মাদরাসাগুলোকে কৌশলে স্কুলে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
তানযীমুল উম্মাহর ১৪তম হিফযুল কুরআন অ্যাওয়ার্ড
মাদরাসাগুলোকে কৌশলে স্কুলে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, সরকারি আলিয়া মাদরাসাগুলো এখন ভূতুড়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এমপিওভুক্ত মাদরাসাগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। সিলেবাস সংকুচিত করা হয়েছে। এখন আবার কৌশলে মাদরাসাকে স্কুলে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গতকাল সোমবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের ১৪তম হিফজুল কোরআন অ্যাওয়ার্ড ও কোরআন উৎসব-২০২৬ অনুষ্ঠানের প্রথম অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “মাদরাসা নিয়ে যারা ষড়যন্ত্র করছেন, তারা কি আমাজনের জঙ্গল থেকে এসেছেন? না, তারা এ দেশেরই মানুষ, এ দেশেরই সন্তান।” মাদরাসার অনুষ্ঠানে তাঁদের নিজেদের মুমিন-মুসলমান হিসেবে উপস্থাপন করতে দেখা গেলেও মাদরাসার বিষয়ে নীতিনির্ধারণের সময় তাঁদের কর্মকাণ্ডে এর প্রতিফলন দেখা যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, যারা মাদরাসাকে অবহেলা-অবজ্ঞা করবেন কিংবা এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবেন, তাঁদের মনে রাখতে হবে, আখেরাতের বিচার আল্লাহ তাআলার হাতে। দুনিয়াতেও তাঁরা সম্মানের জায়গায় থাকতে পারবেন না। কারণ, তাঁরা একটি সুন্দর সমাজ গড়ে উঠুক, তা চান না। তাঁরা চান, শিক্ষিত হয়ে একশ্রেণির লুটেরা তৈরি হোক, যারা চুরি, চাঁদাবাজি, দখলবাণিজ্য ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে দেশকে লুটেপুটে খাবে।
জামায়াত আমীর বলেন, এ ধরনের লোকেরা দেশকে নিজেদের রুজি-রোজগারের ক্ষেত্র এবং দেশের মানুষকে প্রজা মনে করেন। তাঁদের আত্মীয়স্বজন ও সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়ে নিজেরা দেশপ্রেমের কথা বলেন। সমাজের এ মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য কোরআনের শাসনের পাশাপাশি কোরআনের চর্চাও প্রয়োজন। কোরআনের শিক্ষা যত বেশি বিকশিত হবে, সমাজ তত বেশি উপকৃত হবে।
মাদরাসাশিক্ষা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, মাদরাসার শিক্ষার্থীরা এখন সিভিল প্রশাসন, পুলিশ, স্বাস্থ্যসেবা ও কূটনীতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যুক্ত হচ্ছেন। তাঁরা মেধা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকছেন। মাদরাসার শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ভালো করতে সক্ষম।
তিনি বলেন, মাদরাসায় নৈতিক ও আখলাকি শিক্ষা দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা মেধাবী হওয়ার পাশাপাশি সৎ মানুষ হিসেবেও গড়ে ওঠার সুযোগ পান। মেধা ও চরিত্রকে উপেক্ষা করা হলে সমাজ জঙ্গলে পরিণত হয়। দেশপ্রেমিক ও নৈতিকতাসম্পন্ন নাগরিক গড়ে তুলতে মাদরাসাশিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায়ও নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তৃতীয় অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার অভাবে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কমে যাচ্ছে। দ্বীনি শিক্ষা থেকে পিছিয়ে গেলে তা জাতির জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে আনবে না। ধর্মীয় মূল্যবোধ ছাড়া আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, নৈতিক, ইসলামিক ও ধর্মীয় শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে সামাজিক অবক্ষয় ঘটছে। এ অবক্ষয় রোধে শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। আগামী দিনের শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় মূল্যবোধ অন্তর্ভুক্তির কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য ধর্মীয় শিক্ষার ওপর আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মাদরাসাশিক্ষার আধুনিকায়নে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
ড. এহছানুল হক মিলন আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী রয়েছেন। তাঁরা আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে পারলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও বাড়ানো সম্ভব।
১ হাজার ৭৫৯ হাফেজকে সম্মাননা
কোরআনের আলোয় আলোকিত প্রজন্ম গড়ে তোলা এবং হাফেযদের উৎসাহিত ও সম্মানিত করার প্রত্যয়ে আয়োজিত এ উৎসবে তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশন পরিচালিত বিভিন্ন শাখার ১ হাজার ৭৫৯ জন হাফেয শিক্ষার্থীকে ক্রেস্ট, সনদ, পাগড়ি বা স্কার্ফ এবং অ্যাওয়ার্ড ব্যাগ প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে তাঁদের পিতা-মাতাকেও বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়। সন্তানদের হাফেয হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে অভিভাবকদের ত্যাগ ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ সম্মাননা দেওয়া হয়।
সকাল থেকেই অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানস্থলে আসতে শুরু করে। সাদা জুব্বা ও পাগড়িতে হাফেয ছাত্র এবং আকাশি নীল-সাদা পোশাকে হাফেয ছাত্রীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, হামদ-নাত, ইসলামী সংগীত, বক্তব্য ও কবিতা আবৃত্তিতে মুখর হয়ে ওঠে সম্মেলন কেন্দ্র।
অনুষ্ঠানের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ অধ্যক্ষ ড. মাওলানা শাহজাহান আল-মাদানী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাফেয ড. এ বি এম হিযবুল্লাহ, অধ্যক্ষ মাওলানা সাইয়্যেদ কামালুদ্দিন আব্দুল্লাহ জাফরী, তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল ড. মাওলানা হিফজুর রহমান, সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল ও সাইফুল আলম খানসহ বিশিষ্ট আলেম, শিক্ষাবিদ ও কোরআন গবেষকরা।
দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ। সভাপতিত্ব করেন তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার সাবেক অধ্যাপক মুফতি ড. আবু ইউছুফ খান। এ অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান, আল-কুরআন একাডেমি লন্ডনের চেয়ারম্যান হাফেয মুনীর উদ্দিন আহমদ, দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানসহ আলেম, গবেষক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
তৃতীয় অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক নিয়াজ আহমাদ খান এবং সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন, হাফেয রাশেদুল ইসলাম ও সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন তামীরুল মিল্লাত ট্রাস্টের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীন।
এছাড়া অনুষ্ঠানে তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হাবীবুল্লাহ মুহাম্মদ ইকবাল, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন, ভাইস চেয়ারম্যান শাহ ওলীউর রহমান চিশতি, ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন পর্যায়ের পরিচালক ও দায়িত্বশীল, শাখাপ্রধান, শিক্ষক, সাংবাদিক, অভিভাবক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট আলেম ও কোরআন গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন।
