প্রচলিত ইউরিয়া সারের ব্যবহার দক্ষতা বাড়ানো, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং পরিবেশবান্ধব কৃষির সম্ভাবনা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে উদ্ভাবিত ন্যানো ইউরিয়ার পেটেন্ট অনুমোদন পেয়েছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) অধ্যাপক ড. মো. জাভেদ হোসেন খান। দীর্ঘ পাঁচ বছর দুই মাস অপেক্ষার পর গত ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশ পেটেন্ট অফিস এ অনুমোদন দেয়। উদ্ভাবনটিকে ঘিরে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও প্রচলিত ইউরিয়া সারের পূর্ণ বিকল্প হিসেবে এর কার্যকারিতা এখনও যাচাইয়ের অপেক্ষায়। ফসলের ফলন, পুষ্টি গ্রহণের দক্ষতা, প্রয়োগমাত্রা ও প্রকৃত ব্যয়সাশ্রয় সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার ফল পাওয়া গেলে কৃষিতে এর ব্যবহারিক সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হবে।
২০২১ সালে ন্যানো ইউরিয়ার পেটেন্টের জন্য আবেদন করেন অধ্যাপক জাভেদ হোসেন খান। দীর্ঘ অপেক্ষার পর অনুমোদন পাওয়ায় তার গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি মিলেছে। উদ্ভাবক জানান, পেটেন্ট অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর নির্দেশনা ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ অর্জনের জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
অধ্যাপক জাভেদ হোসেন খানের ভাষ্য, দেশের কৃষি, মাটি ও কৃষকের স্বার্থকে সামনে রেখেই তার গবেষণা। ন্যানো ইউরিয়া কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা গেলে সারের ব্যবহার দক্ষতা বাড়ানো, অপচয় কমানো এবং উৎপাদন ব্যয় হ্রাসের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সারের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে পরিবেশের ওপর যে চাপ তৈরি হয়, তা কমাতেও প্রযুক্তিটি ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনার বাস্তবতা নির্ভর করবে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও মাঠপর্যায়ের ফলাফলের ওপর।
ন্যানো ইউরিয়া হলো ন্যানোপ্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি ইউরিয়াভিত্তিক সার, যা তরল আকারে গাছের পাতায় স্প্রে করে প্রয়োগ করা যায়। প্রচলিত দানাদার ইউরিয়া সাধারণত মাটিতে প্রয়োগ করা হয়। ন্যানো ইউরিয়ার লক্ষ্য হলো পাতার মাধ্যমে গাছকে নাইট্রোজেন পুষ্টি সরবরাহের দক্ষতা বাড়ানো।
এই উদ্ভাবনের মূল সুবিধাগুলো হলো বিপুল খরচ সাশ্রয় : প্রচলিত দানাদার ইউরিয়া সারে যেখানে প্রতি বিঘা জমিতে চাষ করতে প্রায় ৪,২০০ টাকার সার লাগে, সেখানে ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারে খরচ হবে মাত্র ২৩০ টাকা। অর্থাৎ কৃষকের সার বাবদ খরচ প্রায় ৮২ শতাংশ কমে যাবে।
উচ্চ কার্যকারিতা : প্রচলিত দানাদার ইউরিয়ার মাত্র ৩০-৪০% অংশ গাছ গ্রহণ করতে পারে, বাকি ৬০-৭০% অপচয় হয়। অন্যদিকে, ন্যানো ইউরিয়ার শোষণ ক্ষমতা ৭০-৮০% বা তারও বেশি।
পরিবেশবান্ধব : দানাদার সার মাটিতে দিলে তা চুইয়ে মাটির নিচে চলে যায় বা নদীর পানিতে মিশে পরিবেশ দূষণ করে। কিন্তু ন্যানো ইউরিয়া সরাসরি পাতায় স্প্রে করায় অপচয় ও পরিবেশ দূষণ দুই-ই রোধ হয়।
বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় : বাংলাদেশ সরকারকে প্রতি বছর বিপুল টাকা ভর্তুকি দিয়ে বিদেশ থেকে ইউরিয়া সার আমদানি করতে হয়। এই দেশীয় প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে সফল হলে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচবে।
দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণে আমদানি ও সরকারি ভর্তুকির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ন্যানো ইউরিয়া বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর হলে সারের ব্যবহার ব্যবস্থায় নতুন বিকল্প তৈরি হতে পারে। তবে এর ফলে আমদানি বা বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে প্রযুক্তিটির উৎপাদন সক্ষমতা,
বাজারমূল্য এবং প্রচলিত সারের পরিবর্তে ব্যবহারের বাস্তব সুযোগের ওপর।
অধ্যাপক ড. জাভেদ হোসেন খান যবিপ্রবির কেমিকৌশল বিভাগের শিক্ষক। ২০১৩ সাল থেকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব গবেষণাগার পরিচালনা করছেন। তার প্রতিষ্ঠিত ন্যানো-বায়ো অ্যান্ড অ্যাডভান্সড মেটেরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং (ন্যাম) ল্যাবে ন্যানোপ্রযুক্তি ও উন্নত উপকরণ নিয়ে গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৫ সালে তিনি বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ফেলো নির্বাচিত হন।
ন্যানো ইউরিয়ার পেটেন্ট অনুমোদনে সন্তোষ প্রকাশ করে যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর বলেন, এ অর্জন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সক্ষমতার পরিচায়ক। তার মতে, উদ্ভাবনটি কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে দেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তিনি অধ্যাপক জাভেদ হোসেন খানকে অভিনন্দন জানান এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা বলেন।
পেটেন্ট অনুমোদনের মধ্য দিয়ে উদ্ভাবনটির স্বত্বের স্বীকৃতি মিলেছে। তবে কৃষকের জমিতে ব্যাপকভাবে প্রয়োগের আগে বিভিন্ন ফসল ও মাটিতে পরীক্ষা, প্রচলিত ইউরিয়ার সঙ্গে তুলনামূলক ফলন বিশ্লেষণ, নিরাপদ প্রয়োগমাত্রা নির্ধারণ এবং উৎপাদন ব্যয় যাচাই জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, বাণিজ্যিক উৎপাদনের সক্ষমতা ও কৃষকের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে প্রযুক্তিটি পৌঁছে দেওয়ার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
দেশীয় গবেষণালব্ধ প্রযুক্তিকে কৃষকের কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে ন্যানো ইউরিয়ার পেটেন্ট একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এখন গবেষণাগারের উদ্ভাবনকে মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রযুক্তিতে রূপান্তর করাই বড় চ্যালেঞ্জ। যথাযথ পরীক্ষা ও বাস্তব প্রয়োগে সাফল্য মিললে ন্যানো ইউরিয়া দেশের কৃষিতে সাশ্রয়ী ও দক্ষ সার ব্যবস্থাপনার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
