তাঁদের আয়ু অনেক বেশি! কেউ একশো বছর বাঁচেন, কেউ বা তারও বেশি! ইটালির সার্ডিনিয়াতে এমন এক ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামের খোঁজ পেয়েছেন গবেষকেরা, যেখানে নারীরা নজিরবিহীন দীর্ঘ জীবনের অধিকারিণী। বছর কুড়ি আগে বৈজ্ঞানিকেরা সার্ডিনিয়াতে পৃথিবীর প্রথম ‘ব্লু জ়োন’ চিহ্নিত করেছিলেন। ‘ব্লু জ়োন’ অর্থাৎ অনেকগুলি এলাকা মিলিয়ে একটি ভৌগোলিক অঞ্চল, যেখানে মানুষের জীবনধারণের ক্ষমতা তুলনামূলক ভাবে বেশি। সম্প্রতি চিহ্নিত বোলোটানা গ্রামটি এই অঞ্চল থেকে ১১০ কিলোমিটার পশ্চিমে। সেখানকার মানুষের, বিশেষ করে নারীদের, ১০০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ব্লু জোনের মানুষের চেয়েও বেশি, বলছে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন পাব্লিশিং’ শীর্ষক পত্রিকায় প্রকাশিত একটি গবেষণা।
২০১৪ সালে শুরু হওয়া এই গবেষণার দায়িত্বে ছিল ইটালি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাত জন বৈজ্ঞানিকের একটি দল। তাঁরা কেউ ইটালির সাসারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, কেউ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের গবেষণায় জানা গিয়েছে, বিগত তিরিশ বছরে বোলোটানায় যে নারীরা সত্তরের গণ্ডি পেরিয়েছেন তাঁদের মধ্যে ১৩.৮ শতাংশ পরে একশোও ছুঁয়েছেন। এই পরিসংখ্যানের নিরিখে বোলোটানাবাসী নারীরা একমাত্র হংকঙের নারীদের থেকে পিছিয়ে। খোদ ইটালিতেও সত্তরের গণ্ডি পেরিয়ে একশো বছর বেঁচেছেন মাত্র ৩.৫ শতাংশ নারী। যেখানে বিশ্ব জুড়ে সংখ্যাটি মাত্র ২ শতাংশ, সেখানে বোলোটানাবাসী নারীদের এই অভাবনীয় জীবনীশক্তি তাক লাগিয়ে দিয়েছে বৈজ্ঞানিকদের।
বোলোটানার মোট জনসংখ্যা ২২৬৬। ছোট জনগোষ্ঠী হওয়ার দরুণ স্থানীয় গির্জা এবং কবরস্থান থেকে বিগত একশো বছরের জন্ম ও মৃত্যু সংক্রান্ত নথি জোগাড় করতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি গবেষকদের। নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গিয়েছে, ১৯০০ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যে যাঁদের জন্ম, তাঁদের মধ্যে ৩৮ জনের আয়ু একশোর বেশি। ইতালিতে শতায়ু মানুষের গড় সংখ্যার তুলনায় তা ৫৭ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালে ওই ৩৮ জনের মধ্যে ১২ জন বেঁচেছিলেন। চলতি বছরে মৃত্যু হয়েছে আরও ছ’জনের। যে ক’জন বেঁচে আছেন তাঁরা সকলেই নারী। তাঁদের মধ্যে দু’জনের বয়স ১০২। আবার পরের বছর ১০০ ছোঁবেন বেশ কয়েক জন বোলোটানাবাসী।
গবেষণার আরও একটি দিক আছে। গোটা বিশ্বে আরও চারটি ‘ব্লু জ়োন’ চিহ্নিত করা গিয়েছে— জাপানের ওকিনায়া, কোস্টা রিকার নিকোয়া উপদ্বীপ, গ্রিসের ইকারিয়া ও ক্যালিফোর্নিয়ার লোমা লিনডা। গবেষকদের অবাক করেছে, এই চারটি ‘ব্লু জ়োন’ আয়তনে না-বাড়লেও সার্ডিনিয়ারটি কিন্তু এখনও বেড়ে চলেছে। বোলোটানা তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। তা না হলে ‘ব্লু জ়োন’ থেকে ১১০ কিলোমিটার দূরে নারীদের এই আয়ুবৃদ্ধির আর কী কারণ থাকতে পারে?
গবেষকদের দলটির নেতৃত্বে ছিলেন সাসারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক জিয়োভানি মারিও পেস। তিনি নিজেও সার্ডিনিয়ার বাসিন্দা। তাঁর প্রপিতামহ বেঁচেছিলেন ১১০ বছর এবং মা বেঁচেছিলেন ১০১ বছর। তিনি ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকাকে একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ২৫ বছরে প্রথম বার নির্দিষ্ট ব্লু জোনের বাইরে কোথাও মানুষের আয়ু বাড়তে দেখা গেল। কিন্তু বোলোটনা অন্যান্য ব্লু জোনের চেয়ে একটু হলেও আলাদা। সেখানে পুরুষের চেয়ে নারীর আয়ু বেশি। যদিও নারীরা জৈবিক কারণেই পুরুষদের তুলনায় বেশিদিন বাঁচে। কিন্তু বোলোটানাবাসী নারীদের আয়ু পাশ্চাত্যের অন্যান্য নারীর তুলনায়ও বেশি। আমেরিকায় ৭০ পেরিয়ে ১০০ ছুঁয়েছেন যে সংখ্যক নারী, বোলোটনায় সেই সংখ্যা প্রায় তিন গুণ।’’
এ বার প্রশ্ন, কী ভাবে? এই আয়ুবৃদ্ধি রহস্যের পিছনে বৈজ্ঞানিক যুক্তিসঙ্গত কারণ সে ভাবে কিছু পাওয়া যায়নি এখনও। ভবিষ্যতে বিস্তারিত গবেষণায় এর রহস্য জানা যেতে পারে বলে ধারণা গবেষকদের। তবে কিছু অনুমান করেছেন তাঁরা। যেমন, স্থানীয় কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলে জিয়োভানি লক্ষ করেন বোলোটানাবাসীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের টান খুবই জোরালো। যে কোনও পালা-পরব একজোট হয়ে পালন করা থেকে শুরু করে বিপদের সময় একে অপরের পাশে দাঁড়ানো— সাম্প্রদায়িক সম্মন্বয়ে কোথাও খামতি রাখেন না তাঁরা।
বোলোটানার মেয়র ফ্রান্সেসকো মানকোনির সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছিল ইটালির সংবাদপত্র ‘কোরিয়েরে দেল্লা সেরা’)। তাঁর বক্তব্য, ‘‘আমি বৈজ্ঞানিক নই। কিন্তু আমার মনে হয়, এই আয়ুবৃদ্ধির কারণ একটা নয়, অনেক। এখানে মানুষ তাজা ফলমুল, শাকসব্জি খেয়ে বড় হয়। কীটনাশকের ব্যবহার প্রায় হয় না বললেই চলে। এই অঞ্চলের আবহাওয়াও অত্যন্ত মনোরম। দুষণের মাত্রা কম। তা ছাড়া এখানে গাড়িঘোড়ার বিশেষ চল নেই। মানুষ হেঁটে যাতায়াত করতে স্বচ্ছন্দ। বয়স্করাও দিনে প্রায় ২০ কিলোমিটার হাঁটেন। তাঁদের মধ্যেও বেশির ভাগ কিন্তু নারী।’’
