাচারী কায়দায় সমিতির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
মুহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, ‘সম্প্রতি উচ্চ আদালতের আদেশ অমান্য করে এজিএম করেন। এ অবস্থায় সদস্যদের স্বার্থ রক্ষা, সমিতিকে ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা, উপ-আইন ও সম্পাদকের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক ও মহাপরিচালক বরাবরে অভিযোগ দায়ের করি।’ এ সময় তিনি তদন্তে অভিযুক্ত এবং সমিতি ধ্বংসের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের যথাযথ ও আইনানুগ শাস্তির দাবি জানান।
তদন্তে যেসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে : তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, সমবায় সমিতি আইন, সমবায় সমিতি বিধিমালা ও সোসাইটির উপ-আইন লঙ্ঘন করে দি চটিাগাং কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেডের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এর ম্যানেজার মোহাম্মদ মনজুরুল আলমের মাধ্যমে সভার নোটিশ জারি করায় সমবায় সমিতি বিধিমালা, ২০০৪-এর ৫২(ঙ) বিধি লঙ্ঘিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে উভয় পক্ষের বিরোধের অজুহাত দেখিয়ে মামলার ব্যয়ের মাধ্যমে সমিতির আর্থিক ক্ষতি সাধন করা হয়েছে। সম্পাদকের নিকট ভাউচারসহ হিসাবসমূহ স্বাক্ষরের জন্য উপস্থাপন না করে কোষাধ্যক্ষ ডা. মোহা. তৈয়ব সিকদারের মাধ্যমে কাজ করা হয়েছে, যা সমিতির উপ-আইনের ১৬(৫)(গ) ধারার লঙ্ঘন। সম্পাদকের স্বাক্ষর ছাড়া ১২ লাখ ৬৯ হাজার টাকা ব্যয়, সমিতির লেনদেনে পদ্ধতিগত ত্রুটি ও বার্ষিক সাধারণ সভা প- করে সোসাইটির ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৭৫ টাকার ক্ষতিসাধন করা হয়েছে। এ ছাড়া সম্পাদককে বাদ দিয়ে সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ ইস্টার্ন ব্যাংকের চান্দগাঁও শাখায় ৫ কোটি টাকার এফডিআর করেছেন, যা উপ-আইনের ১৬(৭)(ছ) ধারার লঙ্ঘন। সমবায় আইনের ভুল ব্যাখা দিয়ে উপ-আইনের সংশ্লিষ্ট বিধিবহির্ভূত সভা পরিচালনা, নির্বাচিত সম্পাদককে বাদ রেখে সভাপতির একক সিদ্ধান্তে ব্যাংক হিসাবে লেনদেন এবং সমিতির তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যক্তিগত মামলার জন্য অপচয়।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর থেকে ব্যবস্থাপনা কমিটির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের দলাদলি, অনিয়ম, আর্থিক ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও ব্যক্তিগত মামলার জন্য অর্থ ব্যয়সহ বিবিধ আর্থিক বিশৃঙ্খলা বিরাজমান ছিল। ফলে সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় সমিতির সদস্যদের মধ্যে এই কমিটির প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দানা বাঁধে। আর্থিক ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার ফলে সমিতি দুর্বল হয়ে দেউলিয়া হওয়ার পথে ধাবিত হচ্ছে।
সমিতির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনের পর থেকে ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়ম নিয়ে মতভেদ ও দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এসব কারণে বিগত দেড় বছরে সমবায় মন্ত্রণালয়, সমবায় অধিদপ্তর ও জেলা সমবায় অফিসার বরাবর সভাপতি ওয়াহিদ মালেক ও কোষাধ্যক্ষ ডা. মোহা. তৈয়ব সিকদারের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমে। প্রতিকার না পেয়ে সাধারণ সম্পাদক সমবায় অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে অভিযোগ দেন। সমবায় অধিদপ্তর উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে; এতে সভাপতির স্বেচ্ছাচারিতা, আর্থিক অনিয়ম এবং শৃঙ্খলা ভেঙে অচলাবস্থার বিষয়টি ওঠে আসে।
