কৃশানু মজুমদার: “সবটা এখন আর মনে পড়ছে না। আমি ইস্টবেঙ্গলকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আর ইস্টবেঙ্গল যেন ১৯৯৫ সালের ম্যাচটার রেজাল্ট রিভার্স করে।”
ভাইচুং ভুটিয়ার এই কথাতেই যেন লুকিয়ে রয়েছে তিন দশকের পুরনো এক ক্ষত মুছে ফেলার আকাঙ্ক্ষা।
১৯৯৫ সালে আল সিবের বিরুদ্ধে যে ম্যাচে তাঁর অবিশ্বাস্য বাইসাইকেল কিকের গোল বাতিল হয়ে গিয়েছিল, সেই স্মৃতি আজও ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের মনে টাটকা।
তিন দশক পর আবার মুখোমুখি ইস্টবেঙ্গল ও আল সিব। আবার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। আবার লাল-হলুদের সামনে জয়ের চ্যালেঞ্জ। ভাইচুংয়ের চাওয়া, এবার যেন ইতিহাসের ফলটা উল্টে যায়।
কিছু ম্যাচ শেষ হয়ে যায় নব্বই মিনিটে। কিছু ম্যাচ শেষ হয় না কোনও দিনই। সময়ের ধুলো জমে, প্রজন্ম বদলে যায়, ফুটবল মাঠের ঘাসে নতুন ইতিহাস লেখা হয়—তবু কোথাও একটা বাঁশির শব্দ আটকে থাকে। বুকের ভিতর। সমর্থকদের দীর্ঘশ্বাসে। পুরনো খবরের কাগজের হলদে পাতায়।
ইস্টবেঙ্গল আর আল সিবের সেই ম্যাচটা ঠিক তেমনই।
তারিখটা ২১ নভেম্বর, ১৯৯৫। সিজার্স কাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। প্রতিপক্ষ আল সিব। লাল-হলুদ জার্সিতে মাঠে নেমেছে ইস্টবেঙ্গল। গ্যালারিতে উত্তেজনা, মাঠে স্নায়ুর লড়াই, আর নব্বই মিনিটের ফুটবলের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এমন একটা মুহূর্ত, যা তিন দশক পেরিয়েও মুছে যায়নি।
আজ, এত বছর পর, আবার মুখোমুখি ইস্টবেঙ্গল ও আল সিব। এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টু-তে আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের দলের লক্ষ্য তিন পয়েন্ট। দানি রামিরেজ, মহম্মদ রশিদদের পায়ে আজকের স্বপ্ন। কিন্তু বর্তমানের এই লড়াইয়ের পাশে হঠাৎই ফিরে আসে অতীতের একটা ক্ষত—১৯৯৫ সালের সেই কোয়ার্টার ফাইনাল।
সেদিনও ইস্টবেঙ্গল লড়েছিল। সেদিনও একটা গোল বদলে দিতে পারত ম্যাচের ভাগ্য। আর সেই গোলের কেন্দ্রে ছিলেন পাহাড়ি বিছে—ভাইচুং ভুটিয়া।
একটা চিপ, একটা বাইসাইকেল কিক, আর একটা বাঁশি। স্মৃতির পর্দায় দৃশ্যটা একবার ফিরিয়ে আনা যাক।
ডানপ্রান্ত থেকে বল নিয়ে এগিয়ে গেলেন বাসুদেব। টাচলাইনের কাছ থেকে উঠল চিপ। প্রতিপক্ষের তিন ডিফেন্ডারের মাঝখানে শূন্যে ভেসে উঠলেন ভাইচুং। শরীরটা আকাশে, চোখ বলের দিকে, পা দুটো মুহূর্তের জন্য সময়কে যেন থামিয়ে দিল। তারপর এক অবিশ্বাস্য বাইসাইকেল ভলি। বল জড়িয়ে গেল আল সিবের জালে।
এমন গোলের জন্যই তো মানুষ ফুটবল ভালবাসে! এমন একটা মুহূর্তের জন্যই হাজার হাজার মানুষ মাঠে আসে, রেডিয়োর সামনে কান পেতে থাকে, পরদিন খবরের কাগজের পাতা ওলটায়। যে গোল দেখে মনে হয়, ফুটবল শুধুই একটা খেলা নয়—ফুটবল একটা শিল্প।
ভাইচুংয়ের সেই গোলটাও তেমনই ছিল। কিন্তু আনন্দের সেই মুহূর্ত স্থায়ী হল না। আল সিবের গোলকিপার রশিদ যখন বল কুড়িয়ে নেওয়ার জন্য এগিয়ে আসছেন, ভাইচুং তখন মাটি ছুঁয়েছেন। ঠিক সেই সময় রেফারি গোকুল দাসের বাঁশি বেজে উঠল।
গোল বাতিল! কেন? প্রেস বক্সে তখন প্রশ্নের পর প্রশ্ন। গোটা স্টেডিয়াম স্তম্ভিত। যে গোলের পর গ্যালারি ফেটে পড়ার কথা উল্লাসে, সেখানে নেমে এল অবিশ্বাস আর হতাশা।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার আগেই যেন ইস্টবেঙ্গলের স্বপ্নে নেমে এসেছিল অন্ধকার।
পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে রেফারি জানিয়েছিলেন, অফসাইড নয়, তাঁর মতে সেটা ছিল ‘ডেঞ্জারাস প্লে’। অর্থাৎ, ডিফেন্ডারদের মাথায় লেগে যেতে পারত ভাইচুংয়ের পা!
সেই ম্যাচ রিপোর্টের শিরোনাম হয়েছিল—‘রেফারি খুন করলেন ইস্টবেঙ্গলকে।’ ম্যাচটা ইস্টবেঙ্গল হেরে গিয়েছিল ১-০ গোলে। আল সিবের হয়ে গোল করেছিলেন কাতারিগা।
তিন দশক পরে, স্মৃতির কাছে ফিরে দেখা
১৯৯৫ সালের সেই ম্যাচের বিস্তারিত আজও খুঁজে পাওয়া যায় পরিসংখ্যানবিদ নারায়ণ দাশগুপ্তের সংগ্রহে। পুরনো ম্যাচের রিপোর্ট, ফুটবলারদের নাম, রেফারির সিদ্ধান্ত, মাঠের ঘটনাপ্রবাহ—সব মিলিয়ে সেই সময়ের ভারতীয় ফুটবলের একটা ছবি ফুটে ওঠে।
ভাইচুং ভুটিয়ার কাছেও অবশ্য সেই ঘটনার প্রতিটি মুহূর্ত আজ আর স্পষ্ট নয়। সময় তাঁর স্মৃতি থেকে অনেক খুঁটিনাটি মুছে দিয়েছে। কিন্তু তাঁর ছোট্ট বার্তাতেই যেন ধরা রয়েছে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষা। ১৯৯৫ সালের সেই হতাশার বদলে এবার আসুক জয়। পুরনো ক্ষতের জবাব দিক নতুন প্রজন্ম। ইতিহাসের পাতায় লেখা হোক এক নতুন ফলাফল।
