লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার আমঝোল সীমান্তে ভারত থেকে আসা বাঘটি ড্রোনে শনাক্ত হলেও ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পরও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এতে সীমান্ত এলাকায় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে বন বিভাগের ঢাকা অঞ্চলের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাঘটি উদ্ধারে অভিযান শুরু করেন। এর আগে রোববার (২৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের আমঝোল সীমান্তের ৯০৫ নম্বর পিলারসংলগ্ন এলাকায় বাঘের আক্রমণে তিনজন আহত হন।
আহতরা হলেন আমঝোল গ্রামের শরিফা বেগম (৩৪), নজরুল ইসলাম (৪৫) ও আফসার আলী (৪০)।
স্থানীয়রা জানান, রোববার সন্ধ্যায় শরিফা বেগম ধানক্ষেতে ছাগল খুঁজতে গিয়ে সীমান্তের কাছে একটি বাঘকে ছাগল আক্রমণ করতে দেখেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি চিৎকার শুরু করলে বাঘটি তাঁকে ধাওয়া করে আক্রমণ করে। তাঁর চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে এগিয়ে এলে বাঘটি তাঁদের ওপরও চড়াও হয়। এতে একে একে তিনজন আহত হন।
পরে স্থানীয়দের ধাওয়া এবং টহলরত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের ছোড়া দুই রাউন্ড গুলির পর বাঘটি সীমান্ত এলাকার ধানক্ষেতে আত্মগোপন করে।
আহতদের উদ্ধার করে প্রথমে হাতীবান্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে গুরুতর আহত দুজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
রোববার সন্ধ্যা থেকে স্থানীয় বন বিভাগ ও বিজিবি সদস্যরা বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়ে বাঘ উদ্ধারে অভিযান চালান। রাতভর সীমান্তবাসী লাঠি ও টর্চলাইট হাতে পাহারা দিয়ে নির্ঘুম রাত কাটান। পরে রংপুর অঞ্চলের বন বিভাগের সদস্যরাও অভিযানে যোগ দেন।
রাতে বিজিবির ড্রোনে বাঘটির অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপর ওই এলাকায় মানবপ্রাচীর তৈরি করে পাহারা দেন গ্রামবাসী। তবে ভোররাতে বাঘটি ড্রোন ক্যামেরার আওতার বাইরে চলে গেলে আবারও তার অবস্থান অজানা হয়ে পড়ে। এতে সীমান্তবাসীর আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।
উপজেলা প্রশাসন ও বিজিবির পক্ষ থেকে মাইকিং করে বাসিন্দাদের আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকতে এবং উদ্ধারকারী দলকে সহযোগিতা করতে বলা হচ্ছে। বাঘ দেখতে দূরদূরান্ত থেকে উৎসুক মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় করছেন। তাঁদের ভিড়ে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে বলে বন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সোমবার বিকেলে ঢাকা থেকে আসা বন বিভাগের বিশেষ দল বাঘ উদ্ধারে কাজ শুরু করে। এ দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সামাজিক বন বিভাগের রংপুর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম। তবে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বাঘটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
আমঝোল গ্রামের লিয়াকত আলী বলেন, অনেকেই বাঘটি দেখেছেন। বিজিবির ড্রোন ক্যামেরাতেও বাঘটি দেখা গেছে। এটি বেশ বড় আকারের। ধারণা করা হচ্ছে, বাঘটি ভারত থেকে সীমান্ত পেরিয়ে এসেছে। বাঘের আতঙ্কে তাঁরা রাতে লাঠি ও লাইট হাতে পাহারা দিয়েছেন।
আহত আফসার হোসেন ও নজরুল ইসলাম জানান, প্রথমে বাঘটি একটি ছাগলকে আক্রমণ করে। এ দৃশ্য দেখে শরিফা বেগম কুড়াল দিয়ে বাঘটিকে লক্ষ্য করে আঘাত করার চেষ্টা করেন। তবে তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে বাঘটি তাঁকে আক্রমণ করে। তাঁর চিৎকার শুনে তাঁরা এগিয়ে গেলে বাঘটি তাঁদেরও আক্রমণ করে। পরে গ্রামবাসী ও বিজিবির ধাওয়ায় বাঘটি তাঁদের ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যায়।
গোতামারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোনাব্বিরুল ইসলাম বলেন, বাঘের আক্রমণে তিনজন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন শঙ্কামুক্ত হলেও গৃহবধূ শরিফা বেগমের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বন বিভাগ, বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসন বাঘ উদ্ধারে কাজ করছে। তবে এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
হাতীবান্ধা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দ্বীপ জন মিত্র বলেন, প্রাথমিকভাবে তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন, প্রাণীটি বাঘের একটি প্রজাতির এবং স্বভাবগতভাবে ভীতু। এ প্রজাতির বাঘ সাধারণত ক্ষুধার্ত না হলে বা কেউ আঘাত না করলে আক্রমণ করে না।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা ও রংপুরের সমন্বয়ে বন্য প্রাণিবিষয়ক একজন চিকিৎসকসহ ১০ সদস্যের বিশেষ দল বাঘ উদ্ধারের চেষ্টা করছে। উৎসুক মানুষের ভিড়ে অভিযান কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণে মাইকিং করে সবাইকে দূরে ও সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হচ্ছে। বিশেষ দলটি ট্রাঙ্কুলাইজার পাইপ ও ট্রাঙ্কুলাইজার শুটিং মেশিন ব্যবহার করে অভিযান চালাচ্ছে। বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসন উদ্ধারকারী দলকে সহযোগিতা করছে।
বিজিবি লালমনিরহাট ১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম বলেন, রাতে ড্রোনের সাহায্যে বাঘটির অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছিল। পরে সেটি ড্রোনের আওতার বাইরে চলে যায়। ঢাকা রেঞ্জের বন বিভাগের বিশেষ দল বাঘটি উদ্ধারে চেষ্টা করছে। তিনি সীমান্তবাসীকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
উদ্ধারকারী দলের প্রধান সামাজিক বন বিভাগের রংপুর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের খবর পেয়ে বন্য প্রাণীটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধারে অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রাণীটিকে অক্ষত উদ্ধারে তাঁদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
