ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে বিতর্কের আবহে মঙ্গলবার নিজেদের অবস্থান জানিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। কমিশনের অন্দরে মতবিরোধ রয়েছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা খারিজ করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু ও বিবেক জোশী সুপ্রিম কোর্টে যৌথ হলফনামা জমা দিয়েছিলেন। আর তার জবাবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চের মন্তব্য— ‘‘আমরা সবই জানি।’’ সেই সঙ্গেই শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, এসআইআর সংশ্লিষ্ট সমস্ত পদক্ষেপ খতিয়ে দেখা হবে।
মঙ্গলবার শীর্ষ আদালতে এসআইআর সংক্রান্ত মামলার শুনানির আগে কমিশনের তরফে ওই হলফনামা জমা দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, কমিশনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও মতান্তর নেই। সাংবিধানিক বিধি মেনেই যাবতীয় সিদ্ধান্ত হয়েছে। কোনও বিষয়ে ভিন্নমত মানেই মতবিরোধ নয় জানিয়ে হলফনামায় কমিশন বলেছে, ‘কোনও সিদ্ধান্তগ্রহণের নিয়ে আলোচনা চলাকালীন সদস্যদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত বা প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু তা মতবিরোধ বলে চিহ্নিত করা ঠিক নয়’। কমিশনের দাবি, বিধি অনুযায়ী ফাইল প্রথমে নির্বাচন কমিশনারদের কাছে যায়, তার পর মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কাছে পৌঁছয়। জরুরি ক্ষেত্রে অনলাইনেও অনুমোদন নেওয়া হয়, পরে তা নথিভুক্ত করা হয়।
কোনও ফাইলে নির্বাচন কমিশনারদের লেখা নোট বা প্রশ্নকে কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে ধরা যায় না। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতেই মামলাগুলি করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা। অভ্যন্তরীণ কোনও নথি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের অনুমতি কমিশন দেয়নি বলেও হলফনামায় জানানো হয়েছে। কমিশনের জমা দেওয়া হলফনামার বিস্তারিত জবাব দেওয়ার জন্য মামলাকারীদের আইনজীবী ১০ দিন সময় চাইলে আদালত তা মঞ্জুর করেছে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ। মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে ১৭ নভেম্বর।
এসআইআরে অনিয়মের অভিযোগ, ফর্ম ৬-এ নিয়ম বদল এবং একতরফা ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ— এ রকম বেশ কয়েকটি বিষয়ে মামলা দায়ের হয়েছিল মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে। সেই মামলাগুলি একত্রিত করে মঙ্গলবার শুনানি শুরু হয় সুপ্রিম কোর্টে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং ভি মোহনার ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়। উল্লেখ্য, সোমবার সুপ্রিম কোর্টে যে হলফনামা জমা দেয় কমিশন, সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, ২০২৫ সালের জুন, ২০২৫ সালের অক্টোবর এবং ২০২৬ সালের মে মাসে এসআইআর নিয়ে যে তিনটি নির্দেশ জারি করা হয়েছিল, সেগুলি সর্বসম্মতিক্রমেই নেওয়া হয়েছিল।
পাশাপাশি, ফর্ম ৬ সংশোধনের অভিযোগও খারিজ করেছে কমিশন। তাদের বক্তব্য, ফর্মটি সংশোধন করার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের। এসআইআর-এর জন্য নেওয়া ঘোষণাপত্রটি আলাদা নথি। তবে অনলাইন আবেদনের সঙ্গে সেটি যেভাবে দেখানো হয়েছিল, তাতে ফর্ম ৬ সংশোধন করা হয়েছে বলে কারও মনে হতে পারে, তা-ও স্বীকার করেছে কমিশন। প্রসঙ্গত, ফর্ম ৬ ব্যবহার করে নতুন ভোটারেরা ভোটার তালিকায় নাম তোলার আর্জি জানান। এ বার এসআইআরের সময় নতুন ভোটারদের ফর্ম ৬-এর সঙ্গে দেওয়া অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রে জানাতে হয়েছে, আগের এসআইআরে তাঁদের নিজের, বাবা-মা বা পিতামহ বা পিতামহীর নাম ছিল কি না। সেই নিয়ে তৈরি হয় বিতর্ক। এ নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল, এর ফলে বৈধ ভোটারদের নামও বাদ পড়তে পারে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন বলছে, নির্বাচন কমিশনার সঁধু সতর্ক করেছিলেন যে, সরকার এই সংক্রান্ত ১৯৬০ সালের রেজিস্ট্রেশন অফ ইলেক্টর্স রুলস-এ সংশোধন করার আগে ফর্ম বদলানো ঠিক হবে না। কারণ, আইন বলছে, সংশোধন না-করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। কিন্তু সেই সতর্কতা কানে তোলা হয়নি বলে অভিযোগ। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সঁধু ফর্ম ৬-এ ওই পরিবর্তনকে ‘অননুমোদিত এবং বেআইনি’ বলে আপত্তি জানিয়েছিলেন এবং তা প্রত্যাহারের কথা বলেছিলেন। ২৬ সেপ্টেম্বর বিবৃতি দিয়ে কমিশন দাবি করেছিল, ফর্ম ৬ আবেদনের সঙ্গে ভোটারদের যে ঘোষণাপত্র দিতে হয়েছে, তা বহাল রেখেছিল সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু গত ৫ অক্টোবর প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ সরাসরি কমিশনের দাবির সত্যতা খারিজ করে বলেছিল— ‘‘ফর্ম ৬-এর পরিবর্তনের কোনও অনুমোদন দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট।’’
কারা সেই পরিবর্তনে অনুমোদন দিয়েছিল, তা-ও জানতে চেয়েছে শীর্ষ আদালত। কমিশন জানিয়েছিল, এসআইআর প্রক্রিয়া ছাড়া অন্য সময়ে ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য ১৯৬০ সালের রেজিস্ট্রেশন অফ ইলেক্টর্স নীতি মেনে সাধারণ ফর্ম ব্যবহার করতে হয়। এখনও সেই বিধি অনুসৃত হচ্ছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ কার্যপদ্ধতি বিষয়ে ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গের নির্দেশিকা এবং তাঁর আচরণের বিষয়ে ক্যাবিনেট সচিব টিভি সোমনাথনকে আলাদা ভাবে চিঠি পাঠিয়েছিলেন দুই কমিশনার— হলফনামায় সে কথা অস্বীকার করেনি কমিশন। তবে তারা এ-ও জানিয়েছে, দুই নির্বাচন কমিশনারের ‘যৌথ নির্দেশের’ প্রেক্ষিতে ওই নির্দেশিকাটি ‘কখনওই কার্যকর হয়নি’। সুপ্রিম কোর্ট মঙ্গলবার স্পষ্ট জানিয়েছে, এসআইআর প্রক্রিয়া এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি আইনি ও বিধিবদ্ধ নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করা হবে।
