অনলাইনে পণ্য কেনা, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা পাঠানো কিংবা ব্যাংক কার্ডে বিল পরিশোধ, সবই এখন হাতের মুঠোয়। প্রযুক্তির এই অগ্রগতির পরও কেনাকাটার সময় পণ্য হাতে পাওয়ার আগে টাকা দিতে চান না অনেক ক্রেতা। বিক্রেতার কাছে অর্থ পৌঁছাতেও সময় লাগে কয়েক দিন। অর্থাৎ, ডিজিটাল ব্যবস্থায় শুরু হলেও লেনদেনের শেষ ধাপে রয়ে গেছে নগদ টাকার নির্ভরতা। এই বাস্তবতায় ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ার পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে মানুষের আস্থা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
সরকারের ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ার পরিকল্পনা, বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলা কিউআর সম্প্রসারণ এবং ই-কমার্স খাতের বিকাশ, প্রত্যেকটি উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করছে এই আস্থা তৈরির ওপর। প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ প্রত্যেক নাগরিকের জন্য একটি ডিজিটাল আইডি ও ওয়ালেট চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তিনি জানান, ডিজিটাল লেনদেনের পাশাপাশি নাগরিকসেবা ও আর্থিক ব্যবস্থাকে সমন্বিত করার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরলতা, গোপনীয়তা, নিরাপত্তা, অন্তর্ভুক্তি ও আন্তঃসংযোগ, এই ৫টি নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি চালু করাই কেবল লক্ষ্য নয়, লক্ষ্য হলো এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করা, যার মাধ্যমে নাগরিকেরা সহজে ও নিরাপদে সরকারি-বেসরকারি সেবা পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বাংলা কিউআরের মাধ্যমে সহজ, নিরাপদ ও বিনা মাশুলে লেনদেন সম্প্রসারণে কাজ করছেন। তিনি বলেন, বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেন বাড়াতে গত ১ অক্টোবর থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এ ব্যবস্থায় লেনদেনের মাশুল শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ, নির্ধারিত ব্যবস্থায় ছোট বা বড় অঙ্কের লেনদেন বিনা মাশুলে করা যাবে। এতে সাধারণ ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্টে উৎসাহিত করার সুযোগ তৈরি হবে। গভর্নর আরও বলেন, আগামী নভেম্বর থেকে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে পিটুপি লেনদেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তখন বিভিন্ন পেশার মানুষ নিজস্ব কিউআর কোড ব্যবহার করে অর্থ গ্রহণ করতে পারবেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুনের প্রথম সপ্তাহে বাংলা কিউআরে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ৩৭ কোটি টাকা, যা সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে বেড়ে প্রায় ১৮০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। তবে এই ব্যবস্থাকে কার্যকর পর্যায়ে নিতে দৈনিক প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার লেনদেন প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামো দ্রুত বিস্তৃত হলেও দৈনন্দিন বাণিজ্যে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা এখনো ব্যাপক। বিশেষ করে ই-কমার্সে ক্যাশ অন ডেলিভারি বা পণ্য হাতে পাওয়ার পর মূল্য পরিশোধের প্রবণতা এর বড় উদাহরণ। তিনি বলেন, ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ বাড়লেই নগদনির্ভরতা কমবে না। এর জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য পেমেন্ট ব্যবস্থা, কার্যকর ভোক্তা সুরক্ষা, স্বচ্ছ নীতিকাঠামো এবং ব্যবসায়ীদের জবাবদিহি। বিশেষ করে ই-কমার্স খাতে ক্রেতার আস্থা অর্জন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল লেনদেনে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সাকিফ শামীম তার বিশ্লেষণে আরও দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামো দ্রুত বিস্তৃত হলেও দৈনন্দিন বাণিজ্যে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা এখনো ব্যাপক। বিশেষ করে ই-কমার্সে ক্যাশ অন ডেলিভারি বা পণ্য হাতে পাওয়ার পর মূল্য পরিশোধের প্রবণতা এর বড় উদাহরণ। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ই-কমার্সের বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা থাকলেও অগ্রিম অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে ক্রেতাদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি রয়েছে। অতীতে কয়েকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ব্যর্থতা ও পণ্য সরবরাহে অনিয়মের ঘটনা এই অনাস্থা ব্যাপক হারে বাড়িয়েছে। ফলে অনেক ক্রেতা পণ্য হাতে পাওয়ার আগে টাকা দিতে চান না। সাকিফ শামীমের মতে, ক্যাশ অন ডেলিভারি ক্রেতার কাছে নিরাপদ মনে হলেও পুরো সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় বাড়ায়। কুরিয়ারকর্মীর মাধ্যমে নগদ অর্থ সংগ্রহ, অর্থ নিষ্পত্তিতে বিলম্ব, পণ্য ফেরত আসা এবং নগদ অর্থ পরিবহনের ঝুঁকি বিক্রেতার পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এই চাপ বেশি, কারণ বিক্রির অর্থ হাতে পেতে দেরি হলে নতুন পণ্য কেনা ও ব্যবসা সম্প্রসারণ ব্যাহত হয়।
জানা গেছে, ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়তে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম উদ্যোগ বাংলা কিউআর। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলা কিউআর ব্যবহারের নির্দেশনা কার্যকর হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি কিউআর কোড ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক সেবার অ্যাপ থেকে অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
