বর্তমান বিশ্বে স্বীকৃত স্বাধীন দেশের সংখ্যা ১৯৫টি। এর মধ্যে আপনি কয়টা দেশের নাম বলতে পারবেন? ১০টা, ২০টা, ৩০টা, ৫০টা। অনেকে হয়তো ১৯৫টি দেশের নাম মুখস্থ করে রেকর্ড গড়তে চাইবেন। তবে তা ভিন্ন বিষয়। আমরা সাধারণ মানুষরা ঘরে বসে এখনো ইন্টারনেট আর মোবাইল ফোনের দৌলতে এখন অনেক দেশের নাম জানি, তবে এদের সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য হয়তো জানি না বা জানার সময়-সুযোগ হয়নি।
বিশ্বে এমন কিছু স্থান বা দেশ আছে যা এখনো একবিংশ শতাব্দীতে এসে আলাদা। তাদের ঐতিহ্য তারা ধরে রেখেছে জন্মলগ্ন থেকেই। এখনো তারা বদলায়নি তাদের পূর্বপুরুষদের করে যাওয়া নিয়ম-সংস্কৃতি, রীতিনীতি। এমনই এক দেশের কথা জানাতে চলেছি আজ। যেখানে গত ১০০ বছরে কোনো শিশু জন্মায়নি। নেই নিজেদের হাসপাতাল, এমনকি সেনাবাহিনী। ভাবতে অবাক লাগছে নিশ্চয়ই? আসুন বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক-
ইতালির রাজধানী রোমের ব্যস্ত রাস্তা, ঐতিহাসিক স্থাপনা আর জনবহুল শহরের ঠিক মাঝখানে রয়েছে এমন এক স্বাধীন রাষ্ট্র, যার আয়তন একটি বড় শহরের কয়েকটি এলাকার চেয়েও ছোট। দেশটির নাম ভ্যাটিকান সিটি। পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত এই দেশকে ঘিরে রয়েছে নানা বিস্ময়। এখানে রয়েছেন ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ, রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা, অসাধারণ সব শিল্পকর্ম আর ইতিহাসসমৃদ্ধ জাদুঘর। অথচ এত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব কোন সাধারণ হাসপাতাল নেই।
শুনতে অবাক লাগলেও, ভ্যাটিকান সিটির জীবনযাপনের ধরন সত্যিই অন্য অনেক দেশের চেয়ে আলাদা। অসুস্থ হলে সেখানকার মানুষ কী করেন? কোনো শিশুর জন্মের প্রয়োজন হলে কোথায় যান? আর কেনই বা এত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রে হাসপাতাল গড়ে ওঠেনি? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে পরিচিত পৃথিবীর বাইরে এক ভিন্ন বাস্তবতার সন্ধান পাওয়া যায়।
ভ্যাটিকান সিটির আয়তন মাত্র ০.৪৪ বর্গকিলোমিটার বা ৪৪ হেক্টর। চারদিকে ইতালির রাজধানী রোমের শহর, আর তার মাঝেই প্রাচীরঘেরা এই স্বাধীন রাষ্ট্র। ১৯২৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইতালির সঙ্গে ল্যাটেরান চুক্তির মাধ্যমে ভ্যাটিকান সিটির সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
দেশটির পরিচয় অবশ্য শুধু আয়তনে সীমাবদ্ধ নয়। ক্যাথলিক চার্চের কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে এর ধর্মীয় গুরুত্ব অপরিসীম। সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে প্রতিদিন ভিড় করেন পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরা। ভ্যাটিকান মিউজিয়াম আর সিস্টিন চ্যাপেলের শিল্পকর্ম দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। কিন্তু এই বিপুল আন্তর্জাতিক পরিচিতির আড়ালে রাষ্ট্রটির দৈনন্দিন জীবনযাত্রা বেশ ব্যতিক্রমী।
ধরা যাক, ভ্যাটিকান সিটিতে কর্মরত কেউ হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাকে চিকিৎসার জন্য খুব দূরে কোনো দেশে যেতে হবে না। কারণ ভ্যাটিকান সিটি রোমের ভেতরে অবস্থিত। প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীকে রোমের হাসপাতালগুলোতে নেওয়া যায়।
রাষ্ট্রটির নিজস্ব হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ব্যবস্থা নেই। তবে স্বাস্থ্যসেবা একেবারেই অনুপস্থিত, এমন নয়। ভ্যাটিকানের সরকারি তথ্যভান্ডারে স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বিভাগ এবং ওষুধের দোকানের উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ, ছোট রাষ্ট্রটির চিকিৎসাব্যবস্থা তার ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কয়েকশ মানুষের জন্য আলাদা পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল গড়ে তোলার বদলে জটিল চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রতিবেশী শহরের হাসপাতাল ব্যবহার করা হয়। এ ব্যবস্থার সুবিধা হলো, উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্র খুব কাছেই রয়েছে। এখন বড় প্রশ্ন, সেখানে শিশুর জন্ম হয় না? রাষ্ট্রটির নিজস্ব প্রসূতি হাসপাতাল বা মাতৃসদন নেই বলেই সাধারণত সন্তান জন্মদানের জন্য মায়েদের রোমের হাসপাতালগুলোর ওপরই নির্ভর করতে হয়।
আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, ভ্যাটিকান সিটিতে নাগরিকত্ব সাধারণত জন্মস্থানের ভিত্তিতে পাওয়া যায় না। নির্দিষ্ট পদে দায়িত্ব পালন, সেই দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত বসবাস এবং প্রযোজ্য নিয়মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব নির্ধারিত হয়। ভ্যাটিকান সিটির জনসংখ্যাও বিস্ময় জাগানোর মতো ছোট। দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানে নাগরিক ছিলেন ৬৭৩ জন। তবে রাষ্ট্রটির ভেতরে বসবাসকারী নাগরিক ও অনাগরিক মিলিয়ে বাসিন্দার সংখ্যা ছিল ৮৮২। অর্থাৎ নাগরিক আর মোট বাসিন্দার হিসাব এক নয়।
এখানে রয়েছেন পোপ, যাজক, বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি এবং পোপের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সুইস গার্ডের সদস্যরা। দেশটির আয়তন ও জনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় সরকারি দপ্তরসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রোমের ভেতরে ভ্যাটিকানের অধিকারভুক্ত অন্য ভবনেও কাজ করে।
ভ্যাটিকান সিটির গল্প শুধু হাসপাতাল না থাকার বিস্ময় নয়। এটি দেখায়, একটি রাষ্ট্রের সব পরিষেবা তার নিজস্ব সীমানার মধ্যে থাকতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা ও প্রশাসনিক প্রয়োজন বিবেচনা করে অন্যভাবে পরিষেবার ব্যবস্থা করা যায়।
বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোর একটি হয়েও ভ্যাটিকান সিটি দৈনন্দিন চিকিৎসার জন্য পাশের রোমের ওপর নির্ভর করে। আর এই বৈপরীত্যই দেশটিকে আরও কৌতূহলোদ্দীপক করে তুলেছে। আয়তনে ক্ষুদ্র এই রাষ্ট্রের পরিচয় তাই শুধু তার প্রাচীর, গির্জা কিংবা পোপকে ঘিরে নয় বরং সীমিত পরিসরে কীভাবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নিজের প্রয়োজন মেটায়, সেই অনন্য ব্যবস্থার মধ্যেও লুকিয়ে রয়েছে।
