Published on
:
4 min read
একটা গয়নার বাক্স রয়েছে বছর সাতাশের নেহার। তাতে কোনও অক্সিডাইজ়ড জুয়েলারি নেই। বরং আছে হীরে-সোনা-রুপোর গয়না। ছোট্ট ডায়মন্ডের কানের দুল, সোনার সরু চেন, হালকা লকেট — সবই রয়েছে তাঁর সংগ্রহে। কোনওটির ওজনই তিন-চার গ্রামের বেশি নয়। সোনা ও হীরের গুণমানও যে খুব ভালো, তা-ও জোর দিয়ে বলা যায়। তবে প্রতিটি গয়নাই হলমার্কযুক্ত। নেহা নিয়মিত ব্যবহারও করেন সেগুলি। তবে নেহা একা নন, তাঁর বয়সি বহু কর্মরতা মহিলার গয়নার বাক্সেই এখন জায়গা করে নিয়েছে এমন হালকা, অথচ স্টাইলিশ গয়না। যার পরিচিত নাম ফাইন জুয়েলারি। আর এই ফাইন জুয়েলারিই এখন ফ্যাশন।
বেশ কয়েক বছর ধরেই ফ্যাশনের দুনিয়ায় ইনফ্লুয়েন্স তৈরি করছে হালকা গয়না। ভারী গয়নার প্রতি আগ্রহ কমছে তরুণ প্রজন্মের। এমনকী মিলেনিয়ালরাও রোজের ব্যবহারের জন্য বেছে নিচ্ছেন সরু চেন, ছোট্ট লকেট অথবা হালকা কানের দুল। কিন্তু কী ভাবে ফ্যাশনের মূলস্রোতে জায়গা করে নিল ফাইন জুয়েলারি?
ফ্যাশন ডিজ়াইনার তন্ময় বিশ্বাসের কথায়, ‘আটের দশকেও এই ধরনের গয়না পরার চল ছিল। আবার এখন সেই ফ্যাশন ফিরে এসেছে।’ আর সেই পুরোনো ফ্যাশনকেই ‘ওল্ড ওয়াইন ইন আ নিউ বটল’ ফর্মে নতুন ভাবে আপন করে নিয়েছে বর্তমান প্রজন্ম। ফ্যাশন দুনিয়ায় সেটাই ট্রেন্ডে পরিণত হয়, যা সহজলভ্য এবং বাজেট ফ্রেন্ডলি। ইমিটেশন জুয়েলারি থেকে শুরু করে সোনা ও রুপো — বিভিন্ন ধাতুতেই এখন পাওয়া যাচ্ছে হালকা ও মিনিম্যালিস্টিক ডিজ়াইনের গয়না। ফলে পছন্দের গয়না কিনতে বাজেটের বাইরে যাওয়ারও প্রয়োজন পড়ছে না। তা ছাড়া সোনা-রুপো, এমনকী হীরেও মিলছে ছিমছাম ডিজ়াইনের মধ্যে। ৯ ক্যারাট ও ১৪ ক্যারাটের সোনা, ৯২.৫ রুপো এবং ডায়মন্ড ডাস্ট— ফাইন জুয়েলারিতে নজর কাড়ছে এগুলোই।
বেঙ্গল জুয়েলারির কর্ণধার শুভদীপ রায়ের বক্তব্য, ‘৯ ক্যারাটের তৈরি হালকা গয়নার দাম মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে। সাধারণত ১২-১৫ হাজারের মধ্যে হলমার্ক দেওয়া সোনার সিল্ক জুয়েলারি পাওয়া যায়।’ যদি ল্যাব-গ্রোন ডায়মন্ড থাকে, তখন দাম হয় মেরেকেটে ৩০ হাজার টাকা। যদি রুপোর ফাইন জুয়েলারির কথা বলা হয়, সে ক্ষেত্রে মাত্র দেড় হাজার টাকাতেই গলার চেন মিলছে। তবে এই সব গয়নাই হলমার্কযুক্ত। এই ধরনের গয়নার ক্রেতা মূলত ২০-৩৫ বছরের মহিলারা। তবে ৯ ক্যারাটের সোনায় খাঁটি সোনার পরিমাণ ৩৭.৫ শতাংশ। অর্থাৎ ২২ ক্যারাট সোনার তুলনায় এতে সোনার ভাগ অনেকটাই কম।
সামনে ধনতেরাস, কালীপুজো। তারপরেই শুরু হয়ে যাচ্ছে বিয়ের মরশুম। তখনই প্রিয় বন্ধু বা আত্মীয়ের বিয়ে। কী উপহার দেবেন? ভারী গয়না না আপনার পছন্দ, না বান্ধবীর। আর বাজেটও বেশি নয়। তা হলে উপায় কী? এই দ্বন্দ্বে পড়েও বহু মানুষ বেছে নিচ্ছেন স্লিক জুয়েলারি। হালকা ও ফ্যাশনবেল — সঙ্গে ফুটে ওঠে ব্যক্তিত্ব। তার উপর সোনাও থাকছে।
ফ্যাশন ইনফ্লুয়েন্সর পল্লবী গুহের মতে, ‘আমাদের বয়সিরা সোনায় বিনিয়োগ করতে চান। কিন্তু এমন গয়না পরতে চান না, যা তাঁদের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই নয়। আর ঠিক এখানেই স্লিক জুয়েলারি সবার মন জিতে নিয়েছে। এতে সোনায় যেমন বিনিয়োগ করা যাচ্ছে, তেমনই আবার রোজের ফ্যাশনের সঙ্গীও হয়ে উঠছে।’
পর্দায় শ্রদ্ধা কাপুরকে গত কয়েক বছরে সে ভাবে হিট ছবিতে দেখা যায়নি। তবে উদ্যোগপতি হিসেবে শ্রদ্ধা কাপুরকে প্রায় প্রত্যেক নিউ এজ তরুণীই চেনেন। নেপথ্যে রয়েছে তাঁর নিজস্ব জুয়েলারি ব্র্যান্ড ‘পালমোনাস’। সেখানেও ডেমি-ফাইন জুয়েলারি বিক্রি হয়। একই ভাবে ‘ক্যারাটলেন’, ‘ব্লুস্টোন’, ‘জিভা’-র মতো জুয়েলারি ব্র্যান্ডও এখন মধ্যবিত্তের ঘরে ঘরে। অন্যদিকে, ‘সেনকো গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ড’-এর ‘এভারলাইট’, ‘পি সি চন্দ্র জুয়েলার্স’-এর ‘পিসিসি লাইটস’, ‘তানিশক’-এর ‘মিয়া’-ও নজর কাড়ছে। ফাইন জুয়েলারির জন্য আলাদা বিভাগ তৈরি করেছে গয়নার সংস্থাগুলো। আর এগুলোর কথা কমবয়সিরাও জানেন।
ফাইন জুয়েলারি
শুভদীপের কথায়, ‘এই বছর ব্যাপক ট্রেন্ডে রয়েছে ৯ ক্যারাট। ফাইন জুয়েলারির জন্য সাব-ব্র্যান্ড তৈরি হচ্ছে। বিয়ে-জন্মদিনে উপহার দেওয়ার জন্য প্রচুর মানুষ এই ধরনের গয়না বেছে নিচ্ছেন।’ সোনার পাশাপাশি ব্যাপক চাহিদায় ৯২.৫ সিলভারও। এক হাজার টাকাতে মিলছে স্লিক চেন। মাত্র ৩ হাজার টাকা খরচ করলেই মিলবে স্টাড দুল কিংবা ব্রেসলেট। কিন্তু শুধুই দাম কম আর হালকা গয়না বলেই এই ধরনের জুয়েলারির চাহিদা বেশি?
স্টাইলিস্ট প্রলয় মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘গয়নার ক্ষেত্রে ডিজ়াইন, দাম ও গুণমান — সব কিছুই গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয় যে, এই ব্র্যান্ডগুলো এ ধরনের প্রতিটি দাবি পূরণ করছে বলেই এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।’ হাতে সোনার পাত বসানো ফ্ল্যাট ব্রেসলেট, ছোট্ট হীরের কানের দুল কিংবা সূক্ষ্ম নকশার লকেট — এতেই সাজ সম্পন্ন। এগুলো ছোট, পাতলা, হালকা হলেও অত্যন্ত মজবুত। চট করে ভাঙে না। তাই শুধু দেখতে সুন্দর হলেই হবে না, গয়নার ফিনিশিংও মজবুত হওয়া দরকার।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে পল্লবী জানান, তিনি গয়নার ওজন ও দামের চেয়েও ডিজ়াইন নিয়ে বেশি সচেতন। তিনি বলেন, ‘যখনই কোনও ফাইন জুয়েলারির ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করি, আমার ডিএম উপচে পড়ে মানুষের একের পর এক প্রশ্নে। এমন বহুবার হয়েছে, আমার ভিডিয়োর স্ক্রিনশট নিয়ে মানুষ দোকানে গিয়ে একই ডিজ়াইনের গয়না খুঁজেছেন।’
সরু চেন, ছোট পেনড্যান্ট, চিকন বালা, সরু আংটি, ছোট স্টাড কানের দুল কিংবা সূক্ষ্ম নকশার লকেট — ফাইন জুয়েলারির মূল আকর্ষণই হলো তার মিনিম্যালিস্টিক ডিজ়াইন। জ্যামিতিক আকার, ছোট্ট ফুল, হার্ট, ড্রপ কিংবা অন্যান্য সূক্ষ্ম মোটিফের গয়না এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তবে তরুণ প্রজন্মের বিশেষ পছন্দ হীরের গয়না। শুভদীপ রায়ের মতে, ‘ছোট হীরে বসানো স্লিক জুয়েলারির চাহিদা বেশি।’ পল্লবীর নজরেও ল্যাব-গ্রোন ডায়মন্ড ও ডায়মন্ড ডাস্টের গয়না জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
ফাইন জুয়েলারি শুধু দেখতে আধুনিক নয়, নানা ধরনের পোশাকের সঙ্গেও সহজে মানিয়ে যায়। অফিসের ফরম্যাল পোশাক, ওয়েস্টার্ন আউটফিট কিংবা ইন্দো-ওয়েস্টার্ন সাজ — সব ক্ষেত্রেই এই ধরনের গয়না পরা যায়। এমনকী শাড়ির সঙ্গেও সরু চেন, ছোট্ট লকেট বা হালকা কানের দুল বেশ মানানসই। স্টাইলিস্ট প্রলয়ের কথায়, ‘এখন ব্যাপক ভাবে ফ্যাশনে ইন স্লিক জুয়েলারি। তবে সব পোশাকের সঙ্গে গলায় হার পরার চল বহুদিন হলো উঠে গিয়েছে। কানে দুল পরলে সঙ্গে গলায় হার পরার দরকার পড়ে না।’ অর্থাৎ, অল্প গয়নাতেও সাজে আনা যায় সমসাময়িকতার ছোঁয়া। শুধু পোশাকের ধরন বুঝে গয়না বেছে নিলে ব্যক্তিত্ব আরও ভালো ভাবে ফুটে ওঠে।
এক সময়ে শুধু ওয়েস্টার্ন আউটফিটের সঙ্গে ফাইন জুয়েলারি পরার ট্রেন্ড ছিল। কিন্তু এখন ইন্দো-ওয়েস্টার্ন পোশাকের সঙ্গেও দিব্যি মানিয়ে যাচ্ছেন এই ধরনের গয়না। ‘এমন মোটিফ বেছে নিতে হবে, তাতে ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে, অথচ মিনিম্যালিস্ট লুক পাওয়া যায়,’ বললেন তন্ময়। তাই হালকা গয়না বলে একসঙ্গে অনেক কিছু পরে ফেললেই চলবে না। একাধিক চেন বা নেকলেস লেয়ার করার সময়ে পোশাকের নেকলাইন, গয়নার দৈর্ঘ্য এবং সামগ্রিক সাজের দিকেও নজর দিতে হবে।
সাধ্যের মধ্যে দাম, হালকা ওজন, আধুনিক ডিজ়াইন এবং রোজ ব্যবহার করা যায় — ফাইন জুয়েলারি ক্রমে ‘ইন’ হওয়ার পিছনে রয়েছে এই কারণগুলোই। ভারী গয়নার বদলে অল্প সাজে ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলতে চাইলে বেছে নিতে পারেন ফাইন জুয়েলারি।
