‘জোর করে চাঁদা চাওয়া’র অভিযোগ প্রসঙ্গে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘স্পন্দন’ পরিচালনায় গঠিত কমিটি। বিতর্কের মুখে পড়ে একটি বিবৃতি জারি করেছে ওই কমিটি। প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, উৎসবের আয়োজনের সঙ্গে অন্য কোনও সংগঠনের যোগ নেই।
প্রথম বর্ষের পড়ুয়াদের একাংশের অভিযোগ ছিল, আরএসএসের চিকিৎসক সংগঠন এনএমও-র (ন্যাশনাল মেডিকোস অর্গানাইজ়েশন) নাম করে টাকা তোলা হচ্ছে। কিন্তু ‘স্পন্দন’ কমিটির তরফে জারি করা বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, এনএমও-র সঙ্গে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের যোগাযোগ ভিত্তিহীন। ফেস্টের জন্য ৫,৫০০ টাকা চাওয়া নিয়ে কমিটির বক্তব্য, গত বছর যে অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছিল, এ বছরও সেটাই নেওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে টি-শার্টের দামও অন্তর্ভুক্ত। টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও জোর করা হয়নি বলেও দাবি ‘স্পন্দন’ কমিটির সদস্য বিশ্বরূপ সাহার। তিনি জানান, ওই অর্থ স্বেচ্ছায় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের বার্ষিক সাংস্কৃতিক উৎসব ‘স্পন্দন’ নিয়ে এ ধরনের অভিযোগ এই প্রথম নয়। সেই কারণে, এই বছর বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ঘিরে যাতে অতীতের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি না হয়, তার জন্য এ বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর একটি ‘সুপারভিশন কমিটি’ গঠন করেন অধ্যক্ষ সব্যসাচী দাস। আগেও অতীতে ‘স্পন্দন’ ঘিরে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্বচ্ছতার আশ্বাসও দিয়েছিলেন তিনি। উৎসবের হিসাব দেখার জন্য স্বাধীন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট নিয়োগের সুপারিশ করেছিল ‘সুপারভিশন কমিটি’। সেই কমিটির অন্যতম সদস্য শারীরবিদ্যা বিভাগের প্রধান চিকিৎসক অরুণিমা চৌধুরী সোমবার জানিয়েছেন, জোর করে চাঁদা নেওয়া সংক্রান্ত অভিযোগ তিনিও পেয়েছেন। সেই অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য অধ্যক্ষের কাছে তা পাঠিয়েও দেওয়া হয়েছে।
যদিও ‘স্পন্দন’ কমিটির দাবি, বিতর্কের পিছনে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থ কাজ করছে। তবে সেই স্বার্থ চরিতার্থ করার পিছনে কারা রয়েছেন, তা অবশ্য পরিষ্কার করে জানানো হয়নি। কমিটির আশ্বাস— হুমকি ও ভয়ের সংস্কৃতির পরিবেশ এখন বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে অতীত! অন্য দিকে, ‘স্পন্দন’ কমিটির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে সোমবার সংঘের চিকিৎসক সংগঠন এনএমও-র তরফেও একটি বিবৃতি জারি করে যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, তৃণমূল আমলে রাজ্যের মেডিক্যাল কলেজগুলির সাংস্কৃতিক অনুঠান ঘিরে জোর করে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ ছিল। আরজি কর আন্দোলনের সময় সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভীক দে, বিরূপাক্ষ বিশ্বাসদের বিরুদ্ধে জুনিয়র চিকিৎসকদের বিক্ষোভের জেরে তপ্ত হয়ে উঠেছিল বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ। সেই বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজেই এ বছরের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে চাঁদা আদায়কে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। অভিযোগ, দু’দিনের কলেজ ফেস্টের জন্য প্রথম বর্ষের এমবিবিএস পড়ুয়াদের কাছে ৫৫০০ টাকা করে চাওয়া হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, চাঁদা আদায়ের ক্ষেত্রে আরএসএসের চিকিৎসক সংগঠন এনএমও-র নাম ব্যবহার করে পড়ুয়াদের উপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রতিবাদ জানালে হেনস্থার শিকার হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে বিষয়টি নিয়ে সমাজমাধ্যমে সরব হন এক পড়ুয়া। ওই পড়ুয়ার পোস্টটি বিভাগীয় প্রধানদের গ্রুপে শেয়ার করেন বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজেরই এক শিক্ষক-চিকিৎসক।
অভিযোগ প্রসঙ্গে এনএমও-র রাজ্য সম্পাদক চিকিৎসক অর্ণপ পাল বলেন, ‘‘এনএমও একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। সারা বছরে আমাদের কী কী কর্মসূচি পালন করা হবে, তার সুনির্দিষ্ট একটি তালিকা রয়েছে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে যে নবীনবরণ বা বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, সেখানে এনএমও কখনওই সংগঠন হিসেবে যুক্ত থাকে না। এনএমও-র কোনও সদস্য এ ধরনের অনুষ্ঠানে থাকতে পারে। কিন্তু সংগঠনগত ভাবে এ ধরনের অনুষ্ঠানের জন্য টাকা তোলার সঙ্গে আমরা যুক্ত নই। এনএমও-র নাম করে টাকা তোলা হচ্ছে বলে যদি কেউ আমাদের লিখিত ভাবে জানান, তা হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আমরা আইনত ব্যবস্থা নেব।’’ অন্য দিকে, বর্ধমান মেডিক্যালের শারীরবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান চিকিৎসক অরুণিমার দাবি, এ বিষয়ে তিনি আগেই কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি জীবনে কোনও দিন কোনও ধরনের তোলাবাজিকে সমর্থন করিনি। ‘স্পন্দন’ কমিটির সদস্যেরা আমার নাম ব্যবহার করে টাকা তুলেছেন। আমি এর নিন্দা জানাচ্ছি। ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের এমন আচরণে আমি বিব্রত এবং অসহায় বোধ করছি।”
