ত্রিশের কোঠায় থাকা অনেক মানুষের জীবনেই এখন চলছে প্রত্যাশা আর সামর্থ্যের হিসাব মেলানোর লড়াই। ভালো চাকরি ও নিয়মিত আয় থাকা সত্ত্বেও বাড়ি কেনা, বিয়ে করা, সন্তান নেয়া কিংবা আর্থিক নিরাপত্তা গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে তাদের জন্য। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষাঋণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি খরচে অনেকেই পিছিয়ে দিচ্ছেন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে বসবাসকারী ৩১ বছর বয়সী বিপণন পরিচালক ড্যান ইয়ামাত্তেও জানান, তার পরিচিত প্রায় সবাই অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছেন। স্বচ্ছন্দ মধ্যবিত্ত জীবন গড়তে যে খরচ ও পরিশ্রম প্রয়োজন, তা সামলানো কঠিন হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ত্রিশের কোঠার মানুষের এই হতাশা এখন জীবনযাপন, রাজনীতি ও জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনেও প্রভাব ফেলছে।
সম্প্রতি প্রায় দুই ডজন তরুণ-তরুণীর সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে, প্রাপ্তবয়স্ক জীবন নিয়ে তাদের প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার বড় ব্যবধান। অনেকে পূর্ণকালীন কাজ করেও খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছেন। সেলুনে যাওয়া, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া কিংবা তাজা ফল কেনার মতো ব্যয়ও কমাচ্ছেন তারা। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয় না বাড়া এবং স্বাস্থ্যসেবার উচ্চ ব্যয় পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
হার্ভার্ড ইয়ুথ পোলের এক জরিপে প্রথমবারের মতো দেখা গেছে, আগের প্রজন্মের তুলনায় অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা করা তরুণ আমেরিকানের সংখ্যাই বেশি। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপেও উঠে এসেছে, বর্তমান তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য আর্থিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জন আগের প্রজন্মের তুলনায় কঠিন বলে মনে করেন অধিকাংশ আমেরিকান। গত এক দশকে সন্তান লালন-পালনের খরচ বহন করা অসম্ভব বলে মনে করা মানুষের হার বেড়েছে ২০ শতাংশ পয়েন্ট।
নিউইয়র্কে ৩০ বছর বয়সী তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষক অ্যাডাম ক্রিটেনডেন বিয়ে, সন্তান নেয়া ও দুই শয়নকক্ষের অ্যাপার্টমেন্টে থাকার কথা ভাবছেন। কিন্তু এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সামর্থ্য নিয়ে অনিশ্চিত তিনি। ম্যানহাটনে দুই শয়নকক্ষের অ্যাপার্টমেন্টের মধ্যম চাওয়া ভাড়া মাসে ৬ হাজার ডলার। ক্রিটেনডেনের ভাষায়, ৩০ বছর বয়সের মধ্যে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য পূরণের যে ধারণা ছিল, তার অনেক কিছুই এখন নাগালের বাইরে।
এই সংকটের প্রভাব পড়ছে পরিবার গড়ার সিদ্ধান্তেও। নিউইয়র্কের কুইন্সে বেড়ে ওঠা ৩১ বছর বয়সী শিক্ষক ফিওনা কার্নস ও তার স্বামী বড় বাসায় যাওয়ার এবং সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু সাধ্যের মধ্যে বাসা না পাওয়ায় তাদের পরিকল্পনা পিছিয়ে গেছে। ফিওনা বলেন, দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করেও এমন পরিস্থিতিতে পড়া হতাশাজনক।
অন্যদের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। থিয়েটার প্রশাসনে কাজ করা ৩১ বছর বয়সী আলি সুসার চিকিৎসায় নিজের পকেট থেকে ৪ হাজার ৮০০ ডলার খরচ হয়েছে; এ জন্য তাকে পরিবারের সাহায্য নিতে হয়েছে। বছরে প্রায় ৫২ হাজার ডলার আয় করলেও তার সঞ্চয় প্রায় নেই বললেই চলে। অন্যদিকে, নিউইয়র্কের এক তরুণ দম্পতি জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর ২০২০ সালের তুলনায় স্বামীর আয় বেড়েছে মাত্র প্রায় ৫ হাজার ডলার। স্ত্রীর শিক্ষাঋণের কিস্তি আবার এক রাতেই ৬০০ ডলার বেড়ে গেছে।
অনেকের কাছে হতাশার জায়গাটি শুধু অর্থের অভাব নয়, বরং পরিশ্রমের পরও আগের প্রজন্মের মতো জীবন গড়তে না পারা। সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া এক দম্পতির কথায়, ‘আমাদের যা যা করার কথা ছিল, সবই করেছি। কিন্তু তাতে আমরা যতটা এগিয়ে যাওয়ার কথা, তার ধারেকাছেও যেতে পারিনি।’
তবে গবেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের প্রচলিত সময়সীমা নিয়ে অতিরিক্ত হতাশ হওয়ার কারণ নেই। বাস্তবে বিয়ে, সন্তান ও বাড়ির মালিক হওয়ার মতো লক্ষ্য পূরণের সময় বদলেছে। তবু অনেকের কাছে ত্রিশের কোঠা এখন জীবনের মাইলফলক অর্জনের সময়ের চেয়ে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াইয়ের সময় হয়ে উঠেছে।
