কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশে তৈরি হওয়া ডেটা সেন্টারগুলোর বিপুল বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে নতুন ভরসা হয়ে উঠছে ফিউয়েল সেল প্রযুক্তি।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পাওয়ার গ্রিডের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা এড়াতে এবং নিরবচ্ছিন্ন পাওয়ার নিশ্চিতে দেশটির প্রযুক্তি জায়ান্টরা এখন নিজস্ব প্রাঙ্গণেই এ সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে বলে প্রতিদবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
২০২৫ সালে ডেটা সেন্টারের জন্য ফিউয়েল সেল খাতে কেবল ২৮০ কোটি ডলার বিনিয়োগ ছিল। জ্বালানি গবেষণা ও পরামর্শক কোম্পানি ‘রাইস্টাড এনার্জি’র আনুমানিক হিসাবে, ২০৩০ সাল নাগাদ তা লাফিয়ে প্রায় তিন হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
ফিউয়েল সেল কী?
ফিউয়েল সেল রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
এতে প্রাকৃতিক গ্যাস বা হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে প্রত্যক্ষভাবে শক্তিকে বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয়, যেখানে প্রচলিত প্রক্রিয়ার মতো জ্বালানি পোড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না।
প্রযুক্তি কোম্পানি ‘ব্লুম এনার্জি’ তাদের সলিড-অক্সাইড প্রযুক্তিতে শতভাগ খাঁটি হাইড্রোজেন ব্যবহারের সুযোগ রেখেছে। অন্যদিকে, ‘ফিউয়েল সেল এনার্জি’ ব্যবহার করছে মল্টেন কার্বনেট প্রযুক্তি, যা সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হাইড্রোজেন মিশ্রণে কার্যকর। তবে দুটি প্রক্রিয়াই জ্বালানি ব্যবহারে বেশ নমনীয়।
কেন বাড়ছে এই চহিদা?
বড় আকারের এআই কম্পিউটিং সরঞ্জাম ও কুলিং সিস্টেম ২৪ ঘণ্টা সচল রাখতে বিভিন্ন ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন ও বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ।
‘রাইস্টাড এনার্জি’র হিসাব অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় পাওয়ার গ্রিডের সঙ্গে বড় আকারের নতুন কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন করতে তিন থেকে ছয় বছর পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে।
এ দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে প্রযুক্তি জায়ান্টরা নিজস্ব প্রাঙ্গণেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করছে।
‘ব্লুম এনার্জি’র প্রধান নির্বাহী কে আর শ্রিধর এক আয়ের পর্যালোচনামূলক বৈঠকে বলেছেন, “ওরাকলের সঙ্গে চুক্তির পর কেবল দুই মাসেরও কম সময়ে আমরা তাদের ইউটাহ সাইটে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে পেরেছি।
“নেবিয়াসের নিউ জার্সি প্রজেক্টেও একই গতি দেখা গেছে। চুক্তি স্বাক্ষরের তিন মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় অনুমোদন মিলেছে।”
রাইস্টাড পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০৩০ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রে যে পরিমাণ নতুন ডেটা সেন্টার তৈরি হবে তার প্রায় ৪০ শতাংশই সরাসরি জাতীয় গ্রিডের ওপর ভরসা না করে নিজস্ব অন-সাইট পাওয়ারের পথ বেছে নিতে পারে।
এ ছাড়া, প্রচলিত উপায়ে গ্যাস পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেয়ে ফিউয়েল সেলে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষতিকর নিঃসরণ অনেক কম, যা পরিবেশগত দিক থেকেও নির্ভরযোগ্য বিকল্প হয়ে উঠেছে।
লাভবান হচ্ছে কোন কোম্পানিগুলো?
ফিউয়েল সেলের এ অভাবনীয় চাহিদায় সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে উৎপাদনকারী বিভিন্ন কোম্পানি।
এ বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ‘ব্লুম এনার্জি’র আয় ১৩৮ শতাংশ বেড়ে পৌঁছেছে ১২৪ কোটি ডলারে। গেল বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির ২ কোটি ৩১ লাখ ডলার ক্ষতি হলেও এবার ২৫ কোটি ৩ লাখ ডলার নিট মুনাফা করেছে তারা।
ব্যবসা জোরদার হওয়ায় ২০২৬ সালের বার্ষিক আয়ের পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৪৪০ কোটি থেকে ৪৬০ কোটি ডলার নির্ধারণ করেছে ব্লুম।
ব্লুমের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ২.৮ গিগাওয়াট সক্ষমতার ফিউয়েল-সেল সিস্টেম সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে মার্কিন ক্লাউড কম্পিউটিং জায়ান্ট ওরাকল, যার মধ্যে ১.২ গিগাওয়াটের চুক্তি এরইমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
অন্যদিকে, আরেক কোম্পানি ‘ফিউয়েলসেল এনার্জি’ও তাদের নজর বাড়িয়েছে ডেটা সেন্টারের বাজার দখলে।
কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী জেসন ফিউ বলেছেন, “বর্তমানে বিদ্যুতের দাম তুলনার চেয়েও কত দ্রুত বিদ্যুৎ পৌঁছানো যাচ্ছে সেটাই মূল বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে তাদের মোট ব্যবসার ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশই ডেটা সেন্টার খাত থেকে আসতে পারে বলে মনে করছে ফিউয়েলসেল এনার্জি, যা বর্তমানে কেবল ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ।
রাইস্টাড এনার্জির হিসাব অনুসারে, ওরাকল, এইপি, ইকুইনোট্রিক্স ও ব্রুকফিল্ডের মতো কোম্পানির সঙ্গে করা ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি মিলিয়ে এ মুহূর্তে এই শিল্পের অর্ডার বুকের আকার প্রায় ৯ গিগাওয়াট।
তবে ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তিগুলোর সবটুকু যে চূড়ান্ত ক্রয়াদেশ হিসেবে রূপান্তরিত হবে তা নিশ্চিত নয়।
চাহিদা অনুসারে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব?
প্রযুক্তির বৈপ্লবিক বিস্তার ঘটলেও শিল্পটি কি যথেষ্ট দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারবে সে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
রাইস্টাড এনার্জি’র ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে ফিউয়েল সেলের বার্ষিক বৈশ্বিক উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানের ১.৮ গিগাওয়াট থেকে বেড়ে ৪ গিগাওয়াটে পৌঁছাবে।
১০০ মেগাওয়াটের বেশি বড় প্রকল্পের বিষয়ে ব্লুমের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আমান জোশি বলেছেন, “বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণের মূল কারণ ফিউয়েল সেল প্রযুক্তি নিজে নয়, বরং মূল বাধা অবকাঠামোগত প্রস্তুতি, সরকারি অনুমোদন ও প্রাথমিক সরঞ্জাম সংগ্রহ।”
কারণ ফিউয়েল সেল বসানোর পরও সেখানে গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় ট্রান্সফরমার ও সুইচগিয়ার বসানো এবং অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় সময় লেগেই যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় গ্রিডের পাশাপাশি অন-সাইট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফিউয়েল সেল বড় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রসার নির্ভর করবে সরবরাহকারীরা সাশ্রয়ী দামে এ প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে পারছে কি না এবং বিকাশকারীরা কত দ্রুত মূল অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করতে পারছে তার ওপর।
