অনলাইন ডেস্ক
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ার পেছনে শুধু টিকার ঘাটতি নয়, শিশুদের পুষ্টিহীনতাকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ঠিক সময়ে টিকা, ভিটামিন এ, কৃমিনাশক ও মায়ের বুকের দুধ না পাওয়ায় অনেক শিশু দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে বড় হচ্ছে। এর ফলে হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামে ও হামের উপসর্গে আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামে ও হামের উপসর্গে মারা গেছে ৩৪৩ শিশু।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সময়মতো টিকা ও পুষ্টি নিশ্চিত করা গেলে এত প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব ছিল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, শিশুদের প্রতি ধারাবাহিক অবহেলার ফলেই বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষায়, মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো, ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন ও কৃমিনাশক কার্যক্রমে ঘাটতি অপুষ্টি বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে নিয়মিত টিকাদানে পিছিয়ে পড়ায় শিশুরা অরক্ষিত হয়ে পড়েছে।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত শিশুদের ৮৫ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। আক্রান্তদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ কোনো টিকাই পায়নি এবং ২১ শতাংশ আংশিক টিকা পেয়েছে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) অনুযায়ী, শিশুদের ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে হামের দুটি ডোজ দেওয়া হয়। তবে ২০২৩ সালের মূল্যায়নে দেখা গেছে, মাত্র ৮২ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় এসেছে। অর্থাৎ প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
এদিকে, জাতীয় হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন নির্ধারিত সময়েও হয়নি। ২০২৫ সালে হওয়ার কথা থাকলেও নানা কারণে তা পিছিয়ে যায়। অবশেষে চলতি বছরের ২০ এপ্রিল ক্যাম্পেইন শুরু হয়, কিন্তু তার আগেই সারা দেশে হাম ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, শিশুদের ভিটামিন এ ঘাটতিও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। দেশে শিশুদের মধ্যে ভিটামিন এ–এর ঘাটতি তুলনামূলক বেশি হলেও নির্ধারিত সময়ে ক্যাম্পেইন হয়নি। সর্বশেষ ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০২৫ সালের মার্চে। এরপর আর কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়নি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, ভিটামিন এ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অপুষ্ট শিশু টিকা না পেলে তার সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
এ ছাড়া শিশুদের মধ্যে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর হারও কমেছে। সর্বশেষ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খায়—এমন শিশুর হার নেমে এসেছে ৫৩ শতাংশে, যা আগের তুলনায় অনেক কম।
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা, পুষ্টি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সমন্বিত ঘাটতির কারণেই দেশে হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিচ্ছে।
