চীনের ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের ডংলু ক্যাম্পাসে গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) শুরু হয়েছে ‘চীন-দক্ষিণ এশিয়া সভ্যতা ও যোগাযোগবিষয়ক দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন’। চীনের ইউনান বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে সম্প্রীতি, সবার জন্য ঐক্য’।
সম্মেলনে চীন, বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের ৬০ জনের বেশি বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও শিক্ষাবিদ অংশ নিয়েছেন।
সম্মেলনটি আয়োজন করেছে সেন্টার ফর চায়না-সাউথ এশিয়া সোশ্যাল অ্যান্ড কালচারাল স্টাডিজ (সিএসএসসিএস)। চীনের ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব এথনোলজি অ্যান্ড সোসিওলজি এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এ কেন্দ্রের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর আয়োজক সহযোগী হিসেবে রয়েছে ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সাউথওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার এথনিক মাইনরিটি স্টাডিজ, যা চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রতিষ্ঠান।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চীনের ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট মা ওয়েনহুই বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণে চীন ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দুই হাজার বছরের বেশি সময় ধরে এ অঞ্চলের সভ্যতাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও বিনিময় চলে আসছে।
অনুষ্ঠানে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী বলেন, ইউনান বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির মধ্যে দুই দশকের বেশি সময় ধরে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক রয়েছে। ২০০৬ সালে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এ সম্পর্কের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালে চীন-দক্ষিণ এশিয়া সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধ্যয়নকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয়।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহ-উপাচার্য অধ্যাপক নেছার ইউ আহমেদ এবং ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহসভাপতি অধ্যাপক ইয়াং শাওজুন দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সহযোগিতাবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেন। একই অনুষ্ঠানে নৃতত্ত্ব বিষয়ে যৌথ ‘২+১+১’ স্নাতক কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। এই উদ্যোগ দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক অংশীদারত্ব ও যৌথভাবে শিক্ষার্থী তৈরির কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আয়োজকেরা আশা করছেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর অনুষ্ঠিত মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা পর্বে চীন ও বিভিন্ন দেশের শিক্ষাবিদেরা তাঁদের গবেষণা তুলে ধরেন। চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিং জুন ‘বৈশ্বিক দক্ষিণের’ দৃষ্টিকোণ থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সার্বভৌমত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের (এসআইপিজির) পরিচালক অধ্যাপক এস কে তৌফিক এম হক একবিংশ শতাব্দীতে চীন-দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কের সম্ভাবনা ও কাঠামোগত বৈপরীত্য বিশ্লেষণ করেন।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বুলবুল আশরাফ সিদ্দিকী তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর নিয়ে আলোচনা করেন।
ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হে মিং চীনা সমাজবিজ্ঞানী ফেই শিয়াওতংয়ের দর্শনের আলোকে চীন ও দক্ষিণ এশিয়ার সভ্যতাগুলোর পারস্পরিক শিক্ষা ও বোঝাপড়ার তাত্ত্বিক ভিত্তি, সমসাময়িক গুরুত্ব এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ব্যাখ্যা করেন। ফেই শিয়াওতংয়ের দর্শনের মূল বক্তব্য হলো—নিজের সংস্কৃতির সৌন্দর্য উপলব্ধি করা, অন্যের সংস্কৃতির সৌন্দর্যকে স্বীকৃতি দেওয়া, সব সংস্কৃতির সৌন্দর্য ভাগাভাগি করা এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ঐক্যের ভিত্তিতে একটি বিশ্ব গড়ে তোলা।
তিন দিনের সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী গবেষকেরা সাতটি অধিবেশনে নিজেদের গবেষণা উপস্থাপন করেন। এসব অধিবেশনে দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে চীনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক, অবকাঠামোগত যোগাযোগ, গণমাধ্যম ও যোগাযোগ, সভ্যতার মধ্যে বিনিময় ও পারস্পরিক শিক্ষা, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, আঞ্চলিক উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের জ্ঞান উৎপাদন ও উন্নয়ন সহযোগিতার মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
