একটানা ঝিরঝিরে শব্দ! ছোটবেলার টেলিভিশনের কথা মনে পড়ে তো? সিগনাল না পেলে একনাগাড়ে ওই আওয়াজ শুনলেই বিরক্ত লাগত তো? কিন্তু এখন ঠিক ও রকমই একটি শব্দ ঘুম পাড়াচ্ছে শত শত মানুষকে। তা সে এক মাসের শিশু হোক বা ৮০ বছরের বৃদ্ধ। ভাবুন তো, অমন শব্দ কিনতেও পাওয়া যাচ্ছে আজকাল, একটি ছোট মেশিনে।
রাতে বিছানায় শুয়েও ঘুম আসতে চায় না? বাইরে গাড়ির হর্ন, পাশের বাড়ির আওয়াজ বা মধ্যরাতে আচমকা কোনও শব্দে বার বার ঘুম ভেঙে যায়। আবার কারও ক্ষেত্রে চারপাশের নিস্তব্ধতাই অস্বস্তির কারণ। এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে অনেকেই এখন ভরসা করছেন এই মেশিনে। নাম, ‘হোয়াইট নয়েজ় মেশিন’। যন্ত্রটি থেকে একটানা নির্দিষ্ট ধরনের শব্দ বেরোয়, যা বাইরের আওয়াজকে অনেকটা দমিয়ে দেয়। ছোট শিশুদের ঘুম পাড়ানো থেকে শুরু করে বড়দের মনঃসংযোগ বাড়ানো, বিভিন্ন কারণে জনপ্রিয় হচ্ছে এই যন্ত্র। কিন্তু সত্যিই কি এই যন্ত্র ঘুমের মান উন্নত করে? না কি নিয়মিত ব্যবহারে রয়েছে কিছু ঝুঁকিও? যন্ত্রটি কেনার আগে জেনে নেওয়া প্রয়োজন তার খুঁটিনাটি।
এই যন্ত্র ঘুমের মান উন্নত করে? ছবি: সংগৃহীত
হোয়াইট নয়েজ় মেশিন আসলে কী?
হোয়াইট নয়েজ় মেশিন এমন একটি যন্ত্র, যা একটানা একটি নির্দিষ্ট ধরনের শব্দ তৈরি করে। এই শব্দে মানুষের শ্রবণসীমার বিভিন্ন কম্পাঙ্কের শব্দ সমান মাত্রায় উপস্থিত থাকে। অনেকটা টেলিভিশন বা রেডিয়োয় সম্প্রচার না থাকলে যে শোঁ শোঁ বা ঝিরঝির শব্দ শোনা যায়, তার মতো। এই যন্ত্রের বিশেষ সংস্করণে শুধু হোয়াইট নয়েজ় নয়, আরও নানা ধরনের শব্দ শোনার সুযোগ রয়েছে। যেমন, বৃষ্টির শব্দের মতো অপেক্ষাকৃত মোলায়েম আওয়াজকে বলা হয় ‘পিঙ্ক নয়েজ়’। অন্য দিকে, দূরে বজ্রপাতের মতো আরও গম্ভীর শব্দ পরিচিত ‘ব্রাউন নয়েজ়’ নামে। শব্দের এই একটানা প্রবাহ বাইরের হঠাৎ তৈরি হওয়া আওয়াজের সঙ্গে পার্থক্য কমিয়ে দেয়। ফলে পরিবেশের অন্য শব্দের কারণে সহজে মনোযোগ সরে যাওয়ার সম্ভাবনা কমতে পারে।
কী এর উপকারিতা?
ঘুম পাড়ানোর ক্ষমতা: হোয়াইট নয়েজ় মেশিনের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হল, ঘুমের পরিবেশ তৈরি করার ক্ষমতা। পাশের ঘরের কথাবার্তা, গাড়ির শব্দ বা রাস্তার কোলাহলে যাঁদের ঘুম বার বার ভেঙে যায়, তাঁদের ক্ষেত্রে এই যন্ত্র কিছুটা সাহায্য করতে পারে। একটানা শব্দ বাইরের আকস্মিক আওয়াজকে আড়াল করে রাখে। ফলে ঘুমের মধ্যে ছোটখাটো শব্দে চমকে ওঠার সম্ভাবনা কমতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে এই শব্দ ঘুমের আগে একটি নির্দিষ্ট অভ্যাস তৈরি করতেও সাহায্য করে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে একই ধরনের শব্দ শুনতে শুনতে মস্তিষ্ক সেটিকে ঘুমের সময় বলে ধরে নিতে পারে। শিশুদের ঘুম পাড়ানোর জন্য তাই নয়া প্রজন্মের মা-বাবারা খুব ব্যবহার করছেন এই মেশিন। যন্ত্রটি না থাকলে ইউটিউবে এমন ধরনের শব্দ চালিয়ে দিচ্ছেন।
কাজের ক্ষেত্রেও উপকারী হতে পারে এই যন্ত্র। ছবি: সংগৃহীত
মনঃসংযোগ বৃদ্ধি করা: শুধু ঘুম নয়, কাজের সময়ে মনঃসংযোগ বজায় রাখতেও অনেকে হোয়াইট নয়েজ় ব্যবহার করেন। অফিসে সহকর্মীদের কথাবার্তা, বাড়িতে টেলিভিশনের আওয়াজ বা আশপাশের নানা শব্দ কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এই পরিস্থিতিতে একটানা শব্দ বাইরের আওয়াজের প্রভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে। গ্রন্থাগার, অফিস বা ক্যাফের মতো জায়গায় এই ধরনের শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। তবে হোয়াইট নয়েজ় শুনলেই যে প্রত্যেকের কাজের দক্ষতা বেড়ে যাবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। কারও ক্ষেত্রে এটি মনঃসংযোগে সাহায্য করে, আবার কারও কাছে একটানা শব্দই বিরক্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
কী ভাবে ক্ষতি করতে পারে?
হোয়াইট নয়েজ় মেশিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল শব্দের মাত্রা। অনেকক্ষণ ধরে খুব জোরে চালিয়ে রাখলে শ্রবণশক্তির ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এই বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ, তাদের শ্রবণ ও ভাষা বিকাশের প্রক্রিয়া তখনও চলতে থাকে। এ ছাড়া সারাক্ষণ জোরে হোয়াইট নয়েজ় চালিয়ে রাখলে শিশুর আশপাশের স্বাভাবিক শব্দ এবং মানুষের কথা শোনার সুযোগ কমে যেতে পারে। ভাষা শেখার জন্য শিশুর সঙ্গে কথা বলা, মানুষের কণ্ঠস্বর শোনানো এবং চারপাশের স্বাভাবিক শব্দের সঙ্গে পরিচিত করানো গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কেউ আবার ঘুমের সময়ে এই যন্ত্রের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। ফলে যন্ত্রটি ছাড়া ঘুমোতে অসুবিধা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যদিও এই অভ্যাস সবার ক্ষেত্রে তৈরি হয় না, তবু ব্যবহারের সময়ে বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার।
কী ভাবে ব্যবহার করবেন এই যন্ত্র? ছবি: সংগৃহীত
কী ভাবে ব্যবহার করবেন হোয়াইট নয়েজ় মেশিন?
হোয়াইট নয়েজ় মেশিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে কয়েকটি সতর্কতা মেনে চলা জরুরি—
শব্দের মাত্রা কম রাখুন: যন্ত্রের শব্দ যেন ঘরের স্বাভাবিক শব্দের চেয়ে খুব বেশি জোরে না হয়। বিশেষ করে, শিশুর ঘুমের সময়ে শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার।
বিছানা থেকে দূরে রাখুন: আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ পেডিয়াট্রিকসের পরামর্শ অনুযায়ী, শিশুর বিছানা থেকে অন্তত ২ মিটার দূরে যন্ত্রটি রাখা উচিত। কখনও শিশুর বিছানার ভিতরে কিংবা বিছানার রেলিংয়ে যন্ত্রটি লাগাবেন না।
টাইমার ব্যবহার করুন: সারারাত যন্ত্রটি চালিয়ে রাখার বদলে ঘুম আসার সময় পর্যন্ত চালাতে পারেন। যন্ত্রে টাইমার থাকলে ৩০-৬০ মিনিটের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা রাখা যায়। শিশুর ক্ষেত্রে শব্দের মাত্রা ও ব্যবহারের সময় নিয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
ঘুমের সমস্যার কারণ বুঝুন: নিয়মিত ঘুম আসতে দেরি হলে বা মাঝরাতে বার বার ঘুম ভেঙে গেলে শুধু হোয়াইট নয়েজ় মেশিনের উপর নির্ভর করবেন না। অনিদ্রা, উদ্বেগ, শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা বা অন্য কোনও শারীরিক কারণ রয়েছে কি না, তা বুঝতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
