শরৎ পেরিয়ে হেমন্তের আগমনী আবহে নীলফামারীর ডিমলার প্রকৃতিতে দেখা দিয়েছে ভিন্নরকম সৌন্দর্য। উপজেলার সিংগাহারা নদী জলাশয়, বিল ও নিচু জমিতে ফুটেছে বেগুনি ও সাদা রঙের কচুরিপানার ফুল। পানির ওপর সবুজ পাতার মাঝে থোকায় থোকায় ফুটে থাকা এসব ফুলে গ্রামীণ প্রকৃতিতে সৃষ্টি হয়েছে মনোরম দৃশ্য। প্রকৃতির এমন অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, পথচারী ও প্রকৃতিপ্রেমীরা।
সরেজমিনে নীলফামারী ডিমলা উপজেলার সিংগাহারা নদী এলাকার বিভিন্ন জলাশয় ও বিল ঘুরে দেখা যায়, পানিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কচুরিপানার গাছে থোকায় থোকায় ফুটে আছে বেগুনি ও সাদা রঙের ফুল। কোথাও কোথাও একসঙ্গে অসংখ্য কচুরিপানার ফুল ফুটে থাকায় দূর থেকে পুরো জলাশয়টিকেই মনে হচ্ছে বেগুনি-সাদা ফুলের প্রাকৃতিক গালিচা। কোনো কৃত্রিম আয়োজন ছাড়াই প্রকৃতির আপন নিয়মে ফুটে ওঠা এসব ফুল পথচারীদের দৃষ্টি কেড়ে নিচ্ছে।
চলার পথে এমন দৃশ্য চোখে পড়লেই অনেকেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। কেউ কেউ মুঠোফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে রাখছেন স্মৃতি হিসেবে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এসব মনোরম দৃশ্য নিয়ে বেশ আগ্রহ দেখা গেছে। অনেকের মতে, ব্যস্ত ও যান্ত্রিক জীবনের মধ্যে গ্রামীণ প্রকৃতির এমন স্বাভাবিক সৌন্দর্য মানুষের মনে এনে দেয় প্রশান্তি।
স্থানীয় শিক্ষার্থী সুলতান হোসেন বলেন, প্রতিদিনের পড়ালেখার ব্যস্ততা ও ক্লান্তির মধ্যে প্রকৃতির এমন সুন্দর দৃশ্য মনকে অনেকটা প্রফুল্ল করে তোলে। জলাশয়ের ফুলগুলো দেখতে সত্যিই ভালো লাগে।
কাজের ফাঁকে ঘুরতে আসা দুলাল বলেন, যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝে গ্রামবাংলার এমন শান্ত পরিবেশ ও ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে বেশ ভালো লাগে। প্রকৃতির এই স্বাভাবিক সৌন্দর্য মনে একধরনের প্রশান্তি এনে দেয়।
ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ সুন্দর খাতা গ্রামের বাসিন্দা শাহিনুর ইসলাম বলেন, একসময় বিল-ঝিলে অনেক বেশি কচুরিপানার ফুল দেখা যেত। এখন আগের মতো সব জায়গায় চোখে পড়ে না। এই ফুলের সঙ্গে আমাদের শৈশবের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এখনো ছোট ছোট শিশু-কিশোরদের ফুল নিয়ে আনন্দ করতে দেখি। তাদের দেখে নিজের শৈশবের কথা মনে পড়ে যায়।
তবে কচুরিপানার এই সৌন্দর্যের পাশাপাশি এর পরিবেশগত প্রভাবের দিকটিও বিবেচনায় নেওয়ার কথা জানিয়েছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা।
ডিমলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (কৃষিবিদ) মীর হাসান আল বান্না বলেন, সিংগাহারা নদীর বিলে কচুরিপানার ফুল দেখতে সুন্দর হলেও অতিরিক্ত কচুরিপানা জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। জলাশয়ে অতিরিক্ত কচুরিপানা ছড়িয়ে পড়লে পানিতে আলো-বাতাসের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং জলজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি জলাশয়ের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রকৃতিতে ঋতুবদলের এই সময়ে ডিমলার বিভিন্ন জলাশয়, বিল ও নিচু জমিতে ফুটে থাকা বেগুনি ও সাদা কচুরিপানার ফুল গ্রামীণ প্রকৃতিতে যোগ করেছে এক নতুন মাত্রা। সাধারণ ও অনেকটা অবহেলিত এই জলজ উদ্ভিদের ফুলই যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে—গ্রামবাংলার চিরচেনা সৌন্দর্য এখনো ছড়িয়ে আছে নিভৃত জলাশয়, বিল, নদী ও সবুজের মাঝে।
প্রকৃতির এমন দৃশ্য শুধু মানুষের চোখকেই প্রশান্তি দেয় না, একই সঙ্গে গ্রামীণ জনপদের জীববৈচিত্র্য ও ঋতুবৈচিত্র্যেরও জানান দেয়। কংক্রিটের নগরজীবনের বাইরে ডিমলার জলাশয়জুড়ে ফুটে থাকা কচুরিপানার ফুল তাই হয়ে উঠেছে প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের জন্য এক অনাড়ম্বর সৌন্দর্যের উৎস
আজকালের খবর/রাশেদুল মিলন
