কানাডায় কাজের অনুমতিপত্র (ওয়ার্ক পারমিট) ও স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক বাংলাদেশি নারীকে মানব পাচার, শ্রম শোষণ ও যৌন নির্যাতনের দায়ে দুই বাংলাদেশিকে কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির আদালত। সাজাপ্রাপ্ত মোহাম্মদ মাসুমকে ১৪ বছর এবং সোহেল হায়দারকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
কানাডার স্থানীয় গণমাধ্যম সিবিসি নিউজ ও সিটিভি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২২ অক্টোবর সাসকাচুয়ান প্রদেশের সাসকাটুনের প্রাদেশিক আদালতের বিচারক মিগুয়েল মার্টিনেজ এ রায় ঘোষণা করেন। আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মানব পাচার, যৌন নিপীড়ন ও শ্রম শোষণের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে এ সাজা দেওয়া হয়।
চাকরি ও স্থায়ী বসবাসের প্রলোভন
আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগী ওই নারী বাংলাদেশে প্রায় ১৮ বছর সরকারি চাকরি করেছেন। পরবর্তী সময়ে কানাডায় রেস্তোরাঁয় চাকরি এবং ভবিষ্যতে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়ার আশায় তিনি দেশটিতে যান।
২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত তিনি কানাডার সাসকাচুয়ান প্রদেশের গাল লেক ও টিসডেল এলাকার বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। তবে উন্নত জীবন ও কর্মসংস্থানের আশায় কানাডায় গেলেও একপর্যায়ে তাকে শোষণমূলক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
দীর্ঘ সময় কাজ, বেতন বঞ্চনা ও যৌন নির্যাতন
অভিযোগ ও আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ওই নারীকে সপ্তাহে ছয় দিন দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে বাধ্য করা হতো। কাজের তুলনায় তাকে যথাযথ মজুরি দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি তার কাজের অনুমতিপত্র নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করা হয়।
একপর্যায়ে মোহাম্মদ মাসুম ওই নারীর পাসপোর্ট নিজের কাছে রেখে দেন। পরে তার ওপর একাধিকবার যৌন নির্যাতন চালানো হয়। আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণে এসব অপরাধের বিষয়টি উঠে আসে।
মামলায় মাসুম মানব পাচার ও যৌন নিপীড়নের তিনটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। অন্যদিকে, সোহেল হায়দার মানব পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে চার বছরের কারাদণ্ড পান।
যেভাবে শোষণের পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসেন
পরে এলরোজ এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় কাজের অনুমতিপত্র নিয়ে যাওয়ার পর স্থানীয় কয়েকজনের সহযোগিতা পান ওই নারী। তাদের সহায়তায় তিনি শোষণমূলক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। এরপর তিনি আইনি সহায়তা নেন এবং ঘটনাটি আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
মামলার বিচার শেষে আদালত কারাদণ্ডের পাশাপাশি ভুক্তভোগীর বকেয়া মজুরি পরিশোধেরও নির্দেশ দিয়েছেন। রায় অনুযায়ী, মোহাম্মদ মাসুমকে ১২ হাজার ২৬৮ কানাডীয় ডলার এবং সোহেল হায়দারকে ৫ হাজার ৮৮৫ কানাডীয় ডলার ১৬ সেন্ট পরিশোধ করতে হবে।
ভুক্তভোগীর জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ওই নারী জানান, এ ঘটনার কারণে তার জীবন, সম্মান, ভবিষ্যৎ, পরিবার ও পেশাগত জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। পাশাপাশি অন্যদের বিশ্বাস করার ক্ষেত্রেও আগের মতো স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না।
ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখতে আদালত মামলাটির তথ্য প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। এ কারণে তার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য সতর্কবার্তা
কানাডার এ ঘটনা বিদেশে কাজ করতে আগ্রহী এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ খুঁজছেন—এমন ব্যক্তিদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চাকরি, ওয়ার্ক পারমিট কিংবা স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে কাজে লাগিয়ে কোনো ব্যক্তিকে শ্রম শোষণ বা মানব পাচারের শিকার করা গুরুতর অপরাধ।
বিশেষ করে বিদেশে চাকরির প্রস্তাব গ্রহণের আগে নিয়োগদাতা, কাজের শর্ত, বেতন, অনুমতিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে পাসপোর্ট ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নথি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
আদালতের এ রায়ে মানব পাচার ও শ্রম শোষণের অভিযোগে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভুক্তভোগীর বকেয়া মজুরি পরিশোধের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
The post কানাডায় নারীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে দুই বাংলাদেশির কারাদণ্ড appeared first on SATV.
