অমিল শুধু ‘স্থান’ আর ‘পাত্রে’! বাকিটুকু শুধুই মিল— পুলিশ হেফাজত থেকে ধৃত অভিযুক্তকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য নির্জন অকুস্থলে যাওয়ায়, পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নিয়ে অভিযুক্তের পালানোর চেষ্টায়, ছিনতাই করা আগ্নেয়াস্ত্র থেকে দুই অভিযুক্তেরই ঠিক তিন রাউন্ড গুলি চালানোয় এবং শেষ পর্যন্ত ‘আত্মরক্ষার্থে’ পুলিশের পাল্টা গুলিতে দুই অভিযুক্তের মৃত্যুতে!
মঙ্গলবার ভোররাত এবং ভরদুপুরে উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা এবং মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে দুই পুলিশি এনকাউন্টারের এমন আশ্চর্য মিল দেখে চমৎকৃত অনেকেই। একটি যেন আর একটির হুবহু ‘রি-মেক’! প্রথম ক্ষেত্রে পুলিশি গুলির বলি, গাইঘাটায় ১৭ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্ত প্রহ্লাদ দাস। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সামশেরগঞ্জের ব্যবসায়ী তথা বিজেপিকর্মী সুজিত মণ্ডলের খুনের মামলায় গ্রেফতার স্থানীয় বাসিন্দা সামাউন শেখ।
অনেকে এ ক্ষেত্রে মিল খুঁজে পাচ্ছেন সাড়ে তিন মাস আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে ১১ বছরের এক নাবালিকাকে ধর্ষণ-খুনে অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের এনকাউন্টারেরও। তবে ঘটনার পুনর্নির্মাণ, পালানোর চেষ্টা, আগ্নেয়াস্ত্র ছিনতাই করে গুলি এবং পুলিশি-আত্মরক্ষার তত্ত্বে মিল থাকলেও এ ক্ষেত্রে ছোট্ট একটা অমিল রয়েছে— পুলিশের তথ্য বলছে, আগ্নেয়াস্ত্র ছিনতাইয়ের পর প্রহ্লাদ বা সামাউনের মতো তিন রাউন্ড গুলি ছোড়ার সুযোগ পাননি প্রভাস। মাত্র এক রাউন্ডেই শেষ হয়ে গিয়েছিল তাঁর ‘প্রতিরোধ’।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং পুলিশমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাতে ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় জানান, নতুন সরকারের জমানায় পশ্চিমবঙ্গে অপরাধীরা ছাড়া পাবে না। তিনি বলেন, ‘‘বিধানসভায় দাঁড়িয়ে আমি পুলিশকে দু’টি বিষয়ে ‘খোলা ছুট’ দিয়েছি— নেশামুক্তি আর মহিলাদের উপর অত্যাচারের মোকাবিলা। এ ক্ষেত্রে পুলিশকর্মী বন্ধুরা পরিবেশ, পরিস্থিতি দেখে পদক্ষেপ করবেন।’’
গাইঘাটায় হল কী
পুলিশের দাবি, মঙ্গলবার ভোররাতে ঘটনার পুনর্নির্মাণ পর্ব শেষে ফেরার সময়ে পুলিশকর্মীদের উপর হামলা করেন অভিযুক্ত প্রহ্লাদ। গাড়িতে করে যখন অভিযুক্তকে নিয়ে থানায় ফেরা হচ্ছিল, তখন বৈদ্যবাড়ি এলাকার কাছে তিনি প্রস্রাব করার জন্য গাড়ি থামাতে অনুরোধ করেন। তার পরেই তিনি কর্তব্যরত এক পুলিশকর্মীর বন্দুক ছিনিয়ে নেন বলে দাবি পুলিশের। পুলিশের ওই সূত্রের বক্তব্য, পর পর তিন রাউন্ড গুলি চালান অভিযুক্ত। তার মধ্যে একটি গুলি লাগে পুলিশের গাড়িতে।
প্রাথমিক ভাবে ঘটনার আকস্মিকতায় প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেন পুলিশকর্মীরা। সেই সময় এক পুলিশকর্মী জখম হন। এক জন রাস্তার ধারের জলাশয়ে ঝাঁপ দেন। তার পরে আত্মরক্ষার জন্য চার রাউন্ড গুলি চালায় পুলিশও। তার মধ্যে একটি গুলি লাগে অভিযুক্তের গায়ে। সঙ্গে সঙ্গে অভিযুক্তকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয় চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। জখম পুলিশকর্মীরও প্রাথমিক চিকিৎসা করা হয় ওই হাসপাতালে। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে প্রহ্লাদের পরিবারের সদস্যেরা জানিয়েছেন, রাত ২টো নাগাদ তাঁকে নিয়ে বাড়িতে এসেছিল পুলিশ।
প্রসঙ্গত, গত শনিবার গাইঘাটা থানা এলাকার বাসিন্দা ১৭ বছর বয়সি এক কিশোরী বাড়ির কাছেই আয়োজিত একটি জলসা দেখতে গিয়েছিল। তার বন্ধুবান্ধব, পরিবারের সদস্যেরাও ছিলেন সেখানে। জলসা অনেক রাত পর্যন্ত চলে। তার পরিবারের দাবি, রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ কিশোরীর কাছে একটি ফোন এসেছিল। ফোন পেয়ে সে অনুষ্ঠান ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তার পর আর ফেরেনি। রাতে তাকে খুঁজে না পেয়ে চিন্তায় ছিল পরিবার। প্রায় সারা রাত খোঁজাখুঁজি চলে। শেষে রবিবার সকালে উদ্ধার হয়েছিল কিশোরীর বিবস্ত্র ক্ষতবিক্ষত দেহ। পরিবারের দাবি, তাকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। ঘটনায় রবিবারই ওই পরিবারের আত্মীয় প্রহ্লাদকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ।
ধুলিয়ানের গুলি-‘রহস্য’
ধৃত সামাউনকে নিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে ঘটনার পুনর্নির্মাণে বার হয়েছিল পুলিশ। সামশেরগঞ্জ থানার পুরাতন ডাকবাংলা এলাকায় সুজিতকে যেখানে খুন করা হয় সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সামাউনকে। পুলিশের দাবি, পুনর্নির্মাণের সময় এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন অভিযুক্ত। তিন রাউন্ড গুলিও চালান বলে অভিযোগ। পাল্টা গুলিতে জখম হন সামাউন। তাঁকে জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু চিকিৎসক জানিয়ে দেন আগেই মারা গিয়েছেন ওই যুবক। জঙ্গিপুর পুলিশ জেলার এক আধিকারিক বলেন, ‘‘খুনের ঘটনার তদন্ত করছিল রাজ্য সিআইডি। আজ (মঙ্গলবার) ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য অভিযুক্তকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই সময় গুলি চলার ঘটনা ঘটে। তার পর অভিযুক্তকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।’’
গত ২৮ অগস্ট রহস্যজনক ভাবে নিখোঁজ হয়ে যান সামশেরগঞ্জের পুরাতন ডাকবাংলা এলাকার বাসিন্দা সুজিত। পরে তাঁর খণ্ডবিখণ্ড দেহ উদ্ধার হয়। ধুলিয়ানে বাবা-ছেলে হরগোবিন্দ দাস এবং চন্দন দাস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এই নৃশংসতার তুলনা টেনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছিলেন, পশুর মাংস কাটার ছুরি দিয়ে সুজিতকে খুন করা হয়েছে। তিন অভিযুক্ত সামিউল শেখ, তাজকিরা বিবি এবং জনি শেখকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তাঁদের যথাযথ শাস্তি সুনিশ্চিত করতে সরকার পদক্ষেপ করবে। ওই ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগ উঠেছিল। সুজিতের স্ত্রী সুমনা মণ্ডল স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িতে বারংবার সাহায্য চেয়ে পাননি বলে অভিযোগ ওঠে। মুখ্যমন্ত্রী একে ‘বড় ত্রুটি’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। ঘটনাক্রমে ধুলিয়ান টিওপি-র ইনচার্জ এএসআই সুমন্তকুমার দাস এবং সামশেরগঞ্জ থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই সাইফুল আলমকে সাসপেন্ড করা হয়। সামশেরগঞ্জের আইসি সুব্রত ঘোষকে লাইনে ক্লোজ় করে তাঁর বিরুদ্ধে জোনাল আইজি-কে দিয়ে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ফরাক্কার এসডিপিও শেখ শামসুদ্দিনকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। জঙ্গিপুরের এসপি সুরিন্দর সিংহকে স্বরাষ্ট্র দফতর শো কজ় করে। সুজিত খুনে ধৃত তিন জনের মধ্যে সামাউন মঙ্গলবার নিহত হলেন। এখন হেফাজতে রইলেন অন্য দুই ধৃত— তাজকিরা বিবি এবং জনি শেখ। সামাউন এবং তাজকিরা ‘স্বামী-স্ত্রী’ পরিচয় দিয়ে গত মাস আটেক ধুলিয়ানে একটি ভাড়া বাড়িতে বসবাস করছিলেন বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশের বন্দুকেই ভরসা দিলিপ-রত্নার
পুলিশের তরফে আত্মরক্ষার তথ্য দেওয়া হলেও ইতিমধ্যেই রাজ্যের ক্ষমতাসীন দলের নেতা-মন্ত্রীদের তরফে সামনে এসেছে ‘ন্যায়বিচারের শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ তত্ত্ব’ও। রাজ্যের মন্ত্রী দিলিপ ঘোষ জানিয়ে দিয়েছেন, অপরাধদমনের ক্ষেত্রে রাজ্যের নতুন সরকার ‘জ়িরো টলারেন্স’ নীতিতে চলছে। দৃষ্টান্ত স্থাপনের বার্তা দিয়ে তাঁর মন্তব্য— ‘‘মানুষের মনে ভরসা ফেরাতে হলে পুলিশকে কিছু ‘অপ্রিয় কাজ’ করতে হবে।’’ ঠিক যেমন ‘ব্যাখ্যা’ অতীতে যোগী আদিত্যনাথ, হিমন্ত বিশ্বশর্মা, শিবরাজ সিংহ চৌহানদের মুখে শুনেছে দেশবাসী। আরজি কর হাসপাতালে নিহত চিকিৎসক পড়ুয়ার মা তথা বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথও একই যুক্তি দিয়ে দাবি করেছেন— এর ফলে অপরাধীদের মনে ভয় আসবে। এমন অপরাধের সংখ্যা কমবে।
গাইঘাটায় পুলিশি এনকাউন্টারের প্রসঙ্গে মঙ্গলবার সকালে প্রশ্ন করা হয়েছিল রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপকে। উত্তর দিতে গিয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের প্রসঙ্গও টেনে আনেন মন্ত্রী। “এর আগেও ঘটনা হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনায়। খুনি পালাচ্ছিল। এনকাউন্টার হয়েছে। এখানেও (গাইঘাটাতেও) হয়েছে,” বলেন দিলীপ। এর পরেই মন্ত্রী বুঝিয়ে দেন, কেউ এ ধরনের অপরাধ করলে তাঁকে এমন পরিণতির জন্যই তৈরি থাকতে হবে। দিলীপ বলেন, “বিচারের সামনে সবাইকে আনতে হবে। আইনের উপরে কেউ নেই। কিন্তু কেউ যদি আইনকে অমান্য করে, তার সঙ্গে এ রকমই হবে।” পঞ্চায়েত মন্ত্রীর বক্তব্য, মানুষকে ন্যায়বিচার দেওয়া পুলিশের কাজ। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “মানুষ তাদের (পুলিশের) উপর ভরসা রাখতে ভুলে গিয়েছে। ভরসা ফিরিয়ে আনতে হলে পুলিশকে কিছু অপ্রিয় কাজ করতে হবে।”
মন্ত্রীর দাবি, পূর্বতন সরকারের আমলে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছিল। তাই অপরাধীদেরও ভয় কমে গিয়েছে। তাই আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি ঠিক করার পাশাপাশি কিছু দৃষ্টান্তও স্থাপন করা দরকার বলে মনে করেন তিনি। দিলীপের কথায়, “ভয় অত সহজে কেউ পায় না। কারণ, আমাদের বাংলায় বহু বছর কানুনব্যবস্থা নেই। কিন্তু যদি আইনকানুনের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হয়, সবাই ভয় পাবে। সতর্ক হবে। দুটো জিনিসই করতে হবে— লোকে যাতে এ সব না করে সে জন্য সমাজে সুবিচার ও সংস্কার আনতে হবে। পরিবেশ ঠিক করতে হবে। আর কী সাজা হবে, সেটা যেন উদাহরণ হিসেবে থাকে।’’
বস্তুত, গত জুলাইয়ে বারুইপুরে পুলিশি ‘এনকাউন্টারে’ অভিযুক্তের মৃত্যুর পরও পুলিশের প্রশংসা করেছিলেন দিলীপ। বলেছিলেন, “পশ্চিমবঙ্গের পুলিশও চাইলে সব কিছু করতে পারে, এটা আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। অপরাধের বিষয়ে জ়িরো টলারেন্সের কথা আমরা বলেছি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যেমন ধরেও নিয়েছে, যখন পালাতে গিয়েছে, উৎপাত করেছে, তখন গুলি চালাতেও দ্বিধাবোধ করেনি।” উত্তরপ্রদেশ, বিহারের ‘এনকাউন্টারের’ কথা স্মরণ করিয়ে পঞ্চায়েতমন্ত্রী সে সময়ে বলেছিলেন, “অপরাধ দমনে পুলিশের হাত কাঁপবে না, সরকার পিছিয়ে যাবে না, সেটা প্রমাণিত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীও দেখিয়েছেন যে, কী ভাবে স্পটে দাঁড়িয়ে আইনশৃঙ্খলাকে ঠিক করতে হয়।” রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও বারুইপুরের‘এনকাউন্টারের’ পর বলেছিলেন, “যাঁরা ভাবছেন পার পেয়ে যাবেন, কেউ জানতে পারবে না… কেউ আপনাদের সাহায্য করতে পারবে না, কেউ বাঁচাতে পারবে না।”
একধাপ এগিয়ে পানিহাটির বিজেপি বিধায়ক রত্নার ঘোষণা, তিনি ‘এনকাউন্টারে’র একশো ভাগ সমর্থক! তিনি বলেন, ‘‘আমার মেয়ের মতো ঘটনা... ‘এনকাউন্টার’ হয়েছে। ছেলেটির মায়ের হয়তো কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তিনি ছেলেকে ঠিক করে মানুষ করতে পারেননি।’’ বিধায়কের সংযোজন, ‘‘যারা মেয়েদের ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখে, তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। এই ‘এনকাউন্টার’ আমি সমর্থন করি। যারা এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে, তারা একটু হলেও ভয় পাবে এতে।’’ রত্নার ব্যাখ্যা, ধর্ষণ, খুনের মতো নানা অপরাধের ঘটনায় ‘অনুঘটক’ নেশাজাত দ্রব্য। মত্ত অবস্থায় অনেকে এমন কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘‘আসল কথা মদ! নেশা করে এমন কাণ্ড ঘটাচ্ছে। সমস্ত নেশাজাত দ্রব্য আমাদের রাজ্যে নিষিদ্ধ করা উচিত। তা হলেও অপরাধ কমবে।’’ রত্না তাঁর চিকিৎসক-কন্যার মৃত্যু প্রসঙ্গ টেনে এনে প্রাক্তন সরকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের পার্থক্য করেছেন। তিনি জানান, আগের সরকার অপরাধীদের ধরার থেকে অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা বেশি করেছিল। তাতে তাঁর এলাকার তৎকালীন বিধায়কও সেই দলে ছিলেন। বিধায়ক বলেন, ‘‘আমার মেয়ের ক্ষেত্রে ঘটনার পুনর্নির্মাণও হয়নি... তবে তদন্ত এগোচ্ছে। বিচার অবশ্যই হবে।’’
শমীকের সাফাইয়ে ‘পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতা’
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য অবশ্য সরাসরি এনকাউন্টারের মাধ্যমে ‘শর্টকার্ট ন্যায়বিচারে’র যুক্তি সমর্থন করেননি। তিনি বলেন, ‘‘আমি কী মনে করি, কী মনে করি না সেটার সঙ্গে প্রশাসনের নিজস্ব কর্মশৈলীর যোগাযোগ থাকবে বা আমার মতো করে প্রশাসন চলবে এটা তো হতে পারে না।’’ এর পরেই তাঁর মন্তব্য— ‘‘কোন পরিস্থিতিতে পুলিশকে গুলি চালাতে হয়? আমাদের রাজ্যে কত বার পুলিশকে গুলি চালাতে হয়েছে? আমরা দেখেছি যখন ওয়াকফ নিয়ে আন্দোলন চলছিল, তখন পুলিশ হাতজোড় করে প্রাণভিক্ষা চাইছে!’’ শমীকের মতে, পুলিশ যদি বার বার আক্রান্ত হয়, তবে পুলিশের সামনে অন্য কোনও পথ খোলা থাকে না। সেই সঙ্গে গাইঘাটায় এক পুলিশ গুলিতে জখম হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘কোন পরিস্থিতিতে গুলি চালাতে হয়েছে, সেটা পুলিশ জানে। প্রশাসন প্রশাসনের কাজ করেছে। এ নিয়ে আমার কী বলার থাকতে পারে।’’ তবে সেই সঙ্গেই গাইঘাটা এবং ধুলিয়ান কাণ্ডে ‘এনকাউন্টার’ শব্দের ব্যবহার নিয়েও আপত্তি তুলেছেন বিজেপি রাজ্য সভাপতি। তাঁর কথায়, ‘‘এনকাউন্টার আর পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতায় গুলি চালানো এক জিনিস নয়। এনকাউন্টার শব্দের মানে অন্য। যে পরিস্থিতিতে দু’জায়গায় পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছে তা আর যাই হোক এনকাউন্টার নয়। এটার একটা অপব্যাখ্যা হচ্ছে।’’
কী বলছে বিরোধীরা
বারুইপুর কাণ্ডের সঙ্গে গাইঘাটা ও ধুলিয়ানের যোগসূত্র টেনে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি সদস্য তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী অধীর চৌধুরীর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে ধীরে ধীরে পুলিশি এনকাউন্টারে অভিযুক্তকে মেরে ফেলার প্রক্রিয়া গতি পাচ্ছে! তাঁর প্রশ্ন— ‘‘প্রকৃত অপরাধীকে চিহ্নিত করবে কে? আদালত, পার্টি না কি থানা-পুলিশ?’’ পশ্চিমবঙ্গে অপরাধ বাড়ছে বলে জানিয়ে অধীর বলেন, ‘‘কিন্তু বিচার বহির্ভূত হত্যার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তা দেখে মনে প্রশ্ন জাগছে, রাজ্যের মানুষের কি বিচারব্যবস্থার উপর থেকে আস্থা চলে গেল? না কি পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ বিচারব্যবস্থার উপর আস্থা-ভরসা চলে যাচ্ছে।’’
প্রতিটি ক্ষেত্রেই যে ভাবে পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনতাইয়ের পর বন্দি গুলি চালিয়েছেন এবং পাল্টা গুলিতে নিহত হয়েছেন বলে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে অধীর বলেন, ‘‘নকশাল আমলে দেখেছি, ছিনতাই এড়াতে পুলিশকর্মীরা তাঁদের রাইফেল শিকল দিয়ে শরীরের সঙ্গে বেঁধে রাখতেন। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের যদি নিজের রিভলভার নিজের কোমরে রাখার ট্রেনিং না হয়, তা হলে কি আমরা তাদের যোগ্য পুলিশ ভাবব?’’
আবার মমতাপন্থী তৃণমূলের বিধায়ক তথা প্রবীণ রাজনীতিক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় বলছেন, “এনকাউন্টার করে হয়তো প্রচার পাওয়া যায়। কিন্তু দেশে একটা আইন আছে।” ধর্ষণ সংক্রান্ত অপরাধে দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে যে আইনে সংশোধনের উদ্যোগী হয়েছিল রাজ্য, সে কথাও স্মরণ করিয়ে দেন শোভনদেব।
অন্য দিকে, পুলিশের কাছ থেকে কী ভাবে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিচ্ছেন অভিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী। তার জবাবও দিয়েছেন রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া। মন্ত্রী বলেন, “পুলিশ প্রশাসন কী ভাবে চলবে, তার গাইডলাইন সুজন চক্রবর্তীর কাছ থেকে শুনবেন না পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী।” তিনি বলেন, “যদি পুলিশের বন্দুক নিয়ে দুর্বৃত্ত পুলিশকেই আক্রমণ করে, তবে পুলিশ ছাড়বে কেন?”
সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেন, ‘‘বারুইপুরে আমরা দেখলাম মুখ্যমন্ত্রী গেলেন, বললেন, সকালে জমা করব, বিকেলে খরচ করব। যা নিজের প্রাইভেট সেক্রেটারি খরচ দিয়ে শুরু হয়েছে যাত্রা। যদি মৃত্যুকে খরচ বলে আর কি। আমরা বলি না। বারুইপুরের গোটা ঘটনা ধামাচাপা পড়ে গেল। বড় বড় কথা বলে, কিন্তু গত কয়েক মাসে গোটা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ধর্ষণ পশ্চিমবঙ্গে হয়েছে। আমি আজকে টুইট করেছি ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর’ বা এসওপি। কোথাও এ রকম এসওপি নেই। এটা এসওপির বদলে এসওএপি— ‘সোপ’। এটাকে ‘সোপ অপেরা’ বলে। সিরিয়ালে এপিসোডে যে রকম দেখায়। এটা হচ্ছে সস্তা ‘সোপ অপেরা এপিসোড’। কিন্তু তাতে অপরাধ কমবে না।’’ গাইঘাটার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর-ও। এক বিবৃতিতে সংগঠনের সহসভাপতি রঞ্জিত শূরের বক্তব্য, “রাত ১২টার সময় বন্দিকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণে যাওয়া গভীর সন্দেহজনক। তা-ও বন্দির হাত খোলা রেখে!” পুলিশের রিভলবার কী ভাবে ছিনিয়ে নিলেন অভিযুক্ত, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
