শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট (বিগ-বি) উদ্যোগকে সম্প্রসারণ করে অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন কৌশলগত সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তুলতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ও জাপান।
নতুন এ উদ্যোগের আওতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) অবকাঠামোকে সমন্বিত করা হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে শিল্পের মূল্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কৌশলগত প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের সরকারি জাপান সফরের দ্বিতীয় দিনে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।
বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, উদীয়মান অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগানো, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো এবং ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় বিগ-বি উদ্যোগের পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে দুই নেতা একমত হয়েছেন।
নতুন কাঠামোর আওতায় দুই প্রধানমন্ত্রী চারটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন। এগুলো হলো যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিধি প্রণয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব উৎসাহিত করা এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা সম্প্রসারণ।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ সহযোগিতায় শিল্পের বহুমুখীকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
মাতারবাড়ী হবে শিল্প ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র
বিগ-বি উদ্যোগের সম্প্রসারিত কাঠামোর অন্যতম প্রধান অংশ হলো মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী এলাকাকে সমন্বিত পণ্য পরিবহন, জ্বালানি ও শিল্পকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।
বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রবেশদ্বার হিসেবে আরও শক্তিশালী করতে অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন দুই নেতা।
যৌথ বিবৃতিতে শিল্পের মূল্যশৃঙ্খল শক্তিশালী করতে গভীর সমুদ্রবন্দরের সুবিধার সঙ্গে শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো এবং আধুনিক পরিবহন নেটওয়ার্কের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের সমন্বয়ের ফলে পণ্য পরিবহন আরও কার্যকর হবে, সরবরাহব্যবস্থার সংযোগ উন্নত হবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভবিষ্যতে সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন দুই নেতা।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্ব স্বীকার করে তাঁরা বলেছেন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৃহত্তর আঞ্চলিক সমৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।
বিগ-বি উদ্যোগে তৃতীয় টার্মিনাল ও মেট্রোরেল
বিগ-বির সম্প্রসারিত কাঠামোয় বাংলাদেশের আকাশপথ ও নগর পরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর লক্ষ্যে প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও পর্যটনের প্রসারে আধুনিক বিমানবন্দর অবকাঠামোর গুরুত্বও এ সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকায় গণপরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নে ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিটের (এমআরটি) বিভিন্ন লাইনের নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং পরিবহন অবকাঠামোয় আরও সহযোগিতার সম্ভাবনা যাচাইয়ের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরে সহায়তা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে দেশের সংযোগ জোরদারে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন দুই নেতা।
বিগ-বি কাঠামোয় নতুন কৌশলগত দিকনির্দেশনা
বিগ-বিকে অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে সম্প্রসারিত করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক নতুন কৌশলগত দিকনির্দেশনা পেয়েছে। এ কাঠামোয় অবকাঠামো বিনিয়োগের সঙ্গে শিল্প প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক যোগাযোগের সমন্বয় ঘটানো হবে।
পৃথক উন্নয়ন প্রকল্পের বাইরে গিয়ে সরকার, বেসরকারি বিনিয়োগকারী ও শিল্প খাতের অংশীজনদের নিয়ে আরও সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার অভিন্ন আকাঙ্ক্ষাও এতে প্রতিফলিত হয়েছে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো, শিল্পাঞ্চল, বিমান যোগাযোগ, নগর পরিবহন ও ডিজিটাল রূপান্তরের উন্নয়ন একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে আঞ্চলিক উৎপাদন নেটওয়ার্ক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে এ উদ্যোগের।
দুই প্রধানমন্ত্রী তাঁদের জনগণের জন্য বাস্তব অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করতে গৃহীত অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার দৃঢ় সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও দেশটির জনগণকে আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে তিনি সুবিধাজনক সময়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে জাপানের বেসরকারি বিনিয়োগের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বও শীর্ষ বৈঠকে উঠে আসে।
আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এক ট্রিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনাকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন তিনি।
সফরকে কেন্দ্র করে ঘোষিত বড় বিনিয়োগ উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই নেতা। আরও স্থিতিশীল সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পূর্বানুমানযোগ্য বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে তাঁরা সম্মত হয়েছেন।
সহযোগিতামূলক ও স্থিতিশীল সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে উৎপাদনশিল্প, খাদ্য ও কৃষি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং ওষুধশিল্পকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তাঁরা।
বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেন সানায়ে তাকাইচি। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে স্বচ্ছতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং ব্যবসাবান্ধব বিধিবিধান নিশ্চিত করতে তাঁর সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান করব্যবস্থা, শুল্ক ছাড়, অর্থ প্রেরণ ও লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়া উন্নত করে বিনিয়োগ সহজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার ও ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরকে স্বাগত জানান দুই নেতা।
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এবং জাপানি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে স্বাক্ষরিত সহযোগিতা চুক্তিগুলোকেও তাঁরা স্বাগত জানান।
এই সহযোগিতার গতি ধরে রাখতে জাপানের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশ সফরে পাঠানো এবং আরও অর্থনৈতিক সংলাপ আয়োজনের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া জাপান-বাংলাদেশ যৌথ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব প্ল্যাটফর্ম এবং বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মাধ্যমে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতেও সম্মত হয়েছেন তাঁরা।
