মৃণাল ঘোষ: ভারতে গত শতকের ছয়ের দশকে প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্ত শিল্পীদের গড়ে তোলা আধুনিকতাবাদী প্রকল্পে যোগেন চৌধুরী (১৯৩৯-২০২৬) সর্বাগ্রগণ্য শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর খ্যাতি প্রায় আন্তর্জাতিক। আবিশ্ব আধুনিকতাবাদের ধারায় নিজস্ব এক ‘আইডেনটিটি’ তৈরি করেছেন। তাঁর রূপচেতনা বিকশিত হয়েছে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা তথা ভারতের ক্ষয়ে যেতে থাকা বাস্তবতাকে মথিত করে।
যোগেন চৌধুরী বাস্তববাদী ও প্রতিবাদী শিল্পী। বাস্তবতাকে কল্পরূপাত্মকভাবে বিশ্লিষ্ট করেছেন। তা থেকেই সৌন্দর্যের স্বতন্ত্র এক ভাষ্য তৈরি করে নিয়েছেন। কলুষ নিষ্কাশিত সৌন্দর্যের এক আঁধার-দীর্ণ রূপ। বিংশ ও একবিংশ শতকের ভারতীয় আধুনিকতায় এটাই যোগেন চৌধুরীর অন্যতম প্রধান অবদান।
জন্ম ১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। অখণ্ড বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার ডহরপাড়া গ্রামে। বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী, মা ইন্দুদেবী চৌধুরাণী। ’৪৭-এর দেশভাগ দুই বাংলার মানুষের মতো তাঁর অস্তিত্বেও প্রবল অভিঘাত হেনেছিল। বলা যায়, তঁার সমগ্র বিশ্বদৃষ্টি ও শিল্পদৃষ্টি নির্ধারিত হয়েছে এই একটি মর্মন্তুদ ঘটনা দ্বারা।
যোগেন কলকাতায় চলে আসেন ওই ’৪৭ সালেই, মায়ের সঙ্গে। বাকি পরিবার আসে ’৪৮ সালে। একটি সচ্ছল সংস্কৃতিমনস্ক পরিবার দেশভাগের পর উদ্বাস্তু হয়ে এ দেশে চলে এল। প্রথম কিছু দিন এখানে-ওখানে কাটিয়ে ১৯৫১ সাল থেকে ঢাকুরিয়ার শহিদনগর উদ্বাস্তু কলোনিতে হল তাঁদের তখনকার মতো স্থায়ী আবাস। এক স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, ‘আলো নেই। দোকানে ধার। বাড়িতে যাতায়াতের পথে মুদিকে সন্তর্পণে এড়িয়ে চলা।’ (‘দেশ’ পত্রিকা। ৪ জানুয়ারি, ১৯৮৬)। এই আলোহীনতা অর্থাৎ বৈদ্যুতিক আলো না থাকা, লণ্ঠনের আলোয় কাজ করা সেই সময় থেকেই তঁার ছবির আঙ্গিকে বিশেষ এক বৈশষ্ট্য এনেছে। জীবনের অন্তর্লীন অঁাধারকে ছবির ভিতর প্রতিফলিত করেছে।
১৯৫৫ সালে স্কুল ফাইনাল পাস করেন। ওই বছরই ভর্তি হন কলকাতার গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজে। ’৬০ সালে আর্ট কলেজের শিক্ষা শেষ করেন। ’৬৫-তে ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে প্যারিসে যাওয়ার সুযোগ পান উচ্চতর শিক্ষার জন্য। জীবনে নতুন দিগন্ত খুলে যায়। ওখানে শিক্ষানবিশি করেন ‘একোল দে বোজার’ (École des Beaux-Arts) ও ‘আতঁালিয়ে্যহ্ ১৭’ (Atelier 17)-এ।
’৬৮-র ফেব্রুয়ারিতে দেশে ফিরে আসেন। অল্প কিছু দিন কলকাতায় থেকে উইভার্স সার্ভিস সেন্টারের চাকরিতে বদলি হয়ে যান মাদ্রাজে। বিদেশ থেকে ফিরে আসার পর বেশ কিছু দিন তিনি এক ধরনের বিহ্বলতায় আচ্ছন্ন ছিলেন। এত কাজ হয়ে গিয়েছে বিশ্বজুড়ে। এরপরে ভারতের এক নবীন শিল্পীর প্রকাশের পথ কী হবে? এই নিয়ে সংশয়। অনেক অনুসন্ধানের পর পৌঁছেছিলেন এক শিখরে। নতুন এক চিত্রধারা নির্গত হয়েছিল মাদ্রাজ পর্বে। সেখানে যৌন মনস্তত্ত্বকে ভিত্তি করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন কল্পরূপাত্মক এক চিত্রধারা।
১৯৭০ সালে যোগেন চৌধুরী ‘ক্যালকাটা পেইন্টার্স’ দলে যোগ দেন। ’৭২ পর্যন্ত ছিলেন মাদ্রাজে। ওই বছরই নতুন চাকরি নিয়ে চলে যান দিল্লি। রাষ্ট্রপতি ভবনের চিত্রসম্ভার রক্ষণাবেক্ষণে ‘কিউরেটর’-এর চাকরি। ১৯৮৭ পর্যন্ত দিল্লিতে ছিলেন। সেখানে নিবিষ্ট পরিচয় হয় ভারতের রাজনীতি ও অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা বহু মানুষের সঙ্গে। ভারতীয় বাস্তবতার সঙ্গে তঁার যে পরিচয় ঘটেছিল শৈশবে দেশভাগের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে, তার আরও কূটিল রূপ দেখার সুযোগ হল দিল্লিতে দীর্ঘদিন অবস্থানের ফলে। তাঁর চিত্রচেতনা প্রবলভাবে প্রতিবাদী হয়ে উঠল।
আঙ্গিকেও এল তীক্ষ্ণ এক শ্লেষের ভঙ্গি। স্বাভাবিকতাবাদ কল্পরূপে বিশ্লিষ্ট হয়ে নতুন এক রূপকল্প গড়ে তুলল। গড়ে উঠল প্রতিবাদী চেতনার এক নতুন অভিমুখ। তাঁর রূপায়ণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ হয়ে উঠল আয়তনময় এক থলথলে মাংসপিণ্ড। যেন কর্কটরোগাক্রান্ত। শরীরের বাহুল্য আছে শুধু। কোনও সত্তা নেই। ব্যবসায়ী ও রাজনীতির মানুষের প্রতিমাকল্প এসেছে অজস্র। থলথলে শরীর। মাথায় একটি ক্ষুদে গান্ধীটুপি চাপানো। একটি চালকুমড়ো হয়ে উঠেছে বুদ্ধিজীবীর প্রতীক। পুরুষের শরীরকে অনেক সময়ই তিনি বেঢপ ও বিকৃত করেছেন, কিন্তু নারীর সৌন্দর্যকে অমলিন রাখার চেষ্টা করেছেন।
নিজের যৌন-চেতনাকে প্রকট করেছেন আবার অনেক সময়ই। দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায় ১৯৭৫ সালের ‘নটী বিনোদিনী’ ছবিটির কথা। এত মায়াময় দৃষ্টিসম্পন্না মানবীর স্তন দু’টিকে পোশাকের অন্তরাল থেকে নিষ্কাশিত করে দর্শকের চোখের সামনে প্রকট করে তুলেছেন।
১৯৮৭-তে দিল্লির চাকরি ছেড়ে চলে আসেন শান্তিনিকেতন। বিশ্বভারতীর কলাভবনে অধ্যাপনায় যোগ দেন ওই বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি। জীবনে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। শিক্ষকতাই যে তঁার প্রকৃত কাজ, এ কথা প্রতিষ্ঠিত হল শান্তিনিকেতন পর্বে। সেখানকার প্রকৃতি, মানুষজন, রাবীন্দ্রিক আদর্শ, অনেক নিবিষ্ট শিল্পী ও শিক্ষকের সসঙ্গে পরিচিত হয়ে আলোকিত হয় তঁার নিজস্ব বোধ। কলুষকে আত্মস্থ করেই সৌন্দর্যের এক নতুন ভাষা গড়ে তোলেন তিনি।
একবিংশ শতকে দেশ ও বিশ্বের পরিস্থিতি ক্রমশই হয়ে উঠতে থাকল আরও হিংসা-ভারাক্রান্ত। ২০০৪ সালে ইরাকের যুদ্ধে আবু ঘ্রাইবে বন্দিদের উপর যে নৃশংস অত্যাচার করা হয়, সেটা তাঁকে গভীরভাবে তাড়িত করে। একের পর এক ছবিতে তার বিরুদ্ধে তিনি প্রতীকী ভাষ্য গড়ে তুলতে থাকেন। একটি মানুষের উন্মুক্ত শরীরে প্রকট হয় ছুরি দিয়ে কাটার দীর্ঘ এক রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্ন। এরকম প্রতিমাকল্প বারবার আসতে থাকে তাঁর একাধিক ছবিতে।
পাশাপাশি উন্মীলিত হতে থাকে সৌন্দর্যের অন্য এক স্বতন্ত্র অভিজ্ঞান। আঁকতে থাকেন ফুল, লতা, পাতা ইত্যাদি। স্থূল অথচ সুরেলা লৌকিক রেখায় রূপায়িত হতে থাকে প্রকৃতি ও জীবনের নানা অনুষঙ্গ।
দেশভাগের আলেখ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল তঁার শিল্পীজীবন। সেই দুঃখের স্ফুলিঙ্গ ধীরে ধীরে বিস্তারিত হয়েছে সারা জীবনের কাজের মধ্যে। সেই দুঃখ থেকেই জেগে উঠেছে সৌন্দর্যের নানা শাখা-প্রশাখা। তা থেকেই নিষ্কাশন করছেন অনুপম এক সৌন্দর্য। ছয়ের দশকের আধুনিকতাবাদী শিল্পীরা যে-প্রকল্পে কাজ করছিলেন, তাকেই নিজের মতো করে বহু দূর
বিস্তৃত করেছেন শিল্পী যোগেন চৌধুরী।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক বিশিষ্ট শিল্প সমালোচক
