আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য অর্জনে শুধু গাছ লাগালেই হবে না, রোপণ করা গাছের পরিচর্যা ও সংরক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। তিনি বলেন, গাছ নষ্ট হলে নতুন করে লাগাতে হবে। বৃক্ষরোপণকে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট-সংলগ্ন ডিসি পার্কে এক লক্ষতম গাছ রোপণের মধ্যদিয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সমাপ্তি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এর আগে সকালে চট্টগ্রাম নগরের জামিয়াতুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এক দিনে এক লাখ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধনী করেন তিনি।
উপদেষ্টা বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের লক্ষ্যকে প্রথমে উচ্চাভিলাষী মনে হলেও সম্মিলিত উদ্যোগ ও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে তা অর্জন সম্ভব। এ জন্য দেশের সব জেলা প্রশাসনকে চট্টগ্রামের উদ্যোগ অনুসরণের আহ্বান জানান তিনি।
ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, ‘আমরা সবাই এই গাছ রোপণ করেছি, এই গাছের পরিচর্যা করব এবং ভবিষ্যতে এটি একটি ধারাবাহিক প্রসেস, এটা চলতে থাকবে। এই গাছ শেষ হবে, নতুন করে আবার গাছ আসবে, এটাই প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াতেই আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাব।’
উন্নয়নকাজে গাছ কাটার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো কিছু সৃষ্টি করতে গেলে কখনো কখনো গাছ কাটতে হয়। তবে গাছ রক্ষা করে উন্নয়নকাজ করার চেষ্টা করতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছ লাগানো ও সংরক্ষণ দুটিই জরুরি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রয়োজনেই আমরা গাছ লাগাব, আমাদের প্রয়োজনেই আমরা পরিবেশটাকে রক্ষা করব। এটি হচ্ছে সবাই মিলে আমরা করব কাজ এবং সেই পরিবেশটা আমরা রক্ষা করব, ভারসাম্য রক্ষা করব—এটা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ।’
বন বিভাগের দায়িত্ব পালন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, সরকারের প্রত্যেকটি বিভাগকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। দায়িত্ব পালনে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে সেদিকে নজর দিতে হবে। বন উজাড় ও পাহাড় কাটার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য
অনুষ্ঠানে জনপ্রশাসন উপদেষ্টা বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে গত জুলাই পর্যন্ত ২ কোটি ৬৩ লাখ ৯৪ হাজার ৪২৬টি গাছ রোপণ করা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিচ্ছিন্ন উদ্যোগগুলো যথাযথভাবে হিসাবের আওতায় আনা গেলে এ অর্জনের পরিমাণ আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিশ্বাসী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছেন। প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কৃষকদের জন্য ফার্মার্স কার্ড, পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, বিদেশে কর্মসংস্থান, ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ ও ‘ওয়ান স্টুডেন্ট ওয়ান প্ল্যান্ট’ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
ইসমাইল জবিউল্লাহ আরও বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচিতে বৃক্ষরোপণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। দেশে বিদ্যমান সামাজিক বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে।
পাহাড়ধসের স্থায়ী সমাধানের তাগিদ
চট্টগ্রামের পরিবেশগত ঝুঁকির কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, পাহাড়, সমতল ও সমুদ্রবেষ্টিত হওয়ায় চট্টগ্রামের ভূপ্রকৃতি অনন্য। তবে পাহাড়ধসসহ বিভিন্ন পরিবেশগত ঝুঁকিও রয়েছে এ অঞ্চলে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘এখানকার যে ভূমিধস, পাহাড়ের ভূমিধস একটা বড় সমস্যা। চট্টগ্রামের জন্য এটা দুঃখ বলতে পারেন। একটু বৃষ্টি শুরু হলেই আমরা ঢাকায় বসে চিন্তা করি চট্টগ্রামে কয়টা ক্যাজুয়ালিটির খবর পাব।’
জানমাল রক্ষায় পাহাড়ধস ও ভূমিধসের স্থায়ী সমাধানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দুর্যোগ বা দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর।’
জলবায়ু তহবিলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান
জলবায়ু পরিবর্তনকে বিশ্বব্যাপী সংকট উল্লেখ করে জনপ্রশাসন উপদেষ্টা বলেন, এ সংকটের নেতিবাচক প্রভাবের বড় ভুক্তভোগী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। অথচ বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল থেকে বাংলাদেশ প্রত্যাশিত মাত্রায় উপকৃত হয়নি।
তিনি বিশ্বনেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জলবায়ু তহবিল বরাদ্দের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বাস্তব পরিস্থিতি ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের এরিয়া সদর দপ্তরের অ্যাডমিন কর্নেল খলিল উল্লাহ, সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন ও জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।
অনুষ্ঠানে বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, এনজিও কর্মকর্তা, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড, রেড ক্রিসেন্ট এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
সকালে জামিয়াতুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে নারিকেলগাছের চারা রোপণের মাধ্যমে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন উপদেষ্টা। পরে সন্ধ্যায় ডিসি পার্কে র্যালি শেষে এক লাখতম গাছ হিসেবে আরেকটি নারিকেলগাছের চারা রোপণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। এ উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের জন্য চট্টগ্রাম বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
