Published on
:
2 min read
পার্থ দাশগুপ্ত
‘আমি যখন কলা ভবনে মাস্টার ডিগ্রি করতে গেলাম, যোগেনদা তখন প্রিন্সিপাল ছিলেন। তার আগে থেকেই যোগেনদার কাজ দেখেছি। যোগেনদার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল বহুবার। কলা ভবনে গিয়ে যেটা আমার বিশেষ করে মনে হলো যে মাস্টারমশাই পরিচয়ের বাইরে একজন অন্য রকমের মানুষ ছিলেন উনি। যোগেনদার কাজের মধ্যেও কিন্তু সেটা থাকত।
ওঁর কাজের মধ্যে সব সময়ে একটা হিউম্যান কন্ডিশন থাকত। একজন মানুষের আচরণ যেমন হওয়া উচিত, সব থাকত। সেখানে রিরংসা থেকে শুরু করে সুখ-দুঃখ, সব কিছু দেখতে পাওয়া যেত। আমরা যাঁরা ছাত্রসম তাঁদের সঙ্গে ওঁর সম্পর্কটা ওঁর জীবনের থার্ড ফেজ়ের। আমি যোগেনদার যুবকবেলা, কিশোরবেলার কথা জানি না। কিন্তু ওঁর প্রৌঢ়ত্বের সময়ে ওঁকে দেখেছি। সেই সময়ে উনি জীবনের একটা জায়গায় পৌঁছে গিয়েছেন। কিন্তু আমি যখন ছাত্র হিসেবে ওঁর সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি, তখন এই প্রভেদটা উনি বুঝতে দেননি কখনও।
পরবর্তীকালে ভীষণ রকম ঘনিষ্ঠ হয়েছিলাম যখন ‘আর্টিস্ট’ বলে একটি পত্রিকা বেরতে শুরু করল। সম্পূর্ণ শিল্পের ম্যাগাজ়িন ছিল এটা। কলকাতা থেকেই পাবলিশ হতো। যোগেনদা ছিলেন তার চেয়ারম্যান। আর প্রথম সংখ্যা থেকে আমি এডিটোরিয়াল ডেস্কের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। এই পত্রিকার অনেকগুলো সংখ্যাও বেরিয়েছিল। তবে এই পত্রিকার ফান্ডিং মূলত করতেন যোগেনদা। বা ফান্ডিং জোগাড় করে আনতেন। পত্রিকাটা যোগেনদার গুণগান করার জন্য ছিল না। শিল্পের গুণগান করার জন্য ছিল। কতটা ঔদার্য থাকলে এই কাজটা একটা মানুষ করতে পারেন।
যোগেনদা একাধারে শিল্পী আবার অন্য দিকে শিল্প উদ্যোক্তা ছিলেন। শুধুমাত্র একটা এগজ়িবিশন অর্গানাইজ় করবেন, বিষয়টা এ রকম ছিল না। ওঁর এ রকম একটা শিল্প পত্রিকা বের করার যে উৎসাহ সেটা আমাদের কাছে শিক্ষণীয় ছিল। ‘আর্টিস্ট’-এর যে ক’টা সংখ্যা বেরিয়েছে প্রত্যেকটি অত্যন্ত মূল্যবান সংখ্যা। সেই জায়গা থেকেই অন্য এক যোগেনদাকে দেখেছি। ২০২১-এ কোভিড আবহ। আমি তো দুর্গাপুজোর কাজ করি। যোগেনদাও একবার বেহালা নতুন দলের দুর্গাপুজো করেছিলেন। সেই ২০২১-এ আমি যখন ঠাকুরপুকুর স্টেটব্যাঙ্ক পার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রয়েছি সেই সময়ে কোভিডের জন্য পুজোগুলো ছোট হয়ে গিয়েছিল। আমি সুরুলের একজন শোলা শিল্পীকে দিয়ে প্রতিমার সাজ-গয়না তৈরি করিয়েছিলাম। তার পর আমার মনে হয়েছিল চালচিত্রটা যদি যোগেনদাকে দিয়ে আঁকানো যায়। আমি যোগেনদাকে অনুরোধ করি। যোগেনদা বলেন উনি খুব ব্যস্ত রয়েছেন। আমি ওঁকে বলি, চালচিত্রর মাপ অনুযায়ী কাগজ মাউন্ট করে আপনার সাউথসিটির স্টুডিয়োয় রেখে আসব।
ইচ্ছে হলে, সময় পেলে করে দেবেন। অনুমতি দিলেন কাগজ রেখে যাওয়ার। আমার এখনও মনে আছে, সে বছর পঞ্চমীর একদিন আগে, ৭ অক্টোবর ২০২১, যোগেনদা ফোন করে বলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি। তোমার যদি পছন্দ হয়, একবার এসে দেখে যাও’। আমি দৌড়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম চালচিত্র যেমন হয় দশাবতার, দশমহাবিদ্যা তেমনই কিছু আঁকবেন। দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, পুরোটা ফোলিয়েজ এঁকেছিলেন। অনেক লতাপাতার সৌকর্য। ওটা নিয়ে সোজা দুর্গাপুজোর চালচিত্রে সেঁটে দিলাম। সেই ছবিটা আমার কাছে এখনও আছে। আমার ব্যক্তিগত মত, ওঁর ছবির মধ্যে একটা মেয়েলি ভাব ছিল। অনেকটা আলপনা দেওয়ার মতো। ওই চালচিত্রটার মধ্যেও ওরকম আলপনা দেওয়ার মতো একটা মেয়েলি ভাব ছিল।
খুব সহজ-সরল-লুসিড। এখন এই সব স্মৃতি নিয়েই থাকা। তবে আমার মানুষটাকে মনে থাকবে দুটো চরিত্রে। তাঁর শিল্পী চরিত্র আর তাঁর শিল্প উদ্যোক্তার চরিত্র। আমাদের এখানে আর্টিস্ট তৈরি হয়। কিন্তু আর্ট ম্যানেজমেন্টের লোক তৈরি হয় না। যোগেনদার মধ্যে দুটোই ছিল প্যারালালি। যোগেনদা কলা ভবনে ব্যাগে করে ন্যাশনাল স্কলারশিপের ফর্ম নিয়ে ঘুরতেন। অ্যাপ্লাই করার জন্য উৎসাহ দিতেন ছাত্রদের। উনি নিজের নাম লিখে রেফার করে দিতেন।
যোগেনদার ফোটোগ্রাফির প্রথম শো আমি করেছিলাম। হয়েছিল মায়া আর্ট স্পেস গ্যালারিতে। এটা ওঁর আর একটা ডাইমেনশন।’
অনুলিখন: দেবলীনা ঘোষ