জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনের সময় নানা কথা বলে আওয়ামী লীগের ভোট ভিক্ষা চেয়েছে। শেখ হাসিনা বলেছেন, হাতেপায়ে ধরে ভোট নিলো, এখন বেইমানি করে কেন? তার দলের আরেকজন গডফাদার বলেছেন, কমপক্ষে ৯৫টি আসনে হেরে যাওয়া বিএনপিকে আমরাই ভোট দিয়ে জিতিয়েছি। আপনাদের দলের নাটোরের এমপি বলেছেন, তাদের সফলতার পেছনে আওয়ামী লীগের ভাইয়েরা রয়েছেন, আওয়ামী লীগকে ধন্যবাদ দেবেন। নিজের দল বিএনপিকে ধন্যবাদ দিতে পারছেন না।
গতকাল রবিবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, বিএনপি নতুন নতুন বয়ান তৈরি করছে। আমরা নাকি পরিত্যক্ত ফ্যাসিস্টের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছি। নাউজুবিল্লাহ। একজনের গায়ে কোনো কাপড় নেই, আরেক জনের নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত কাপড় আছে। তো যার গায়ে কাপড় নেই, সে বলছে, ওই দেখো, ওর গায়ে কোনো জামা নেই।
শফিকুর রহমান আরো বলেন, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিভিন্ন নেতাকে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এবং আপনাদের দলের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্থান দিচ্ছেন। তারপর বলছেন, সীমান্তের ওপার থেকে টাকা আসে। এখানে ইঙ্গিত করে বলছেন, আমরা নাকি অস্থিরতা সৃষ্টি করছি। সীমান্তের ওপার থেকে টাকা আসে, তাহলে আপনারা সরকারে এসেছেন কেন? এই টাকা ঢোকা ঠেকাতে পারেন না কেন? ওপার থেকে অস্ত্র ও মাদক আসে কেন? ঠেকাতে পারেন না কেন? যে সরকারের অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় ঠেকানোর যোগ্যতা নেই, সেই সরকারের দেশ শাসন করার কোনো অধিকার নেই।
জামায়াতের আমির বলেন, জনগণকে কার্ড দেবেন, দিচ্ছেন, দিন। কিন্তু কয়জনকে কার্ড দিয়েছেন? কয়জনকে দেবেন? কখন দেবেন? এর আগে গরিব-ধনী, শিশু, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবার ঘাড়ে করের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন। আপনাদের দুর্নীতির বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন, একটার পর একটা। মানুষের জীবন এখন অতিষ্ঠ।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশ চলতে পারে না। এসব পাহাড়সম ব্যর্থতা চাপা দেওয়ার জন্য বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। একটি বয়ান তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, সাত মাসের সরকার কিছু ভুলত্রুটি করেছে। কিন্তু আপনারা এত তাড়াতাড়ি আন্দোলনে নামলেন কেন? ৭০ ভাগ মানুষের রায়কে এত তাড়াতাড়ি অগ্রাহ্য করলেন কেন? সমাজের সব জায়গা এত তাড়াতাড়ি দখলে নিলেন কেন? দলীয় ক্যাডারদের প্রশাসক বানিয়ে মানুষের ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দিলেন কেন? এত তাড়াতাড়ি লোভ সামলাতে না পেরে জনগণকে অতিষ্ঠ করে তুললেন কেন? আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এত মারাত্মক অবনতি কেন?
তিনি বলেন, আমাদের সালাউদ্দিন সাহেব খুবই পারদর্শী লোক, সব মন্ত্রণালয়ের ব্যাপারে। এমনকি আইন মন্ত্রণালয়, শেষ পর্যন্ত দেখলাম ধর্ম মন্ত্রণালয়ও। কিন্তু শুধু নিজের মন্ত্রণালয় দেখার সুযোগ পান না। সংসদে দাঁড়িয়ে তার দলের একজন সিনিয়র সংসদ সদস্য বলেছেন, মাদক বন্ধ হবে কীভাবে? মাদকের সবচেয়ে বড় চালান তো আসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির এলাকা দিয়ে।
জামায়াতের আমির বলেন, আমাদের বার্তা স্পষ্ট। আমরা কোনো দলীয় দাবি বা ১১-দলীয় জোটের কোনো দাবি নিয়ে মাঠে নামিনি। আমরা নেমেছি জনগণের অধিকারের দাবি নিয়ে। প্রতিটি দাবি জনগণের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই দাবি বাস্তবায়নে আমাদের বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে, যাতে আমরা কর্মসূচি বাস্তবায়ন না করি। তিনি আরো বলেন, গণভোটে ৭০ ভাগ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। দেশের জনগণ জানিয়ে দিয়েছেন, তারা অতীতের গুনে ধরা, বস্তাপচা রাজনীতি আর দেখতে চান না। তারা পরিবর্তন ও সংস্কার চান।
অনুষ্ঠানে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বলেছেন, সরকার বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় বন্ধের পথে চলে গেছে। ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
এলডিপি চেয়ারম্যান বলেন, এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় বন্ধের পথে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সরকার ক্ষমতায় আসার আগে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এখন উল্টো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রায় ৮০ হাজার মানুষের চাকরি চলে গেছে। নতুন করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ হচ্ছে না, মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও হচ্ছে না।
পুরোনো কর্মীদেরও ছাঁটাই করা হচ্ছে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনার চারপাশে যারা আছেন, তাদের অনেকেই আপনাকে সঠিক পরামর্শ দেওয়ার মতো অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা রাখেন না। তাদের কারণে আপনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। আপনার শত্রু বিরোধী দল নয়, বরং আপনার আশপাশের ভুল পরামর্শদাতারা। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে এলডিপি চেয়ারম্যান বলেন, দ্রুত সংস্কার বাস্তবায়নের ঘোষণা দিন। তাহলে সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, বিএনপি সরকার সংস্কারের কোনো অ্যাজেন্ডাই বাস্তবায়ন করতে চায় না। জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর, বাস্তবায়ন আদেশ জারি এবং গণভোটে পাস হওয়ার পরও বিএনপি সরকার সংস্কারের প্রস্তাবগুলো মানতে চায় না। তারা এখন পেছনের দিকে ফিরে যাওয়ার বাহানা খুঁজছে।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ প্রণয়নের বিষয়ে আমরা দীর্ঘদিন ঐকমত্য কমিশনে আলোচনা করেছি। জুলাই সনদ স্বাক্ষর করা হয়েছে। আমরা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সে সময় বলেছিলাম, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দেওয়ার পরে আমরা স্বাক্ষর করব। এই দাবিটা আমরা জানিয়েছিলাম। কারণ, তখন আমাদের এই আশঙ্কার জায়গাটা ছিল যে, যদি আইনগতভাবে জুলাই সনদের প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা না থাকে, নিশ্চিত বাধ্যবাধকতা না থাকে, সে ক্ষেত্রে এই সংস্কার প্রস্তাবনাগুলোর কোনো কিছুই হয়ত পরবর্তীতে বাস্তবায়ন করা হবে না। এনসিপির সদস্যসচিব বলেন, আমাদের একটাই দাবি, অবশ্যই এই একপেশে, একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি বাতিল করে গণভোটের গণরায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করার মধ্য দিয়েই এই সংকটের সুরাহা করতে হবে।
জাতীয় নারী শক্তির আংশিক আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা : জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নারী সংগঠন জাতীয় নারী শক্তির আংশিক আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এদিন এনসিপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে বলা হয়েছে, নারী শক্তির নতুন কমিটিতে আহ্বায়ক হিসেবে ডা. মাহমুদা আলম মিতু, সদস্য সচিব হিসেবে নুসরাত তাবাসসুম (এমপি) ও মুখ্য সংগঠক হিসেবে অ্যাডভোকেট মনজিলা ঝুমাকে মনোনীত করা হয়েছে। এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেনের নির্দেশক্রমে বিদ্যমান কমিটি বাতিল করে এ আহ্বায়ক কমিটি (আংশিক) অনুমোদন করা হয় বলে জানানো হয়েছে।
বিআলো/অর্নব