সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘আমার মৃত্যুর জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দায়ী থাকবেন’ মর্মে বিতর্কিত ও সংবেদনশীল পোস্ট দেওয়ার জেরে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড মো. আরিফুর রহমান শান্তকে তাঁর নিজ দায়িত্ব থেকে অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হয়েছে। সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের এক জরুরি প্রশাসনিক আদেশে তাঁকে জামালগঞ্জ থেকে প্রত্যাহার করে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সংযুক্ত (অ্যাটাচ) করা হয়। রোববার (২৫ অক্টোবর) সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মুজিবুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি সরকারি প্রজ্ঞাপনে এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয় যে, জামালগঞ্জ উপজেলায় কর্মরত বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান শান্তকে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ন্যস্ত করা হলো এবং জনস্বার্থে জারিকৃত এ নির্দেশ অনতিবিলম্বে কার্যকর বলে গণ্য হবে।
ঘটনার পটভূমি ও সময়রেখা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দিবাগত গভীর রাতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফুর রহমান শান্ত তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ থেকে “আমার মৃত্যুর জন্য শিল্পী রাণী মোদক (ইউএনও) দায়ী থাকবে” মর্মে একটি চাঞ্চল্যকর স্ট্যাটাস দেন। এই আকস্মিক পোস্টের মাত্র কয়েক মিনিট পরেই তিনি “আই রিজাইন ফ্রম অ্যাডমিন ক্যাডার” (আমি প্রশাসন ক্যাডার থেকে পদত্যাগ করলাম) লিখে আরও একটি নজিরবিহীন ও বিস্ফোরক পোস্ট দেন। মধ্যরাতে প্রশাসনের একজন দায়িত্বরত মাঠপর্যায়ের ক্যাডার কর্মকর্তার এমন পরপর দুটি পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে (ভাইরাল) এবং স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিক সমাজে তীব্র চাঞ্চল্য ও আতঙ্কের সৃষ্টি করে। এই ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিল্পী রাণী মোদক দাপ্তরিক ‘ইউএনও জামালগঞ্জ’ ফেসবুক পেজ থেকে একটি বার্তা পোস্ট করে দাবি করেন—‘এসিল্যান্ডের ফেসবুক আইডিটি হ্যাক হয়েছে, এ বিষয়ে কেউ বিভ্রান্ত হবেন না।’
ইউএনওর ফেসবুক পেজে আইডি হ্যাক হওয়ার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কিছুক্ষণের মধ্যেই আশ্চর্যজনকভাবে এসিল্যান্ড আরিফুর রহমানের পেজ থেকে পূর্বের বিতর্কিত দুটি পোস্টই সরিয়ে ফেলা বা মুছে দেওয়া (ডিলিট) হয়। একজন কর্মকর্তার ফেসবুক আইডি হ্যাক হওয়া এবং তাৎক্ষণিকভাবে সেই পোস্ট আবার ডিলিট হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সুশীল সমাজ, সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে চরম বিস্ময় ও নানা মুখরোচক আলোচনার সৃষ্টি হয়। আইডি সত্যিই হ্যাক হয়েছিল নাকি প্রশাসনিক কোনো জটিলতার কারণে ঘটনাটি ঘটেছে—তা নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন তৈরি হয়। এ নিয়ে পরদিন দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন জাতীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের নজরে আসে এবং দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়।
পরবর্তীতে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ দাবি করে আরিফুর রহমান শান্তকে তাঁর পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসার জন্য প্রথমে সিলেটে এবং পরবর্তীতে ঢাকার উন্নত হাসপাতালে নিয়ে যান। এর মধ্যেই বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে তাঁর প্রত্যাহারের এই কঠোর নির্দেশ জারি হলো। জনপ্রশাসন ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের মতো সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় পদে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের আচরণবিধি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কোনো কর্মকর্তার মানসিক অসন্তোষ, অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব কিংবা পদত্যাগের মতো বিষয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এভাবে প্রকাশ করা সরকারি চাকরিজীবীদের আচরণবিধির সরাসরি লঙ্ঘন। উদ্ভূত ঘটনাটি মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে। ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট উদ্ঘাটনে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
