খসড়া ভোটার তালিকা এখনও প্রকাশিত হয়নি। ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা তো দূরস্থান। তবু কলকাতা পুরসভা পুরসভার বেশ কিছু ওয়ার্ডে প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করে ফেলেছে বিজেপি। সোমবার প্রার্থী হওয়ার জন্য আবেদন জানানোর প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক ভাবে শেষ হয়েছে। তার আগেই কী ভাবে চূড়ান্ত হল কিছু প্রার্থীর নাম? দলীয় সূত্রের ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক ভাবে যাঁরা ওজনদার, যাঁদের মনোনয়ন নিয়ে কোনও সংশয় নেই, তাঁদের নামের তালিকাই তৈরি হয়েছে। বাকি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে ওয়ার্ড স্তর থেকে মতামত সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে। সে কাজ অনেকটা এগিয়েও গিয়েছে। আবেদন জমায় ইতি পড়ার পরে জেলা ও রাজ্য নেতৃত্বের মতামত নিয়ে তালিকা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
কলকাতার পুরভোট প্রস্তুতির ‘ইনচার্জ’ রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। তিনি দায়িত্ব নিয়েই জানিয়েছিলেন, ‘‘প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব এসওপি (নির্দিষ্ট সাংগঠনিক পদ্ধতি) রয়েছে। সেই মাপকাঠিতেই প্রার্থী বাছাই হবে।’’ সেই মাপকাঠির মধ্যে রয়েছে সাংগঠনিক দক্ষতা, জনসংযোগ, জনপ্রিয়তা। সক্রিয় ভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন, কিন্তু স্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তি সম্পন্ন, তাঁদেরও বিজেপির প্রার্থী হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন সুকান্ত। দলে কর্মীরা বা সাধারণ নাগরিক, যে কেউ যাতে প্রার্থী হতে চেয়ে আবেদন জমা করতে পারেন, তার জন্য ড্রপবক্সের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।
‘‘অনেকেই প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। অধিকাংশ ওয়ার্ডেই একাধিক নাম জমা পড়েছে। আমরা প্রতিটি নামের বিষয়ে ওয়ার্ড থেকে শুরু করে রাজ্য পর্যন্ত সংগঠনের প্রতিটি স্তর থেকে মতামত নিয়ে প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করছি।’’ বলছেন সুকান্ত। অর্থাৎ কোনও ওয়ার্ডে প্রার্থী হওয়ার জন্য যাঁরা আবেদন করলেন, তাঁদের বিষয়ে প্রথমে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের নেতৃত্বের মতামত নেওয়া হচ্ছে। তার পরে জেলা নেতৃত্বের মতামত জানতে চাওয়া হচ্ছে। জেলা নেতৃত্ব ওই সব নামের বাইরে কাউকে প্রার্থী করতে চাইছেন কি না, চাইলে কেন, সে সব বিশদে জেনে নেওয়া হচ্ছে। তার পরে রাজ্যস্তরে আলোচনা করে চূড়ান্ত অনুমোদন। সেই প্রক্রিয়া এখনও শুরু হয়নি বলেই বিজেপি সূত্রের খবর। তবে কিছু আসনের ক্ষেত্রে কারা প্রার্থী হবেন, সেটা ইতিমধ্যেই রাজ্য নেতৃত্বের কাছে স্পষ্ট।
যেমন, ৫০ নম্বর ওয়ার্ডে যদি সজল ঘোষ প্রার্থী হতে চান, তা হলে সেখানে আর অন্য কোনও নাম নিয়ে আলোচনা বা সাংগঠনিক স্তরে মতামত সংগ্রহের প্রশ্নই নেই বলে বিজেপি সূত্রে জানা যাচ্ছে। কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন ডেপুটি মেয়র তথা সবচেয়ে পুরনো বিজেপি কাউন্সিলর মীনাদেবী পুরোহিত যে ফের ২২ নম্বর ওয়ার্ডেই প্রার্থী হচ্ছেন, তা নিয়েও রাজ্য স্তরে কারও কোনও সংশয় নেই। জোড়াসাঁকোর বিধায়ক তথা ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের চার বারের কাউন্সিলর বিজয় ওঝার ক্ষেত্রেও একই নীতি। এ রকম নিশ্চিত নাম আরও কয়েকটি রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। বিজেপি সূত্রের দাবি, ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডে সন্তোষ পাঠক যদি এ বার বিজেপির টিকিটে লড়তে চান, তা হলে অন্য কোনও প্রার্থীর কথা ভাবার প্রশ্ন নেই। সন্তোষ কয়েক দশক ধরে ওই ওয়ার্ডের কংগ্রেস কাউন্সিলর ছিল। বিধানসভা ভোটের আগে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন এবং পদ্ম প্রতীকে চৌরঙ্গি আসন থেকে লড়েন। জিততে পারেননি। কিন্তু বিজেপির ভোট সে আসনে ২২ শতাংশ থেকে ৩৭ শতাংশে তুলে এনেছেন সন্তোষ। ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রাক্তন বিজেপি কাউন্সিলর সুনীতা ঝাওয়ারের ক্ষেত্রেও একই নীতি নেওয়া হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। কারণ একা সুনীতা নন, গোটা ঝাওয়ার পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে ওই ওয়ার্ডে বিজেপি-কে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।
গত পুরবোর্ডের বেশ কিছু তৃণমূল কাউন্সিলর এ বছর বিজেপির টিকিট পেতে আগ্রহী বলে জল্পনা তৈরি হয়েছে। আর কলকাতার দুই সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মালা রায় এনসিপিআই-তে যোগ দিয়ে এনডিএ-র শরিক হওয়ার কথা ঘোষণার করার পর থেকে তাঁরা কার্যত বিজেপির জোটসঙ্গীই। তাঁদের অনুগামী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কাউন্সিলর বা প্রাক্তন কাউন্সিলরকে টিকিট দেওয়া হোক, এমন আবদার বিজেপি নেতৃত্বের কাছে পৌঁছেছে। মূলত উত্তর কলকাতার সাংসদ সুদীপই এ বিষয়ে বেশি তৎপর। তবে দক্ষিণ কলকাতায় চেতলা এলাকার এক কাউন্সিলরের নামও এই তালিকায় রয়েছে বলে অনেকের দাবি।
রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলছেন, সদ্য তৃণমূল থেকে এসে বিজেপির টিকিট নিতে চাইছেন, এমন কোনও নামের তালিকা দলের কাছে রয়েছে বলে তাঁর জানা নেই। শমীকের কথায়, ‘‘আমার জানা নেই মানে দলেরও জানা নেই।’’ ভোট অভিযানের ইনচার্জ সুকান্ত বলছেন, ‘‘স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতাকর্মীর অভাব আমাদের নেই। তৃণমূল থেকে কাউকে এনে টিকিট দিতে আমরা আগ্রহী নই।’’ তবু জল্পনা থামছে না। কয়েকটি ওয়ার্ডে পূর্বতন তৃণমূল কাউন্সিলরদেরই বিজেপির টিকিট দেওয়ার জন্য যথেষ্ট প্রভাবশালী মহল থেকে সুপারিশ হচ্ছে বলে একাংশের দাবি। বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব তেমন কোনও সুপারিশের কথা প্রকাশ্যে অন্তত নস্যাৎই করছেন। বিজেপি যদি সত্যিই সুকান্ত বর্ণিত ‘এসওপি’ অনুযায়ী প্রার্থী বাছাই করে, তা হলে তৃণমূল কাউন্সিলরদের পক্ষে পদ্ম-টিকিট আদায় করা সত্যিই কঠিন হতে পারে। কারণ ওয়ার্ড স্তরের মতামত সংগ্রহের সময়েই সে সব নামে ঢ্যাঁড়া পড়ে যাওয়ার কথা।
