বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক নীতি ও পরিকল্পনার বাস্তবায়ন জোরদার করতে ১০টি অগ্রাধিকারভিত্তিক সুপারিশ দিয়েছে গ্রিন ভয়েসেস প্রকল্প। জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন (কপ-৩১) সামনে রেখে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের কাছে এসব সুপারিশ তুলে ধরেছে প্রকল্পটি।
গত ১৮ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন অনুবিভাগের প্রধান ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ সাফিউল্লাহর কাছে সুপারিশগুলো উপস্থাপন করা হয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের (সিথ্রি-ইআর) সহযোগিতায় তৈরি এসব সুপারিশের লক্ষ্য, সরকারের কপ-৩১ অবস্থানপত্রে উল্লিখিত অগ্রাধিকারগুলো বাস্তবসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিমাপযোগ্য উদ্যোগে রূপ দিতে সহায়তা করা।
জাতীয় নীতি বিশ্লেষণ, জলবায়ু অর্থায়নসংক্রান্ত মূল্যায়ন এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সুপারিশগুলো তৈরি করা হয়েছে। এতে জলবায়ু অভিযোজন, অর্থায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা, নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরসহ পরস্পর সম্পর্কিত ১০টি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জলবায়ুর ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন অনুযায়ী নীতি ও বিনিয়োগ কার্যকর করার ওপর।
অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জোর
সুপারিশে বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি) বাস্তবায়ন আরও কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা, অর্থায়নের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের কার্যকর পদ্ধতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে অভিযোজন কার্যক্রমের সুফল কারা কতটা পাচ্ছে, তা মূল্যায়নের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সূচক এবং নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পৃথক তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। এতে জলবায়ু প্রকল্পের সুবিধা বণ্টনে বৈষম্য শনাক্ত করা এবং পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্যোগ নেওয়া সহজ হবে।
সহজ ও স্বচ্ছ জলবায়ু অর্থায়নের দাবি
জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে আরও সহজলভ্য, পূর্বানুমানযোগ্য ও স্বচ্ছ ব্যবস্থার সুপারিশ করেছে গ্রিন ভয়েসেস। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে চিহ্নিত অভিযোজনের প্রয়োজনগুলোতে অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থ পাওয়ার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রকল্প তৈরি, বাস্তবায়ন এবং বিনিয়োগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনকে জলবায়ু বিনিয়োগের পরিকল্পনায় আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে প্রকল্পটি।
ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ ও নথি সংরক্ষণ জরুরি
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী তথ্য-প্রমাণ ও নথি তৈরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে সুপারিশে। জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, জীবিকার ক্ষতি এবং অর্থের অঙ্কে সহজে পরিমাপ করা যায় না—এমন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য ক্ষতির তথ্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এসব তথ্য নীতিনির্ধারণ, ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের দাবি উপস্থাপনে সহায়ক হতে পারে।
নারীদের নেতৃত্ব, তরুণদের অর্থবহ অংশগ্রহণ এবং উপযুক্ত প্রযুক্তি ও কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধিও সুপারিশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু উদ্যোগ বাস্তবায়নে এসব উপাদানকে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
সুপারিশকে স্বাগত মন্ত্রণালয়ের
সুপারিশ উপস্থাপনের সময় মোহাম্মদ নাভিদ সাফিউল্লাহ উদ্যোগটির প্রশংসা করেন। কপ-৩১ প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক ও তথ্য-প্রমাণনির্ভর সুপারিশের প্রাসঙ্গিকতাও তিনি স্বীকার করেন। বৈঠকে বাংলাদেশের জলবায়ু অগ্রাধিকার এবং গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা কীভাবে চলমান নীতিপ্রক্রিয়া ও বাস্তবায়ন কার্যক্রমে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়।
গ্রিন ভয়েসেসের বৃহত্তর কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গবেষণা, নীতিসংলাপ, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে জলবায়ু বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্ব বাড়াতে কাজ করছে প্রকল্পটি। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা জাতীয় নীতিনির্ধারণী আলোচনায় তুলে ধরার চেষ্টা করছে তারা।
নারী ও তরুণদের নেতৃত্বে জলবায়ু উদ্যোগ
‘গ্রিন ভয়েসেস: এমপাওয়ারিং উইমেন অ্যান্ড ইয়ুথ ফর ক্লাইমেট অ্যাকশন ইন বাংলাদেশ’ নেদারল্যান্ডসের দূতাবাসের সহায়তায় পরিচালিত একটি কনসোর্টিয়াম উদ্যোগ। এতে সহযোগী হিসেবে রয়েছে বনহিশিখা ও দ্য আর্থ সোসাইটি।
প্রকল্পটি নারীদের জলবায়ু সহনশীলতা ও অভিযোজন জোট—উইমেনস ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড অ্যাডাপটেশন অ্যালায়েন্সের (শেরা) কার্যক্রমেও সহায়তা করে। জলবায়ুনীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের নেতৃত্ব এবং অংশগ্রহণ বাড়ানো এ নেটওয়ার্কের অন্যতম লক্ষ্য।
গ্রিন ভয়েসেসের গবেষণা সহযোগী হিসেবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিথ্রি-ইআর জলবায়ুনীতি বিশ্লেষণ ও তথ্য-প্রমাণ তৈরিতে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। এর মাধ্যমে জাতীয় নীতির অগ্রাধিকারের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তব প্রয়োজনের সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
কপ-৩১ সামনে রেখে গবেষণা, বাস্তবভিত্তিক সুপারিশ ও জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাকে একত্র করে বাংলাদেশের জলবায়ুনীতি প্রক্রিয়ায় অবদান রাখতে চায় গ্রিন ভয়েসেস। সম্মেলনের প্রস্তুতির পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে জলবায়ু কার্যক্রমের বাস্তবায়নেও এ উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে চায়।