পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে শ্যালকের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে বিপুল অর্থের সন্দেহজনক লেনদেন ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মনিরুল ইসলাম, তার স্ত্রী সাবেক অতিরিক্ত সচিব সায়লা ফারজানা এবং শ্যালক রেজাউল আলম শাহীন ও তার স্ত্রী সানজিদা খানম টুম্পাকে আসামি করে দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে একটি মামলায় প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার অর্থপাচার এবং অন্যটিতে প্রায় ৩৮ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, নিজের ও পরিবারের সম্পদের তথ্য গোপন করতে মনিরুল ইসলাম শ্যালকের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
শ্যালকের হিসাবে বিপুল লেনদেন: দুদকের অনুসন্ধানে মনিরুলের শ্যালক রেজাউল আলম শাহীনের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। সংস্থাটির অভিযোগ, এসব লেনদেনের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের উৎস আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। শাহীনের নামে প্রায় ২৩ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্যও পেয়েছে দুদক। এসব সম্পদের বৈধ আয়ের উৎস দেখাতে না পারার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
দুদকের উপপরিচালক মোজাম্মিল হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, মনিরুল ও তার স্ত্রী নিজেদের সম্পদের তথ্য গোপন করতে শ্যালকের কাছে অর্থ স্থানান্তর করেন। এ ক্ষেত্রে শাহীনের অনুকূলে ২৫ কোটি টাকা দান করার বিষয়টিও সামনে এসেছে। তবে ওই অর্থ হস্তান্তরের পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
চার সদস্যের নামে ৩৮ কোটি টাকার সম্পদ: মনিরুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে প্রায় ৩৮ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পৃথক মামলা করেছে দুদক। সংস্থাটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য স্থানে তাদের সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
দুদকের আবেদনে উল্লেখ করা ব্যাংক হিসাবের তথ্য অনুযায়ী, মনিরুলের নামে ১১টি হিসাবে প্রায় ৭৮ লাখ ৬১ হাজার টাকা এবং ৩ হাজার ৯৭৮ ব্রিটিশ পাউন্ড ছিল। তার স্ত্রী সায়লা ফারজানার পাঁচটি হিসাবে প্রায় ৮ লাখ টাকা পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, রেজাউল আলম শাহীনের ৪০টি হিসাবে প্রায় ১০ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী সানজিদা খানম টুম্পার ২৭টি হিসাবে প্রায় ৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা থাকার তথ্য আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৮৩ ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ: এর আগে গত ১৫ অক্টোবর ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত মনিরুল ইসলাম ও তার পরিবারের তিন সদস্যের নামে থাকা ৮৩টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দেন। এসব হিসাবে প্রায় ১৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা এবং ৩ হাজার ৯৭৮ ব্রিটিশ পাউন্ড থাকার তথ্য দুদকের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
দুদকের আশঙ্কা, ব্যাংক হিসাবে থাকা অর্থ সরিয়ে নেওয়া কিংবা বিদেশে স্থানান্তর করা হতে পারে। এ কারণে তদন্তের স্বার্থে হিসাবগুলো অবরুদ্ধ রাখার আবেদন করা হয়। আদালত সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদেশ দেন।
আরও অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে: মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিদেশি দুটি দাতব্য সংস্থার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও অনুসন্ধান করছে দুদক। সংস্থাটির আবেদনে বলা হয়েছে, জঙ্গিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে কুয়েতের কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ এবং শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায় ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আগে এসবি কার্যালয় থেকে ২৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্তও চলমান রয়েছে।
দুদকের দাবি, প্রাথমিক অনুসন্ধানে মনিরুল ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন স্থানে সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যাংক হিসাবের অর্থের উৎস, সন্দেহজনক লেনদেন এবং সম্পদ অর্জনের বৈধতা যাচাই করে মামলাগুলোর তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হবে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আসামিদের বক্তব্য ও আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত দায় নির্ধারিত হবে।
