ক্ষমতার পালাবদলে দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রয়োজন
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম
আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম
শফিকুল হক
-->কোনো রাজনীতিবিদ, কর্মকর্তা বা সাংবিধানিক পদধারীর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হওয়া উচিত নয় তার রাজনৈতিক ক্ষমতা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা প্রভাব। সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হওয়া উচিত তার নিজের কাজের একটি স্বচ্ছ রেকর্ড–যে রেকর্ড প্রমাণ করে, ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি সংবিধান, আইন ও রাষ্ট্রের স্বার্থের সীমার মধ্যেই তার দায়িত্ব পালন করেছেন।...
রাজনীতির সবচেয়ে সহজ সত্যগুলোর একটি হলো–ক্ষমতা স্থায়ী নয়। একজন প্রধানমন্ত্রী একদিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হন। একজন মন্ত্রী একদিন মন্ত্রিত্ব ছাড়েন। একজন সচিব অবসরে যান। একজন নির্বাচন কমিশনারের মেয়াদ শেষ হয়। একজন রাষ্ট্রপতিও একসময় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। কিন্তু পদ শেষ হলেও দায়িত্ব পালনকালে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো থেকে যায়। থেকে যায় স্বাক্ষর করা নথি, দেওয়া নির্দেশ, নেওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর তার প্রভাব। তাই ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় একটি বিষয় মনে রাখা দরকার–আজকের সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন হয়তো আজ হবে না, কিন্তু একদিন হতে পারে। আজ যে সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক মনে হচ্ছে, কয়েক বছর পর সেটিই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। আজ যে ক্ষমতা অপরিসীম মনে হচ্ছে, আগামীকাল তা আর নাও থাকতে পারে। এই উপলব্ধি যদি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে ক্ষমতার ব্যবহারও হয়তো আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হবে। একটি সরকার দেশ পরিচালনার জন্য জনগণের কাছ থেকে বৈধ ম্যান্ডেট পায়। কিন্তু একজন সরকারি কর্মকর্তা বা সাংবিধানিক পদধারীর দায়িত্ব শুধু সরকারের প্রতি আনুগত্য দেখানো নয়। চূড়ান্ত আনুগত্য হওয়া উচিত সংবিধান ও আইনের প্রতি। একজন কর্মকর্তা যদি কোনো নির্দেশ পেয়ে মনে করেন তা আইনসম্মত নয়, তাহলে তার তা বলার সুযোগ থাকা উচিত। সেটিকে যেন অবাধ্যতা বা রাজনৈতিক বিরোধিতা হিসেবে দেখা না হয়। বরং একজন কর্মকর্তা যখন বলেন, ‘এটি আইন অনুযায়ী করা সম্ভব নয়’, তখন তিনি হয়তো সরকারকেই ভবিষ্যতের একটি বড় সমস্যা থেকে রক্ষা করছেন। এমন পরিবেশ দরকার, যেখানে আইনসম্মত কারণে কোনো নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করার জন্য একজন কর্মকর্তাকে বদলি, পদোন্নতি বন্ধ বা অন্য কোনো পেশাগত চাপের আশঙ্কায় থাকতে হবে না। এটি কোনো একটি সরকারের জন্য নয়। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, এই নীতিটি সবার জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত। সরকারি নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রেও একই বিষয় বিবেচনা করা দরকার। যোগ্যতা, সততা ও অভিজ্ঞতার পরিবর্তে যদি ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা রাজনৈতিক আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে। এতে শুধু একজন যোগ্য ব্যক্তি বঞ্চিত হন না; পুরো ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাও কমে যেতে পারে। কোনো সরকারই হয়তো সব ধরনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারবে না। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ মানদণ্ড, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া সম্ভব। একইভাবে, কর্মকর্তাদের মধ্যেও এমন সংস্কৃতি দরকার, যেখানে সঠিক কাজ করার জন্য রাজনৈতিক আনুগত্য দেখাতে হবে না। একজন কর্মকর্তা যেন জানেন, তার পেশাগত ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তার কাজের মান ও সততার ওপর, ক্ষমতাবান ব্যক্তির প্রতি তার ব্যক্তিগত আনুগত্যের ওপর নয়।
আমার কাছে রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি সুন্দর উদাহরণ হতে পারে খুব সাধারণ একটি দৃশ্য। দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী–যারা হয়তো জীবনের বড় একটি সময় একে অপরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন–একদিন পাশাপাশি বসে চা খাচ্ছেন, কথা বলছেন। তাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তারা একে অপরের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনাও করতে পারেন। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে কথা বলতে পারবেন, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন, পরস্পরকে একজন সাবেক রাষ্ট্রনেতা হিসেবে সম্মান করতে পারবেন। এটি অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা হওয়া উচিত নয়। বরং একটি পরিণত গণতন্ত্রে এটিই স্বাভাবিক হওয়ার কথা। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, তীব্র বিতর্ক থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মানেই ব্যক্তিগত শত্রু–এমন সংস্কৃতি কোনো দেশের জন্য ভালো হতে পারে না। তবে রাজনৈতিক সহনশীলতার অর্থ এই নয় যে, কেউ অপরাধ করলে তার জবাবদিহি থাকবে না। অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকলে তদন্ত হওয়া উচিত। সরকারি অর্থের অপব্যবহার হলে তা তদন্ত হওয়া উচিত। আইন বা সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতার অপব্যবহার হলে তার দায় নির্ধারণ করা উচিত। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াটি হতে হবে নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক। কারও গ্রেপ্তার হওয়া মানেই তিনি অপরাধী–এমন ধারণা যেমন ঠিক নয়, তেমনি কেউ সাবেক মন্ত্রী, সাবেক কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন বলে তাকে আইনের বাইরে রাখাও ঠিক নয়। রাজনৈতিক পরিচয় যেন বিচার নির্ধারণের মাপকাঠি না হয়। আমার কাছে মূল পার্থক্যটি এখানেই–জবাবদিহি দরকার, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা দরকার নেই। আমাদের লক্ষ্য এমন হওয়া উচিত নয় যে, রাজনীতিবিদ বা সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কখনো মামলা হবে না। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে মামলা হলে তা প্রমাণের ভিত্তিতে হবে এবং বিচার হলে তা স্বাধীনভাবে হবে। একজন রাজনীতিবিদ যেন ক্ষমতা ছাড়ার পর বলতে পারেন–আমি যদি আইন মেনে কাজ করে থাকি, তাহলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে আমাকে ভয় পেতে হবে না। আবার একই সঙ্গে তাকে এটাও জানতে হবে–আমি যদি সত্যিই কোনো অপরাধ করে থাকি, তাহলে রাজনৈতিক ক্ষমতা আমাকে রক্ষা করবে না।
আমার মনে হয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কিছু মৌলিক বিষয়ে একটি বৃহত্তর বোঝাপড়া তৈরি হওয়া দরকার। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়–এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার। সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিরা সংবিধান অনুযায়ী কাজ করবেন, বেআইনি নির্দেশ মানার জন্য কর্মকর্তাদের ওপর চাপ দেওয়া হবে না, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নিয়োগে যোগ্যতা ও সততাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং স্বজনপ্রীতি ও ব্যক্তিগত প্রভাব কমানোর চেষ্টা থাকবে। বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত হতে দেওয়া হবে এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত হবে না। ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরকে অস্বাভাবিক কিছু নয়, বরং গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করা হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাজনৈতিক পরিচয়-নির্বিশেষে একই আইনি মানদণ্ড সবার জন্য প্রযোজ্য হবে। এগুলো কোনো একটি দলের জন্য বিশেষ সুবিধা নয়। বরং যে দল আজ ক্ষমতায় আছে, আগামীকাল সেই দলই হয়তো বিরোধী দলে থাকবে। যে নেতা আজ রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, একদিন তিনিই সাবেক নেতা হবেন। আমাদের হয়তো জনসেবার সাফল্য মাপার পদ্ধতিও নতুন করে ভাবতে হবে। বাংলাদেশের জন্য হয়তো এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সময় এসেছে, যেখানে ক্ষমতাকে স্থায়ী সম্পদ হিসেবে নয়, সাময়িক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হবে। যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান কোনো দলের সম্পত্তি হবে না। যেখানে সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে অন্ধ আনুগত্য নয়, আইনের প্রতি আনুগত্য প্রত্যাশা করা হবে। যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে তীব্র মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু ব্যক্তিগত শত্রুতা থাকবে না। যেখানে সত্যিকারের অপরাধের জবাবদিহি হবে; যেখানে সাবেক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা স্বাভাবিকভাবে একসঙ্গে বসতে পারেন; যেখানে একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তার কর্মজীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে বলতে পারেন–তিনি কোনো ব্যক্তির নয়, সংবিধ রাজনীতিবিদ, কর্মকর্তা বা সাংবিধানিক পদধারীর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হওয়া উচিত নয় তার রাজনৈতিক ক্ষমতা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা প্রভাব। সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হওয়া উচিত তার নিজের কাজের একটি স্বচ্ছ রেকর্ড–যে রেকর্ড প্রমাণ করে, ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি সংবিধান, আইন ও রাষ্ট্রের স্বার্থের সীমার মধ্যেই তার দায়িত্ব পালন করেছেন কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সুযোগ থাকবে না। শেষ পর্যন্ত কোনো রাজনীতিবিদ, কর্মকর্তা বা সাংবিধানিক পদধারীর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হওয়া উচিত নয় তার রাজনৈতিক ক্ষমতা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা প্রভাব। সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হওয়া উচিত তার নিজের কাজের একটি স্বচ্ছ রেকর্ড–যে রেকর্ড প্রমাণ করে, ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি সংবিধান, আইন ও রাষ্ট্রের স্বার্থের সীমার মধ্যেই তার দায়িত্ব পালন করেছেন। আমার কাছে বাংলাদেশের জন্য সেটিই হতে পারে সবচেয়ে সুন্দর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার।
লেখক: অ্যাডভোকেট (অব.) সলিসিটর, সিনিয়র কোর্টস অব ইংল্যান্ড; সাবেক মেয়র, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল, যুক্তরাজ্য
আরও পড়ুন
কর-জিডিপি অনুপাত কেন এত প্রাসঙ্গিক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ
-->ভ্যাটপণ্য বা সেবা গ্রহণকারীর কাছ থেকে কাটা করের টাকা, কিন্তু সেটি রাষ্ট্র পাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে কর ব্যবস্থাপনাকে জবাবদিহিমূলক করা যাচ্ছে না না। আওতা-সংক্রান্ত ওপরে উল্লিখিত জটিলতা বা সীমাবদ্ধতার কাদায় কর আয়ের বিপুল সম্ভাবনা এখনো আটয়ে যাচ্ছে, অপারগতার অবয়বে লাপাত্তা হচ্ছে। জবাবদিহিহীন অবয়ব অবকাঠামোকে স্বশাসিত, স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটেড) ও স্বপ্রণোদিত করা যাচ্ছে না। কর-জিডিপি অনুপাত কম হওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি অন্যতম কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।...

বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত সমপর্যায়ের অনেক দেশের তুলনায় বেশ কম। এটি কম কেন তা নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনা হয়। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিষয়টি দেখা হলে জাতীয় অর্থনীতি কৌশলে এর প্রাসঙ্গিকতা স্পষ্ট হতে পারে। এতদিন এই ভাবনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে যা বুঝেছি তা হলো–তিন কারণে আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত অনেক কম। এক. আওতার সীমাবদ্ধতা, পরিধিগত ঘাটতি। সব যোগ্য করদাতা ও খাতকে করজালের মধ্যে আনতে বা আসতে পারার দীর্ঘসূত্রতা বা ক্ষেত্রবিশেষে অপারগতা, অক্ষমতা; দুই. ব্যাপক কর ছাড়, কর রেয়াত, কর ফাঁকি, মামলায় আটকানো, কর কমকর্মকর্তার স্বেচ্ছা ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, কর্তন কিংবা আদায়কৃত কর রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা না হওয়া; তিন. রাজস্ব বিভাগের দক্ষ লোকবলের অভাব, অদক্ষতা, অপারগতা, মনিটরিংয়ের দুর্বলতা, কর আইন ও আহরণ ও প্রদান পদ্ধতির জটিলতা, মনোভঙ্গি পরিবর্তনের আবশ্যকতা।
করের আওতা সীমিত, জুরিসডিকশন আসলে বাঞ্ছনীয়ভাবে বাড়ছে না। অর্থাৎ সক্ষম সব করদাতা এবং প্রযোজ্য সব খাত করজালের আওতায় আসেনি। ফলে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়েনি। যেকোনো দেশে জিডিপির অন্তত ১৫-১৬ শতাংশ কর হিসেবে আহরিত হয়। কিন্তু আমাদের কর জিডিপির অনুপাত ৭-৮ শতাংশের মধ্যে দীর্ঘদিন ঘোরাফেরা করছে। এর মানে এখনো জিডিপির হিস্যা অনুযায়ী অর্জিতব্য কর অনাহরিত থেকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ৭-৮ শতাংশের একটা ঘাটতি রয়েই যাচ্ছে। আমাদের জিডিপিতে কৃষির অবদান এখনো বেশি। কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এ প্রবৃদ্ধিতে সার্বিকভাবে কৃষির অবদানই বেশি। গত ১০-১২ বছরে ঘূর্ণিঝড় বা বন্যায় ফসলহানি খুব একটা ঘটেনি। সিডর বা আইলার পর বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটেনি। ফলে জিডিপিতে কৃষি খাত অব্যাহতভাবে ঊর্ধ্বমুখী অবদান রেখে যাচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কৃষি খাতের অধিকাংশ আয় করের আওতার বাইরে। কৃষির পরে জিডিপিতে অবদান শিল্পের। শিল্প থেকে কর আসছে বা আসবে, তা আহরণের আওতায় আনার প্রয়াস ও পদ্ধতি আছে। জিডিপিতে বড় অবদান সত্ত্বেও কৃষি খাত করের বাইরে থাকায় কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ে না। কৃষি করের বাইরে কেন? আমরা মনে করেছি, আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান। এটি করের বাইরে যদি রাখা হয়, তাহলে তা উন্নতি করবে। এটিও সত্য, ক্ষুদ্র কৃষককে করের আওতায় আনা বা না আনায় তেমন কিছু আসে যায় না। কর রাজস্বে তার অবদান বা দেয় খুব একটা নেই। কিন্তু সেই সুবাদে কৃষির নাম করে, কৃষির উপায়-উপকরণ জাত অনেক আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড বা শিল্প করের বাইরে রয়ে গেছে। গ্রামের কৃষককে প্রায় ৫ লাখ পর্যন্ত করমুক্ত করা হয়েছে, তা ঠিক আছে। কিন্তু কৃষকের কৃষি খাতের কিছু কিছু সাব-সেক্টরে ব্যাপক আয় আছে, যেমন–মৎস্য চাষ, সার উৎপাদন, সেচ প্রভৃতি। যেগুলো কৃষি খাতের, কিন্তু অর্থকরী শিল্প, বিরাট অঙ্ক, বিরাট অর্থনীতি। ঘোরানো-প্যাঁচানো ব্যাখ্যার বদৌলতে কোনো কোনো কর্মকাণ্ড করের বাইরে রেখে, ক্ষেত্রবিশেষে কর রেয়াত দিয়ে, ভর্তুকি দিয়ে সুরক্ষার নামে কর রাজস্ব আয়কে সীমিত করা হচ্ছে। কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে যেসব শিল্প গড়ে উঠছে, সেগুলোও কৃষির নাম করে বরং করের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। মৎস্য চাষ, পানি সেচের যন্ত্র থেকে শুরু করে অনেক কিছুকে বলা হয় কৃষি খাতের। কর জালের আওতায় আনার ক্ষেত্রে কৃষি খাতে যেসব ছাড় বা সীমাবদ্ধতা আছে, সেটি ঠিক করে আনতে পারলে যারা কর দেওয়া এড়িয়ে যায় কিংবা ফাঁকি দিচ্ছে সেটি ঠিক করা যাবে।
আওতার ব্যাপারে আরেকটি কথা হলো, আমাদের অর্থনীতি হঠাৎ করে বড় হচ্ছে। এটি ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করেনি। নব্বইয়ের দশক থেকে অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে। আর বড় হচ্ছে যেসব খাত তা হলো তৈরি পোশাক, আবাসন, নির্মাণশিল্প, সেবা, বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ, আর্থিক খাত, টেলিকম, ওষুধ প্রভৃতি। আরও কিছু খাত উঠতি। এসব খাতে অনেক মুনাফা হচ্ছে, মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। অথচ এদের অনেকে করের আওতায় আসছে না। কর অবকাশের তালিকা দীর্ঘতর হচ্ছে, শিল্প উৎপাদনক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় আসতে কর অবকাশের সুযোগ ব্যবহার ইতিবাচক প্রবণতায় আসতে বিলম্ব হচ্ছে। রপ্তানিমুখী শিল্পের নাম করে পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা এখনো নানা ধাচের কর রেয়াত সুবিধা নিচ্ছেন এবং যথেষ্ট কম কর দিচ্ছেন। শুল্ক ও কর রেয়াতের মাধ্যমে উল্টো প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। রিহ্যাবের কাছ থেকে বাড়ি বিক্রি বাবদ তেমন করই সরকার পায় না। তারা কত লাভ করছে, সেটাও স্পষ্ট হচ্ছে না। শহরের বাড়িগুলো জরিপ করার উদ্যোগ বারবার নেওয়া হয়। প্রত্যেক বাড়িওয়ালাকে করের আওতায় আনার কাজ শেষ হয়েও এখনো শেষ হয়নি এবং অনেককেই করের আওতায় আনা হয়নি। যেখানে যেখানে অর্থনীতি দৃশ্যমান হচ্ছে বা বড় হচ্ছে, সেগুলো আসলে করের আওতায় আনার ব্যাপারে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার দুর্বলতা বা অপারগতার সুযোগে রাজস্ব আয় অর্জিত হচ্ছে না। আওতার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিকে একটি বিষয়ে অবশ্য অনেক উন্নতি হয়েছে, চাকরিজীবীদের সবাই করের আওতায় এসেছেন। আগে অনেকেই কর দিতেন না। দিতে চাইলেও তাগিদে ঘাটতি বা কমতি ছিল। আওতার আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো, যাদের আয় বেশি এমন বড় বড় প্রফেশনের লোকজন ‘ন্যায্য দেয়’ করের আওতায় নেই। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উকিলসহ পেশাজীবী গোষ্ঠীর এখনো অনেকেই কর দেন না, আবার যারা দেন, সঠিক বা ন্যায্য পরিমাণে দেন না। এখানে করদাতা এবং কর আহরণকারী উভয় পক্ষের দায়দায়িত্ব যথাযথভাবে পরিপালিত হচ্ছে না।
একই কথা প্রযোজ্য ভ্যাটের ক্ষেত্রেও। পণ্য কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতা সবাই ভ্যাট দিচ্ছে। সার্ভিস নেওয়ার সময় ভ্যাট দিচ্ছে। তবে যারা ভ্যাট নিচ্ছে তারা তা রাষ্ট্রকে দিচ্ছে না। জনগণ কর বা ভ্যাট দিচ্ছে, অথচ সেই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যাচ্ছে না। যার জন্য নতুন ভ্যাট আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, কীভাবে ভ্যাটের আওতা বাড়ানো এবং সরকারি কোষাগারে জমা নেওয়া নিশ্চিত করা যায়। ২০১২ সালে জারি হওয়া ভ্যাট আইনটি ২০১৯-এর আগে প্রবর্তন বা প্রয়োগ করা যায়নি। মাঝখানে সাত বছর পার হয়। এরই মধ্যে অনেক কিছু বদলে গেছে। সেই সাত বছরে মানুষ পুরোনো হারে বা পদ্ধতিতে ভ্যাট দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নতুন আইন প্রবর্তিত না হওয়ায় বাড়তি রাজস্ব ঠিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। মানুষ ভ্যাট দিয়ে যাচ্ছে। নতুন আইন পিছিয়ে দিয়ে পুরোনো ব্যবস্থাই রেখে দেওয়া হয়েছে এবং সেটিই চলছে। আরও একটি সম্পূরক বিষয় বিবেচনার রয়েছে, ২০১৭ সালে বেশ ঘটা করে বলা হয়েছিল নতুন ভ্যাট আইন প্রবর্তন হবে। সবকিছু ঠিক। এনবিআর প্রাক্কলন করে দেখাল, এটি প্রবর্তন হলে অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট বাবদ আয় হবে। শেষ মুহূর্তে যখন প্রবর্তন করা গেল না, তখন ২০ হাজার কোটি টাকা আহরণের সুযোগ বা উপায়ের কী হলো। এই বাড়তি আয় হবে ধরে নিয়ে কিন্তু ব্যয়ের বাজেট করা হয়েছিল। ওই পরিমাণ ব্যয়ের বাজেট কিন্তু কাটছাঁট করা হয়নি। ২০ হাজার কোটি টাকা যেহেতু আহরিত হওয়ার কথা ছিল, নতুন ভ্যাট আইন প্রবর্তিত না হওয়ায় তা তুলতে পারেনি এনবিআর। ওই পরিমাণ সম্ভাব্য রাজম্ব তাহলে ব্যবসায়ীদের কাছে কিংবা ভ্যাটদাতা পর্যায়ে অনাদায়ী রয়ে গেছে। পর পর দুই বছর হিসাব করলে অন্তত ৪০ হাজার কোটি টাকা। এই রাজস্ব কোথায়?
ভ্যাটপণ্য বা সেবা গ্রহণকারীর কাছ থেকে কাটা করের টাকা, কিন্তু সেটি রাষ্ট্র পাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে কর ব্যবস্থাপনাকে জবাবদিহিমূলক করা যাচ্ছে না না। আওতা-সংক্রান্ত ওপরে উল্লিখিত জটিলতা বা সীমাবদ্ধতার কাদায় কর আয়ের বিপুল সম্ভাবনা এখনো আটয়ে যাচ্ছে, অপারগতার অবয়বে লাপাত্তা হচ্ছে। জবাবদিহিহীন অবয়ব অবকাঠামোকে স্বশাসিত, স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটেড) ও স্বপ্রণোদিত করা যাচ্ছে না। কর-জিডিপি অনুপাত কম হওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি অন্যতম কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।
লেখক: রাজস্ব চিন্তক
আরও পড়ুন
শিল্প ও অর্থনীতির গতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৯ পিএম
ড. সুলতান মাহমুদ রানা
-->উদ্যোক্তা তখনই ঝুঁকি নেবেন, যখন বিদ্যুৎ পাবেন, ঋণ ও কাঁচামাল জোগাড় করতে পারবেন এবং নিয়মের ধারাবাহিকতা নিয়ে নিশ্চিত হবেন। মানুষ তখনই আস্থা রাখবে, যখন বাজারদর, চাকরি ও দৈনন্দিন জীবনে উন্নতি টের পাবে। আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তখনই অর্থনীতির সম্পদ হবে, যখন তা ন্যায়সঙ্গত নিয়ম, সংলাপ এবং বিশ্বাসযোগ্য নীতির ভিত তৈরি করবে।...
বাংলাদেশের শিল্প খাতের সাম্প্রতিক সংকেতগুলোকে আলাদা কিছু পরিসংখ্যান বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। গত ১০ অক্টোবর একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ‘শিল্প খাতে পতন, গতিহারা অর্থনীতি’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি সাময়িক হিসাবে ২.৮৬ শতাংশে নেমেছে; ২০২২-২৩ অর্থবছরে যা ছিল ৮.১৮ শতাংশ। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে সামগ্রিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সূচক (PMI) নেমেছে ৪৮.৬-এ, আর উৎপাদন খাতের সূচক ৪৪.৮। ৫০-এর নিচে PMI সংকোচনের ইঙ্গিত দেয়। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি জুনে ৪.৪৭ শতাংশে নেমেছে। প্রতিবেদনটির ভাষ্যে, ১৯৯৩ সালের পর এটা সর্বনিম্ন। মূলধনী যন্ত্রপাতি ও ভারী সরঞ্জাম আমদানিও কমেছে। এগুলো একসঙ্গে বলছে, ব্যবসা শুধু ধীর হয়নি; ভবিষ্যৎ উৎপাদনের জন্য দরকারি বিনিয়োগও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এমন সমস্যার পেছনে রয়েছে একাধিক চাপ–এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। উচ্চমূল্যস্ফীতি ও সুদ, বিদ্যুৎ-গ্যাসের অনিশ্চয়তা, ব্যাংকঋণ পেতে জটিলতা, দুর্বল ব্যাংকব্যবস্থা এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের অনিশ্চয়তা। বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবরের বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদে ঋণ২৬ ও ঋণ২৭–দুই বছরেই ৩.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, বিনিয়োগ নরম হয়েছে, রপ্তানির গতি কমেছে, মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও ব্যবসার খরচে চাপ দিচ্ছে; আর ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগকারীর আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ অবস্থায় প্রথম কাজ হওয়া উচিত উৎপাদন চালু রাখার বাধাগুলো সরানো। কারখানায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ কতটা নির্ভরযোগ্য, তা ব্যবসায়ীরা আগে থেকে জানতে চান। জ্বালানি সরবরাহের বাস্তবসম্মত সূচি প্রকাশ, শিল্পাঞ্চলে অগ্রাধিকারভিত্তিক নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং সরবরাহে বিঘ্ন হলে দ্রুত প্রতিকার–এসব ব্যবস্থা উৎপাদন পরিকল্পনাকে সহজ করতে পারে। একই সঙ্গে বন্দরে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি খালাস, কর-শুল্ক পরিশোধ, লাইসেন্স ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করা দরকার। নতুন ঋণ ঘোষণার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান কারখানার উৎপাদন সচল করা, কার্যকর ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের চলতি মূলধন জোগানো এবং রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নে অর্থায়ন নিশ্চিত করা বেশি জরুরি।
তবে ঋণ সহজ করতে গিয়ে দুর্বল ব্যাংকে জবাবদিহিহীন তারল্য ঢালা সমাধান নয়। খেলাপি ঋণের প্রকৃত হিসাব, ব্যাংকের সম্পদের মান যাচাই, দায়ী ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে আইনসম্মত পুনর্গঠনের রূপরেখা প্রকাশ করতে হবে। আমানতকারী ও সৎ উদ্যোক্তার স্বার্থ রক্ষা করে ব্যাংক খাতের ক্ষতি কে, কীভাবে এবং কত সময়ে সামলাবে–সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। আইএমএফও দুর্বল ব্যাংকে শর্তহীন তারল্য না দিয়ে সম্পদের মান যাচাই, তদারকি এবং স্বচ্ছ পুনর্গঠনের কথা বলেছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে একটি বিষয় সবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, তা হলো এমন অবস্থা উত্তরণ এবং সে বিষয়ে জনগণের আস্থা ফেরানো যাবে কি না? এর উত্তরে প্রথমেই বলা যায়, কোনো আশ্বাস দিয়ে আস্থা ফেরানোর সুযোগ যেমন নেই, তেমনি সমাধানও সম্ভব হবে না। মূলত ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক ফলাফলের মধ্যদিয়ে সমাধানটি করা যেতে পারে। মূল্যস্ফীতি কমানোর বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কার্যকর নজরদারি, লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থানের বাস্তব অগ্রগতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানোর কেন্দ্রে থাকা উচিত। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নামে এমনভাবে ঋণ সংকুচিত করা হলে যাতে উৎপাদন ও চাকরিও থমকে যায়, তাতে স্থিতিশীলতা আসবে না। আবার মূল্যস্ফীতির চাপ উপেক্ষা করে নির্বিচারে ঋণ বা সরকারি ব্যয় বাড়ালেও আস্থা ফিরবে না। নীতির ভারসাম্য, পরিষ্কার ব্যাখ্যা এবং নিয়মিত তথ্য প্রকাশ–এই তিনটি একসঙ্গে দরকার।
তবে এখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নটি অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে শুধু রাস্তায় সংঘাত না থাকলেও সেটা বোঝানো যায় না। এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা যেন বুঝতে পারেন, আগামী মাসে করনীতি, আমদানি নিয়ম, বৈদেশিক মুদ্রাব্যবস্থাপনা বা অনুমোদনের শর্ত হঠাৎ বদলে যাবে না। শ্রমিক যেন মজুরি ও নিরাপত্তা নিয়ে ন্যায্যভাবে কথা বলতে পারেন; ব্যবসায়ী যেন আইনের আশ্রয় পান; আর সরকার যেন বিরোধী মত, ব্যবসায়ী সংগঠন, শ্রমিক প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নীতি নিয়ে সংলাপ করে। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও আইনের পূর্বানুমেয় প্রয়োগ রাজনৈতিক আস্থারই অংশ। নতুন প্রকল্প বা প্রণোদনার চেয়ে অনেক সময় এই নিশ্চয়তাই বিনিয়োগের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু রাষ্ট্রের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৯৭-৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটে গভীর মন্দায় পড়েছিল। ১৯৯৮ সালে দেশটির অর্থনীতি প্রায় ৬ শতাংশ সংকুচিত হয়। এরপর ১৯৯৯ সালে প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি হয়েছিল। আইএমএফের বিশ্লেষণে পুনরুদ্ধারের পেছনে ছিল ব্যাংক ও করপোরেট খাতের পুনর্গঠন, আর্থিক বাজারে আস্থা ফেরানো, রপ্তানির জোরালো প্রত্যাবর্তন এবং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ। সরকার, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকপক্ষের ত্রিপক্ষীয় সমঝোতাও সামাজিক ঐকমত্য তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল।
কোরিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য একটি শিক্ষা, কোনো সহজ ফর্মুলা নয়। কোরিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, রপ্তানি কাঠামো ও সংকটের ধরন বাংলাদেশের থেকে আলাদা ছিল। তবু মিলটি গুরুত্বপূর্ণ। আস্থা ফেরাতে শুধু ঋণ বা প্রণোদনা যথেষ্ট হয় না; আর্থিক খাতের বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার, নীতির ধারাবাহিকতা এবং সরকার-শ্রমিক-ব্যবসায়ীর মধ্যে সমঝোতা দরকার। দ্রুত সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রত্যাবর্তনও মানুষের জীবনে সংকটের ক্ষতি সঙ্গে সঙ্গে মুছে দেয় না। তাই সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থানকে পুনরুদ্ধারের অংশ করতে হয়।
বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর পথ তাই কয়েকটি পরস্পর-সম্পর্কিত পদক্ষেপে গড়তে হবে। উৎপাদনমুখী জ্বালানি সরবরাহ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যাংক সংস্কার, মূল্যস্ফীতি কমানোর বিশ্বাসযোগ্য নীতি, ব্যবসার প্রশাসনিক বাধা কমানো, কার্যকর ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন এবং রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য। এগুলোর সঙ্গে চাই রাজনৈতিক সংলাপ ও নীতির পূর্বানুমেয়তা। সরকার অগ্রগতি মাপতে পারে বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও ঋণপ্রবাহের কয়েকটি প্রকাশ্য সূচক ধরে এবং নিয়মিত জানাতে পারে কোন প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে, কোনটি হয়নি এবং কেন।
এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সেই পরিস্থিতি কোনো একক উদ্যোগে কিংবা ঘোষণায় ঘটবে না। উদ্যোক্তা তখনই ঝুঁকি নেবেন, যখন বিদ্যুৎ পাবেন, ঋণ ও কাঁচামাল জোগাড় করতে পারবেন এবং নিয়মের ধারাবাহিকতা নিয়ে নিশ্চিত হবেন। মানুষ তখনই আস্থা রাখবে, যখন বাজারদর, চাকরি ও দৈনন্দিন জীবনে উন্নতি টের পাবে। আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তখনই অর্থনীতির সম্পদ হবে, যখন তা ন্যায়সঙ্গত নিয়ম, সংলাপ এবং বিশ্বাসযোগ্য নীতির ভিত তৈরি করবে।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
sultanmahmud.rana@gmail.com
আরও পড়ুন
জনগণের কাছে নির্বাচিত সরকারের দায়
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২৬ পিএম
আনু মুহাম্মদ
-->আমরা প্রায়ই শুনি যে, একা সরকারের পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। সরকার একা সবকিছু করবে, এটা মানুষ প্রত্যাশাও করে না। মানুষ যেটা প্রত্যাশা করে কিংবা দাবি করে সেটা হলো–সরকার অন্তত উল্টো পথে হাঁটবে না। সরকার তার যে দায়িত্ব সেই দায়িত্ব পালন করবে। সরকার যদি দায়িত্ব পালন করে তবে জনগণ সেখানে তার যে সহযোগিতা, সে সহযোগিতা অবশ্যই রাখবে। আরেকটা কথা আমরা প্রায়ই শুনি–সেটা হলো রাতারাতি কিছু পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। আসলে জনগণ রাতারাতি পরিবর্তন প্রত্যাশাও করে না। জনগণের প্রত্যাশা হলো শুরুটা করবে সরকার, লক্ষণটা দেখা যাবে এবং কিছু উদ্যোগ যে সরকার নিচ্ছে, সেটা জনগণ বুঝতে পারবে।...

বর্তমানে নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে। সরকার ইতোমধ্যে সাত মাস শাসনকাল পার করেছে। নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই একটু বেশি। যদিও এ দেশের সরকার আর বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রত্যাশা রেখে লাভ হয় না। তার পরও কিছু প্রত্যাশা ছিল। যেমন প্রত্যাশা ছিল–সমাজে একটা শৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা আসবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ ও বদলির মধ্যে একটা নিয়মনীতি তৈরি হবে। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে একটা স্বচ্ছতা আসবে। পুরোনো যে স্বেচ্ছাচারিতা কিংবা মেগা দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি হবে না। কর্মসংস্থান বাড়বে, জিনিসপত্রের দাম কমবে ইত্যাদি। এগুলোর ব্যাপারে একটা উদ্যোগ দেখা যাবে বা সুচিন্তিত পরিকল্পনা দেখা যাবে। নদীনালা, খালবিল, বন দখল করে পরিবেশ নষ্ট করা বন্ধ হবে।
অর্থাৎ সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করেছিল নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সমাজে ন্যূনতম একটা গণতান্ত্রিক পরিবর্তন হবে। বাস্তবে গত সাত মাসে সেসবের কোনো পরিবর্তন আমরা দেখিনি। অতীতের স্বৈরতন্ত্রী বা অনির্বাচিত সরকার এবং বর্তমান সরকারের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। আমরা প্রায়ই শুনি যে, একা সরকারের পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। সরকার একা সবকিছু করবে, এটা মানুষ প্রত্যাশাও করে না। মানুষ যেটা প্রত্যাশা করে কিংবা দাবি করে সেটা হলো–সরকার অন্তত উল্টো পথে হাঁটবে না। সরকার তার যে দায়িত্ব সেই দায়িত্ব পালন করবে। সরকার যদি দায়িত্ব পালন করে তবে জনগণ সেখানে তার যে সহযোগিতা, সে সহযোগিতা অবশ্যই রাখবে। আরেকটা কথা আমরা প্রায়ই শুনি–সেটা হলো রাতারাতি কিছু পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। আসলে জনগণ রাতারাতি পরিবর্তন প্রত্যাশাও করে না। জনগণের প্রত্যাশা হলো শুরুটা করবে সরকার, লক্ষণটা দেখা যাবে এবং কিছু উদ্যোগ যে সরকার নিচ্ছে, সেটা জনগণ বুঝতে পারবে। রাতারাতি সবকিছু পাল্টানোর কথা জনগণ কখনোই বলে না।
সম্প্রতি শিশু ধর্ষণ একটা ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। যে মাদ্রাসায় শিশুরা সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা, সেখানেই তারা ভয়ংকর পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে। মাদ্রাসার শিক্ষক দ্বারা শিশুরা ধর্ষণ ও বলাৎকারের শিকার হচ্ছে। এমনকি ধর্ষণ-পরবর্তী খুনের মতো ঘটনাও ঘটছে এবং সেগুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। মাদ্রাসার বাইরেও ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা বাড়ছে। এগুলো থামানোর কোনো চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে না। উল্টো দেখছি সমাজে নিষ্ঠুরতার আরও বিস্তার ঘটছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ওয়াজ-মাহফিলের সংখ্যা বাড়লেও এসব বিষয়ে ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে জোরালো কোনো বক্তব্য বা প্রতিবাদ দেখতে পাই না। পাশাপাশি রাস্তাঘাট, দোকানপাট ও বাসাবাড়িতে ছিনতাই, ডাকাতি বেড়েছে। এসব অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ, যা জনমনে হতাশা তৈরি করছে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান গড়েই উঠেছিল শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থান ইস্যু কেন্দ্র করে। কিন্তু দায়িত্ব নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যাপারে কোনো গুরুত্বই দেয়নি। বরং ওই সময়ে কর্মসংস্থান আরও সংকুচিত হয়েছে। অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়েছে। ফলে নতুন করে লক্ষাধিক মানুষ বেকার হয়েছে। নির্বাচিত সরকারও এ বিষয়ে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না। কারখানাগুলো আবার চালু এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা দরকার। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এখনো অনেক পদ খালি। স্কুল, কলেজ, হাসপাতালসহ সব জায়গায় জনবলের ঘাটতি রয়েছে। এসব পদ পূরণ করা জরুরি। জনগণের সেবাদানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ার ফলে ইনফরমাল সেক্টর, অর্থাৎ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ভিড় বাড়ছে। এমনিতেই বাংলাদেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান প্রায় ৮৫ শতাংশ। প্রাতিষ্ঠানিক খাত যেগুলো আছে সেগুলোতে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে মানুষের ভিড় বেড়েছে। ফলে ফুটপাতে দোকান খুলে বসা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে প্যাডেলচালিত ও অটোরিকশার সংখ্যাধিক্য। বাড়ছে ভ্রাম্যমাণ হকার, মাছ-মাংসসহ সবজি বিক্রেতার সংখ্যা। এসবই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর টিকে থাকার যুদ্ধ।
এই যে অর্ধকোটি শিক্ষিত তরুণ বেকার, তারা কোথায় যাবে? তাদের ভবিষ্যৎ কী? পরিবারের চাপ, নিজের ভবিষ্যৎ চিন্তা তাদের কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। এর বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে সমাজে–কেউ অটোরিকশা চালাচ্ছে, কেউ হকার হিসেবে বসে পড়ছে ফুটপাতে, তাদের সর্বক্ষণই নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকতে হয়। কেউ কেউ অজানা পথে বিদেশে পাড়ি দিতে গিয়ে দালালের খপ্পড়ে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে। অনেককে আবার বেঘোরে প্রাণ দিতে হচ্ছে।
বিভিন্ন দেশে আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতিনিয়ত নানারকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে দূতাবাসগুলোরই ভূমিকা নেওয়ার কথা। কিন্তু তাদের মোটেই এসব কাজে মনোযোগী দেখা যায় না। মনে রাখতে হবে আমাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। অন্যান্য দেশের সরকার, যেমন–ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন তারা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখে। শ্রমিকদের মর্যাদা, ও কর্মস্থলের নিরাপত্তায় কোনো আপস করে না। এসব ব্যাপারে আমাদের সরকার ও দূতাবাসগুলোর যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। প্রবাসী শ্রমিকদের ব্যাপারে সরকারকে যথেষ্ট মনোযোগ দিতে হবে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের প্রবাসীরা সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় থাকে। মালিকপক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা, জোরপূর্বক বিনা বেতনে কাজে বাধ্য করা, লঘু অপরাধে চাকরি হারানো, জেল-জরিমানা, এমনকি মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতে হয়।
সম্প্রতি সৌদি সরকার দুজন প্রবাসী বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। জানা গেছে, প্রবাসী এই তরুণ-তরুণীদের বিচারের ক্ষেত্রে সৌদি সরকার অপরাধীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়নি। এমন অভিযোগও উঠেছে যে, সৌদিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও বাংলাদেশ সরকারকেও তারা সময়মতো অবহিত করেনি। এ ব্যাপারে সৌদিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের গাফিলতি নিয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশি অনেক নারী শ্রমিক সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। নারী শ্রমিকদের যৌন নিপীড়নের অসংখ্য অভিযোগ আছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রায়ই সেই সব নারী শ্রমিকের দুর্দশার কথা জানতে পারি। সেখানে অনেকেই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। বহু নারী শ্রমিককে মাসের পর মাস গৃহবন্দি করে রাখা হয়, বিনা বেতনে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। অনেকে ধর্ষণের শিকার হন। এমনও দেখা গেছে, সৌদি প্রবাসী নারী সেখানে মালিক ও সহযোগীদের ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দেশে ফিরেছেন। দেশে ফিরে তারা দ্বিতীয় দফা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হন। কারণ, পরিবার তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। সৌদি আরবে শত শত প্রবাসী নারী শ্রমিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। অথচ তাদের পাঠানো প্রবাসী আয়ে আমাদের অর্থনীতির চাকা ঘোরে। তাহলে প্রবাসীরা এসব অন্যায়ের প্রতিকারের জন্য কার কাছে দাবি জানাবে–যেখানে সরকার সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করে উট পাখির মতো বালিতে মুখ গুজে থাকে?
আমরা অবশ্যই চাইব, নির্বাচিত সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। সবার আগে জনগণের স্বার্থ দেখবে। দেশে হোক, বিদেশে হোক নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। সেই দায়িত্ব সরকার যথাযথভাবে পালন করবে, সরকারের কাছে এটাই জনগণের দাবি।
লেখক: অর্থনীতিবিদ এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক
আরও পড়ুন
প্রবারণা পূর্ণিমা: শান্তি ও বিশ্ব প্রেক্ষাপট
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৫ পিএম
ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয়
-->প্রবারণা পূর্ণিমা কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি মানবজাতির কল্যাণ, শান্তি ও সৌহার্দ্যের এক মহান উৎসব। বর্তমান বিশ্বের অস্থিরতা, সহিংসতা ও বিভেদের বিপরীতে প্রবারণার ক্ষমা, অহিংসা ও করুণার বাণী অত্যন্ত জরুরি। আকাশে ওড়ানো ফানুসের মতো মানুষের অন্তর থেকেও যদি হিংসা ও অহংকারের অন্ধকার দূর হয়ে বিশ্বময় প্রীতি ও সহমর্মিতার আলো ছড়ায়, তবেই প্রবারণার আসল উদ্দেশ্য সার্থক হবে।...

‘প্রবারণা’ বৌদ্ধধর্মের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, পবিত্র ও ভাবগম্ভীর উৎসব। ‘প্রবারণা’ শব্দের সাধারণ অর্থ হলো–আশা পূরণ, বর পূরণ, বর প্রার্থনা বা কোনো বিশেষ ব্রত সমাপ্তি। আত্মশুদ্ধি, সত্য প্রকাশ এবং ক্ষমা প্রার্থনার এক অনন্য শিক্ষা বহন করে এই উৎসব। বর্ষাবাস বা তিন মাসের কঠিন ধর্মীয় সাধনা ও উপাসনা শেষে আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে বিশ্বজুড়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায় প্রবারণা পূর্ণিমা পালন করে থাকে। বৈশ্বিক মহামারি, যুদ্ধবিগ্রহ ও মানসিক অস্থিতিশীলতার এই বর্তমান যুগে প্রবারণা পূর্ণিমার মূল বার্তা–অহিংসা, ক্ষমা ও বিশ্বশান্তি–অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রাসঙ্গিক।
প্রবারণা পূর্ণিমার ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় পটভূমি
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে প্রবারণা পূর্ণিমার গুরুত্ব অপরিসীম। গৌতম বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভের পর অনুসারী ভিক্ষুসংঘের জন্য আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে সাধনা করার বা ‘বর্ষাবাস’ ব্রতের নির্দেশ দেন। বর্ষাবাসের শেষ দিনটিই প্রবারণা পূর্ণিমা হিসেবে চিহ্নিত।
এই দিনে ভিক্ষুরা তাদের ত্রৈমাসিক সাধনার অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করেন এবং নিজেদের মধ্যে অজান্তে বা অনিচ্ছাকৃত কোনো ভুলভ্রান্তি হয়ে থাকলে তা মুক্ত মনে স্বীকার করেন। তারা পরস্পর ক্ষমা চেয়ে নেন এবং নতুন উদ্যমে মানবকল্যাণে ব্রতী হওয়ার সংকল্প গ্রহণ করেন। এই আত্মসমালোচনা ও ক্ষমার সংস্কৃতিই প্রবারণার মূল ধর্মীয় শিক্ষা।
প্রবারণা পূর্ণিমার মূল বাণী: ক্ষমা, আত্মশুদ্ধি ও অহিংসা প্রবারণা পূর্ণিমার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তিনটি মূল দর্শন–
আত্মশুদ্ধি (Self-purification): প্রবারণা মানে কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি নিজের ভেতরের অহংকার, হিংসা ও বিদ্বেষকে বিসর্জন দেওয়া।
ক্ষমা ও বিনয় (Forgiveness and Humility): বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এই দিনে সসংঘে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমার দেখা, শোনা বা সন্দেহের মধ্যে যদি কোনো ভুল হয়ে থাকলে, তবে আমাকে ক্ষমা করুন’। এই ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে পারস্পরিক মানসিক দূরত্ব মুছে যায়।
অহিংসা ও করুণা (Non-violence and Compassion): বুদ্ধের প্রধান বাণী ছিল ‘সর্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু’ (জগতের সব প্রাণী সুখী হোক)। প্রবারণা পূর্ণিমা মানবজাতিকে সব জীবের প্রতি করুণা ও অহিংসার বার্তা দেয়।
প্রবারণার বিশেষ আকর্ষণ: ফানুস ওড়ানো ও ‘আকাশপ্রদীপ’
প্রবারণা পূর্ণিমা অন্যতম দৃশ্যমান ও আকর্ষণীয় অঙ্গ হলো সন্ধ্যায় আকাশে রঙিন ‘ফানুস’ ওড়ানো। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, গৌতম বুদ্ধ গৃহ ত্যাগ করার পর অনোমা নদীর তীরে স্বহস্তে নিজ চুল কর্তন করে তা আকাশে নিক্ষেপ করেছিলেন। সেই চুল স্বর্গের প্রবারণা স্তম্ভে বা ‘চূড়ামণি চৈত্যে’ সংরক্ষিত আছে বলে মনে করা হয়।
বুদ্ধের সেই কেশ ধাতুকে পূজা ও শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যে এবং আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের কামনায় ফানুস ওড়ানো হয়। আকাশে উড্ডীয়মান এই আলোকশিখা যেন অন্ধকার কাটিয়ে বিশ্বময় শান্তি ও মৈত্রীর আলো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতীক।
বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে প্রবারণার গুরুত্ব
আজকের বিশ্ব যখন নানা ধরনের অস্থিরতা, বিভাজন, বর্ণবাদ ও যুদ্ধবিগ্রহের মুখোমুখি, তখন প্রবারণা পূর্ণিমার আবেদন নতুন মাত্রা পায়–
সংঘাত নিরসনে ক্ষমার চর্চা: আধুনিক বিশ্বে শান্তির লড়াই ও অহংবোধের কারণে ক্ষুদ্র বিরোধও বড় যুদ্ধে রূপ নেয়। প্রবারণার ‘নিজের ভুল স্বীকার ও ক্ষমা চাওয়া’র আদর্শ যদি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অনুসরণ করা হতো, তবে বহু যুদ্ধ ও সংঘাত এড়ানো সম্ভব হতো।
মানসিক শান্তি ও বিষণ্নতা মুক্তি: বস্তুগত উন্নতি সত্ত্বেও মানুষ আজ চরম মানসিক বিষণ্নতা ও একাকিত্বে ভুগছে। প্রবারণার আত্মশুদ্ধির শিক্ষা মানুষকে অন্তরের কলুষতা দূর করে মানসিক শান্তি অর্জনে সহায়তা করে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্ব: ফানুসের আলো যেমনি কোনো সীমানা মানে না, তেমনি বুদ্ধের অশুভ দূরীকরণ ও মৈত্রীর বার্তাও বর্ণ, ধর্ম বা জাতি নির্বিশেষে পুরো মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য।
প্রবারণা পূর্ণিমা কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি মানবজাতির কল্যাণ, শান্তি ও সৌহার্দ্যের এক মহান উৎসব। বর্তমান বিশ্বের অস্থিরতা, সহিংসতা ও বিভেদের বিপরীতে প্রবারণার ক্ষমা, অহিংসা ও করুণার বাণী অত্যন্ত জরুরি।
আকাশে ওড়ানো ফানুসের মতো মানুষের অন্তর থেকেও যদি হিংসা ও অহংকারের অন্ধকার দূর হয়ে বিশ্বময় প্রীতি ও সহমর্মিতার আলো ছড়ায়, তবেই প্রবারণার আসল উদ্দেশ্য সার্থক হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক; সম্পাদক, সৌগত
sougata95@gmail.com
