বিশ্লেষণ
সর্বশেষ আপডেট:
স্টার অনলাইন ডেস্ক
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে জেরুজালেমে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি সংবলিত প্রচার ব্যানার লাগানো একটি বাসের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন মানুষ। ব্যানারে লেখা, ‘জয়ের একটাই সুযোগ’। ২৫ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
‘পরিবর্তন আসছে’—লেখা পোস্টার নিয়ে এক তরুণী তেল আবিবে লাখো মানুষের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু-বিরোধী সমাবেশে। ভোটের মাধ্যমে সরকার বদলের ডাক দিয়েছিলেন তারা। এক বিক্ষোভকারী জানালেন, ইসরায়েলের মানুষ বর্তমান সরকারের পরিবর্তন চায়। তারা নেতানিয়াহু-গংদের আর ক্ষমতায় দেখতে চান না।
এমন দৃশ্য দেখা গিয়েছিল দেশটির জাতীয় নির্বাচনের ঠিক ২ দিন আগে, তথা গত ২৪ অক্টোবর।
সেই বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা নেতানিয়াহুর সরকার বদলের পাশাপাশি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস হামলার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানাচ্ছিলেন। এক বিক্ষোভকারী সংবাদমাধ্যমকে বললেন, ‘বর্তমান সরকার সেই হামলার জন্য দায়ী। এখন তারাই আবার নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছে। ওদেরকে পাগল মনে হচ্ছে। হামলার পর দিনই তাদের সরে যাওয়া উচিত ছিল।’
আরও বললেন, ‘আমরা বর্তমান সরকারকে নিয়ে ভয়ে আছি। তাদেরকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চাই।’
অনেকের আশা ও আশঙ্কা নেতানিয়াহু এবারও সরকার গড়বেন।
আবার অনেকের বলছেন, কোনো দলই সরকার গড়ার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। ফলে নতুন করে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। ডানপন্থিরা বিজয়ী হলে আবার একই পরিস্থিতি বা আরও খারাপ পরিস্থিতিতে পড়বে ইসরায়েল।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস হামলার পর ইসরায়েলে প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বলে দেশি-বিদেশি সবাই এই নির্বাচনকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য করছেন।
জেরুজালেমে ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার স্ত্রী সারা নেতানিয়াহু। ১ নভেম্বর ২০২২। ফাইল ছবি: রয়টার্স
কেননা, সেই হামলার পর ইসরায়েল তথা নেতানিয়াহুর সরকার গাজায় গণহত্যা চালায়। বিশ্ববাসীর কাছে নেতানিয়াহু বিশ্বের সবচেয়ে ‘ঘৃণিত ব্যক্তি’। গত ৩ বছরে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
পিউ গবেষণা কেন্দ্রের জরিপে, ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ শতাংশ মানুষ ইসরায়েলকে অপছন্দ করছে। ইউরোপের বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি অধিকৃত অঞ্চলের ইসরায়েলি পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
এমন বাস্তবতায় এই নির্বাচন শুধু ‘নেতানিয়াহুর ভাগ্য নির্ধারণকারী’ নয়, আরও নানান কারণে গুরুত্বপূর্ণ, বলে মনে করছেন অনেকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন—ইসরায়েলের এবারের ভোটযুদ্ধটা যেন ‘নেতানিয়াহু বনাম নেতানিয়াহু-বিরোধী’র।
আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজায় গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত। বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষের কাছে নেতানিয়াহু-ই পরিচিত মুখ। বিপরীতে, তার বিরোধীদের নাম অনেকের কাছেই অজানা।
শুধু তাই নয়, মূলত নেতানিয়াহুকেই ক্ষমতা থেকে সরাতে মরিয়া বিরোধী দলগুলো।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে—নেতানিয়াহু ভোটারদের আহ্বান করছেন তার ‘অসমাপ্ত কাজ’ শেষ করার সুযোগ দিতে। অর্থাৎ, তিনি এবার ক্ষমতায় ফিরে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করার উদ্যোগ নিতে চান।
গত ২ বছরে ইরানে সর্বাত্মক হামলা চালিয়ে, বিশেষ করে, গত ফেব্রুয়ারি প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও অন্যান্য শীর্ষ সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিদের হত্যা করেও এবং ‘চরম শত্রু’ দেশটির আকাশ ও নৌ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘নস্যাৎ’ করেও তিনি তার কাজ ‘শেষ’ করতে পারেননি। তাই তিনি ভোটারদের কাছে ‘সময়’ চেয়েছেন।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, নেতানিয়াহু নির্বাচন প্রচারণায় বেশ ‘হুমকি-ধমকি-ভয়-ভীতি’ দেখালেও ৭ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করেও নিজেকে ‘বিজয়ী বীর’ হিসেবে তুলে ধরতে পারছেন না। তার ‘বিজয়ী’ হওয়ার জন্য আরও সময় দরকার বলে ‘আবদার’ করছেন।
তাই, ভোটারদের কাছে বিরোধীদের মূল বক্তব্য—‘নেতানিয়াহু হটাও’।
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে সান ফ্রান্সিসকো থেকে ‘ফ্লাইট ফর চেঞ্জ’ বিমানে করে বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন ইসরায়েলিরা। লোদ, ইসরায়েল, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
নির্বাচনে মূল ইস্যু কী?
মোটা দাগে, বিরোধীদের মূল ইস্যু ‘নেতানিয়াহুকে সরিয়ে ইসরায়েলকে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরিয়ে আনা’। আর নেতানিয়াহুর সমর্থকদের মূল ইস্যু, ‘ডানপন্থি নেতানিয়াহুকে ফিরিয়ে এনে ইসরায়েলকে সামরিকভাবে আরও শক্তিশালী করা’।
তবে গত ২২ অক্টোবর বার্তা সংস্থা এএফপির বরাত দিয়ে ফরাসি সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর জানায়—২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাস হামলার ‘জবাবদিহিতা’, ‘ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কৌশল’, ‘প্রত্যেক ইসরায়েলির জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ’ ও ‘জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়া’র মতো বিষয়গুলোকে অনেকে ইসরায়েলের নির্বাচনে ‘মূল ইস্যু’ হিসেবে দেখছেন।
অনেকে জানেন, উগ্র ডানপন্থি ইহুদিদের প্রায় অর্ধেক সামরিক প্রশিক্ষণ নেন না। তারা শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নেন। তারা সব ধরনের সরকারি সহায়তা পান। তাই, বাকি অর্ধেক ইহুদি, যারা সামরিক প্রশিক্ষণ নেন তারা চাচ্ছেন সেসব ইহুদিদের জন্যও সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হোক।
এই বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলের ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভেদ চরমে।
গত ২৩ অক্টোবর অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজ এক প্রতিবেদনে জানায়—গাজা ও লেবানন যুদ্ধ ইসরায়েলের নির্বাচনে খুব প্রভাব ফেলবে বলে মনে হচ্ছে না। আবার বিরোধীরাও নির্বাচিত হলে ইসরায়েলে কোনো ‘আমূল পরিবর্তনের’ আশ্বাস দিতে পারছে না।
গত ১৫ অক্টোবর ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এক প্রতিবেদনেও এমনটিই জানা গেল।
প্রতিবেদনটিতে প্রশ্ন রাখা হয়—ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংঘাত নির্বাচনে প্রভাব ফেলছে কিনা? জবাবে বলা হয়, ক্ষমতাসীন দলগুলো বিষয়টি নিয়ে যতটা প্রচারণা চালাচ্ছে, বিরোধীরা ততটা প্রচারণা চালাচ্ছে না।
এতে বলা হয়, নেতানিয়াহুর সমর্থক উগ্র ডানপন্থি দলগুলো চায় দখলকৃত পশ্চিমতীরে ইহুদি বসতি বাড়িয়ে সেখানে ইহুদিদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তারা গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উৎখাত করে সেখানে ইহুদিদের বসতি গড়ার কথা বলছে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর বিরোধীদের কেউ কেউ পশ্চিমতীরে অভিবাসী ইহুদিদের সন্ত্রাসে মদদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে সরকারের সমালোচনা করলেও মোটের ওপর কোনো বিরোধী দলই ফিলিস্তিনদের বিষয়টি আমলে নিচ্ছে না।
‘লেবানন, সিরিয়া ও ইরান যুদ্ধ ইসরায়েলের নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলছে?’—এমন প্রশ্নের জবাবে ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদনটি বলছে—‘আশ্চর্যজনকভাবে খুবই কম। অধিকাংশ ইহুদি ইসরায়েলি যুদ্ধকে ক্রমাগত সমর্থন করেছে। বিশেষ করে, ইরান যুদ্ধের সময় ইসরায়েলিদের বেশ কয়েক সপ্তাহ আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে হলেও তাদের মধ্যে যুদ্ধে প্রতি সমর্থন অনেক বেশি।
ক্ষমতাসীন কট্টর ডানপন্থিদের মতো বিরোধী নেতারাও এসব যুদ্ধকে ভোটারদের সামনে ‘ইতিবাচক’ হিসেবে তুলে ধরছে।
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দীরা। ছবি: কোলাজ
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কারা?
ইসরায়েলের নির্বাচনে ৩৮ রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে, জানিয়ে এবিসি নিউজ-এর প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ১২০ আসনের নেসেটে বা পার্লামেন্টে কোনো দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে বলে মনে হয় না। দেশটিতে সরকার গড়তে হলে ৬১ আসন দরকার।
নির্বাচনে প্রধান মুখ বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি গঠিত হয় ১৯৭৩ সালে। কয়েকটি চরম ও মধ্য ডানপন্থি দল মিলে ধর্মনিরপেক্ষ লিকুদ (ইউনিয়ন) গড়ে তুলেছিল। এই দলের নেতা নেতানিয়াহু প্রায় ১৯ বছর ধরে ইসরায়েল শাসন করছেন।
বর্তমানে নেসেটে লিকুদ পার্টির ৩২ সদস্য আছে। অন্যান্য উগ্র ডানপন্থি দলের সমর্থন নিয়ে নেতানিয়াহুর দল সরকার পরিচালনা করছে।
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের আগের দিন তেল আবিবের একটি মহাসড়কের পাশে ইয়াশার পার্টির নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইসেনকটের ছবি সংবলিত নির্বাচনী প্রচারসামগ্রী। তেল আবিব, ইসরায়েল, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান গাদি আইসেনকটকে। তার মধ্য ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী দল ‘ইয়াশার’ (সরাসরি) গত বছর সেপ্টেম্বরে গড়ে তোলা হয়। নতুন এই দলটি এবারই প্রথম নির্বাচনে লড়ছে।
গত ২৪ অক্টোবর টাইমস অব ইসরায়েল এক প্রতিবেদনে জানায়—গত ২৩ অক্টোবর পরিচালিত ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল থারটিনের এক জনজরিপে দেখা গেছে, নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলো সবাই মিলে নেসেটে ৫৪ আসন পেতে পারে এবং নেতানিয়াহুর প্রতি সহানুভূতিশীল দলগুলো পেতে পারে ৫০ আসন। আরব দলগুলো পেতে পারে ১৬ আসন।
এবিসি নিউজ এর তথ্য মতে, গাদি আইসেনকটের ‘ইয়াশার’ এককভাবে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে বিজয়ী হতে পারে। দলটির ঝুলিতে যেতে পারে ২০ থেকে ২৩ আসন। দ্বিতীয় অবস্থানে যেতে পারে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি। দলটি পেতে পারে ১৯ থেকে ২০ আসন।
এই সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ‘নেতানিয়াহু-জোট’ নেসেটে ৪৯ থেকে ৫১ আসন পেতে পারে এবং ‘নেতানিয়াহুবিরোধী জোট’ পেতে পারে ৫২ থেকে ৫৫ আসন। আরব দলসহ ছোট দলগুলোর ঝুলিতে যেতে পারে ১৪ থেকে ১৯ আসন।
কোনো ‘জোট’ যেহেতু সরকার গড়তে প্রয়োজনীয় আসন পাচ্ছে না তাই তাদেরকে আরব দলগুলোর সমর্থন নিতে হতে পারে। অথবা কোনো দলের সদস্যরা যদি নির্বাচনের পর দল বদল করেন তাহলে হিসাবটা অন্যরকম হবে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের সরকারি সংবাদমাধ্যম কান-এর জরিপ বলছে—নেতানিয়াহু-বিরোধীরা ৫২ আসন পেতে পারে এবং নেতানিয়াহুপন্থিরা পেতে পারে ৫০ আসন। আরব দলগুলোর ঝুলিতে যেতে পারে ১৪ আসন।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে বনে ব্রাকে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নির্বাচনী ব্যানারের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন মানুষ। বনে ব্রাক, ইসরায়েল, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
ইহুদিদের জন্য এই নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বার্লিনে বসবাসকারী এলদাদ এইতান ও তার স্ত্রী লেইয়ার মতো আরও অনেক প্রবাসী ইসরায়েলি দেশে যাচ্ছেন ভোট দিতে। এই সংখ্যা ৫৩ হাজারেরও বেশি। তারা মূলত ফিরছেন ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য দেশ থেকে। অতীতের নির্বাচনগুলোয় এই সংখ্যাটা ছিল ১০ হাজারের মতো।
এলদাদ বলেন, অনেক ইসরায়েলি বিদেশে থাকলেও তাদের ‘বাড়ি’ ইসরায়েল। তারা তাদের দেশের সব বিষয়েই খোঁজ-খবর রাখেন।
প্রবাসী ভোটারদের অনেকে মনে করছেন, এই ভোটের মাধ্যমে শুধু ইসরায়েলের পরবর্তী নেতাই নির্ধারিত হবে না, ইসরায়েল কোন পথে এগোবে সেই দিক-নির্দেশনাও পাওয়া যাবে। অনেকে এই ভোটকে তাদের জীবনে ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
এটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, প্রবাসীদের দেশে এনে ভোট দেওয়ার জন্য বেসরকারিভাবে নানান ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি মনে করছে প্রবাসীদের একটি বড় অংশ তাদের বিরুদ্ধে ভোট দেবে। তাই তারা প্রবাসী ভোটারদের ওপর নাখোশ।
এমনকি, এই ভোটারদের অনেকে মনে করছেন, এটি হবে ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচন দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ‘গণভোটের’ রূপ নিতে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলে প্রথম ভোট হচ্ছে।
গত ২১ অক্টোবর জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আমেরিকা-ইসরায়েল ডেমোক্র্যেসি (এআইডি) কোয়ালিশনের সভাপতি জোনাথন বারসাডে সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, এবার যে সংখ্যক প্রবাসী ভোটার ইসরায়েলে যাচ্ছেন তাদের ভোটে অন্তত ২ জন নেসেট সদস্য নির্বাচিত হতে পারবেন। এই সংখ্যাটি সরকার গঠনে প্রভাব ফেলবে।
তিনি জানান—নেতানিয়াহুর লোকজন মনে করছেন এই প্রবাসীরা বিরোধী জোটকে ভোট দেবে। তাই তারা প্রবাসীদের নানাভাবে আটকানোর চেষ্টা করছে। সরকার মনে করছে, যারা বিদেশে থাকেন তারা দেশ সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না। সরকারের এমন দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তিনি।
তার মতে, ইসরায়েলিরা যে দেশেই থাকুক না কেন তারা ঘুম থেকে উঠে প্রথমে ইসরায়েলি সংবাদপত্র পড়েন এবং ঘুমাতে যাওয়ার আগে ইসরায়েলি টেলিভিশন দেখেন। হামাসের হামলার পর অনেক প্রবাসী ইসরায়েলি দেশে ফিরে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তারা ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবসময় চিন্তা-ভাবনা করেন।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে বনে ব্রাকে কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের ছবি সংবলিত নির্বাচনী পোস্টারের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন মানুষ। পোস্টারে লেখা, ‘বেন-গভির শক্তিশালী, ইসরায়েল শক্তিশালী’। বনে ব্রাক, ইসরায়েল, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
তারা সবসময় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ইসরায়েলিদের সঙ্গে আলোচনাও করেন।
ইসরায়েলের ইহুদিদের কাছে এই নির্বাচন শুধু নেতানিয়াহুর ‘ভাগ্য’ নির্ধারণ করবে না, বরং ইসরায়েলের ‘ভাগ্য’ও নির্ধারণ করবে।
নেতানিয়াহু-বিরোধীরা মনে করছেন, নেতানিয়াহু পরাজিত হলে তাকে দুর্নীতির অভিযোগে আদালতে যেতে হবে। দুর্নীতি প্রমাণিত হলে তাকে জেলেও যেতে হতে পারে। এই নির্বাচন তার রাজনৈতিক জীবনের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দেবে।
নেতানিয়াহুর সমর্থকরা মনে করছেন, ইসরায়েলের ভবিষ্যতের জন্য ডানপন্থি সরকার প্রয়োজন। ডানপন্থিদের নেতা হিসেবে নেতানিয়াহুই একমাত্র ‘যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য’। তিনি ক্ষমতায় এলে ইসরায়েল আরও সম্প্রসারিত হবে। গাজা ও পশ্চিমতীর পুরোপুরি দখলে নিতে পারবে। এছাড়াও, লেবানন ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের ওপর ইসরায়েলের আধিপত্য বিস্তার করা সম্ভব হবে।
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের আগে নাজারেতে জয়েন্ট লিস্টের নেতাদের ছবি সংবলিত নির্বাচনী ব্যানারের পাশে বসে আছেন এক আরব নারী। নাজারেত, ইসরায়েল, ১০ অক্টোবর, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
আরবরা কেন এই নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন?
ইসরায়েলের ইহুদিদের মতো দেশটির আরব বাসিন্দারাও এই নির্বাচনকে তাদের ‘ভাগ্য’ বদলানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। তারা দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে উগ্র-ডানপন্থি নেতানিয়াহুর সরকারের শাসনে এতটাই কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন যে, এখন তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর দরকার। এই নির্বাচনে ব্যাপক হারে ভোট দিয়ে তারা নেতানিয়াহুর পরাজয় নিশ্চিত করতে চাচ্ছেন।
গত ২৩ অক্টোবর ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলে—‘দ্য বিগেস্ট মোটিভেশন ইজ ফিয়ার’। অর্থাৎ, ভয়ের কারণেই বেশি সংখ্যক ইসরায়েলি আরব এবার ভোট দিতে যেতে পারে।
এতে জানানো হয়, ইসরায়েলে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিরা দেশটির উগ্র-ডানপন্থি সরকারকে সরাতে মরিয়া। তারা বেশি সংখ্যায় ভোট দিয়ে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে।
ইসরায়েলের প্রায় ২২ শতাংশ মানুষ ফিলিস্তিনি। তাই অনেকে মন করছেন, আরবদের ভোট এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আরব দল তা’ল-এর আহমাদ তিবির ভাষ্য: ‘আমরা এই সরকারের পতনের জন্য যা যা সম্ভব তা তা করবো।’
আরবরা বেশি হারে ভোট দিলে নেতানিয়াহুকে সরানোর লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের আগে নাজারেতে রাআম পার্টির প্রচারপত্র পড়ছেন এক আরব ব্যক্তি। নাজারেত, ইসরায়েল, ১০ অক্টোবর, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদন অনুসারে, ইসরায়েলের ইহুদি দলগুলো আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট করতে নারাজ। কোনো ইহুদি দল ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’ চাচ্ছে না। বেশিরভাগ ইহুদি দল ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিরোধী। তারা পশ্চিমতীরে ইহুদি বসতি আরও বাড়াতে চায়। আর এমন বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ইসরায়েলি আরবদের মনে ভয় ঢুকেছে।
এক আরব ভোটার মোহাম্মদ এই নির্বাচনকে ‘ইসরায়েলের ভিন্ন রকমের ভবিষ্যৎ’ গড়ার নির্বাচন বলে মনে করছেন।
তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলে থাকতে চাইলে অবশ্যই ভোট দিতে হবে। এই সরকার ক্ষমতায় ফিরলে তা বিপর্যয় হিসেবে দেখা দেবে।’
তা’ল নেতা আহমাদ তিবি বলেন, ‘আমাদেরকে নেতানিয়াহু, স্মোটরিচ, বেন-গ্ভির ও তাদের বিরোধীদের মধ্যে কাউকে বেছে নিতে হবে।’
গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ, অধিকৃত পশ্চিমতীরে জাতিগত নিধন ও ইসরায়েলের ভেতরে জাতিগত বৈষম্য আরবদের মনে গভীরভাবে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে, বলেও প্রতিবেদনটিতে মন্তব্য করা হয়। আরবরা চায় না উগ্র-ডানপন্থি মন্ত্রীরা আরও ৪ বছর ইসরায়েল শাসন করুক।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো থেকে জানা যায়, অনেক ইসরায়েলি আরব তাদের প্রতি ইসরায়েলি শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিবাদ হিসেবে ভোট দিতে যান না। তবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইসরায়েল/ফিলিস্তিন-বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আমজাদ ইরাকি মনে করেন, এ বছরের চিত্রটা ভিন্ন হতে যাচ্ছে।
তার মতে, আরবদের অনেকে ভাবছেন যে আবারও যদি উগ্র ডানপন্থিরা ক্ষমতায় আসে তাহলে ইসরায়েলি সরকারের আরও দখলদারিত্ব ও জাতিগত নির্মূল অভিযানকে চলমান রাখার প্রতি জনসমর্থন পরবর্তী ৪ বছরের জন্য জেঁকে বসবে।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে বনে ব্রাকে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নির্বাচনী ব্যানারের পাশে সাইকেলে বসে আছে এক শিশু। বনে ব্রাক, ইসরায়েল, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ‘চোখে’ ইসরায়েলের নির্বাচন
গত ২৪ অক্টোবর লন্ডনভিত্তিক অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করে—‘ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকা লাখো মানুষের ভোট নেই, যে ভোট তাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করবে।’
এতে বলা হয়, এই নির্বাচনের মাধ্যমে দশকের পর দশক ধরে একের পর এক ইসরায়েলি সরকারের অধীনে থাকা ফিলিস্তিনিদের কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন প্রত্যাশা করার কারণে নেই।
আন্তর্জাতিক সংস্থাটির ‘রিসার্চ, পলিসি, অ্যাডভোকেসি ও ক্যাম্পেইন’ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক এরিকা গুয়েভারা রসাস বলেন—‘ইসরায়েলের আসন্ন নেসেট নির্বাচনের দিকে যখন বিশ্ববাসীর নজর তখন একের পর এক ইসরায়েলি সরকারের অধীনে দশকের পর দশক ধরে নিয়মিত অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ফিলিস্তিনিদের প্রত্যাশা করার কোনো কারণ নেই যে, মানবাধিকার পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন হবে।
এতে আরও বলা হয়—নির্বাচনের আগে ইসরায়েলের নেতারা ভোটের মাঠে বাড়তি সুবিধা পেতে নির্লজ্জভাবে ফিলিস্তিনদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ ফিলিস্তিনিদের হুমকি দিচ্ছেন, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
প্রার্থীরা ফিলিস্তিনিদের ‘ছোট’ করে বক্তব্য দিচ্ছেন। তারা ভোটারদের কাছে অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি ও দখলদারিত্ব আরও বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
উগ্র ডানপন্থি নেতারা দখলকৃত গাজা উপত্যকায় আরও ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর হুমকি দিচ্ছেন। তারা ইসরায়েলের আরব নেতা সামি আবু শেহাদেহকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার জন্য চাপ সৃষ্টি করে তার গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি অসম্মান দেখিয়েছেন।
ইসরায়েলি সামরিক বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি বাড়ির ধ্বংসাবশেষ পরিদর্শন করছেন ফিলিস্তিনিরা। নুসেইরাত, মধ্য গাজা, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
পরবর্তীতে দেখা যায়, উগ্র ডানপন্থি নেতাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির উচ্চ আদালতের নির্দেশে সামি আবু শেহাদেহ নিজের প্রার্থিতা তুলে নিতে বাধ্য হোন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়—ইসরায়েলি সরকার নির্মমভাবে অধিকৃত পশ্চিমতীর ও পূর্ব জেরুসালেমের বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দিচ্ছে। ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর সামরিক বিধিনিষেধ আরোপ করছে। সেখানে রাষ্ট্র-সমর্থিত অভিবাসীদের সহিংসতা ফিলিস্তিনিদের প্রধান অর্থকরী ফসল জলপাই সংগ্রহের মৌসুমকে ভয়ের মৌসুম বানিয়ে ফেলেছে।
মানবাধিকার সংস্থাটির প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে—দখলকৃত গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের গণহত্যা এখনো চলমান। তথাকথিত যুদ্ধবিরতির এক বছর পরও সেখানে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা হচ্ছে। সংরক্ষিত এলাকার প্রসার ঘটানো হচ্ছে। ঘরবাড়ি-হারা হতাশায় জর্জরিত ফিলিস্তিনিদের ‘ফাঁদে’ আটকে ফেলা হয়েছে।
সীমান্ত বন্ধ করে রেখে গাজাবাসীদের জন্য খাদ্য সংকট তৈরি করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিধ্বস্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার শেষ চিহ্নটুকুও মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
দশকের পর দশক ধরে দল-মত নির্বিশেষে প্রতিটি ইসরায়েলি সরকারের নিষ্ঠুর বর্ণবাদ, বর্বর অবৈধ দখলদারিত্ব ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের অপরাধের মাত্রা বাড়িয়েছে। ফিলিস্তিনের বাইরে ইসরায়েলকে আরও জঘন্য অপরাধ করতে উৎসাহ দিচ্ছে।
লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় হাজার হাজার মানুষ হত্যা; ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংস ও সিরিয়ায় অবৈধভাবে হামলা চালিয়ে সাধারণ মানুষের সম্পত্তি ধ্বংস করার প্রসঙ্গটিও প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, ইসরায়েল অধিকৃত ফিলিস্তিনের পাশাপাশি লেবানন ও সিরিয়ার মানুষকে ইসরায়েলের রাজনীতি ও কর্মকাণ্ডের কারণে ভুগতে হয়। ইসরায়েলকে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতাকারী দেশগুলো গাজায় গণহত্যা বন্ধে ইসরায়েলের নতুন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের আগের দিন তেল আবিবের একটি মহাসড়কের পাশে ইয়াশার পার্টির নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইসেনকট এবং ইসরায়েল আওয়ার হোম পার্টির নেতা ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যানের ছবি সংবলিত নির্বাচনী প্রচারসামগ্রী। তেল আবিব, ইসরায়েল, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
মিত্র দেশগুলো ইসরায়েলকে বর্ণবাদী প্রথা থেকে বের করে আনতে পারে। দখলকৃত পশ্চিমতীরে জাতিগত নির্মূল অভিযান বন্ধ করতে পারে এবং ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারিত্বের অবসান ঘটাতে পারে।
তারা ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের হামলা বন্ধের পাশাপাশি দেশটিকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা সরাতে ইসরায়েলের চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যাতে সেখানকার বাস্তুচ্যুত মানুষ নিজেদের বাড়িঘরে ফেরার পরিবেশ পায়।
ইসরায়েলকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিদিন মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধের জন্য মিত্র দেশগুলোকে কাজ করতে হবে।
ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে এবং ইসরায়েলকে এমন সহযোগিতা করা যাবে না যার মাধ্যমে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি-ভূমিতে দখলদারিত্ব বজায় রাখতে পারে।
অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনটি আরও জানায়, ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে যে নির্বাচন হবে সেই নির্বাচনের বুথ বসানো হবে দখলকৃত পূর্ব জেরুসালেম, পশ্চিমতীর ও গাজা উপত্যকায় অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোয়। সেখানকার লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে সরাসরি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে, যদিও তাদের ভোটাধিকার নেই।
উপসংহার
এ কথা সবাই জেনেছেন যে, নেতানিয়াহুর প্রধান মিত্র মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। বিপরীতে, মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স এ বিষয়ে নীরব থেকেছেন।
বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আগামী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দাঁড়াতে চান ভ্যান্স। তিনি জানেন যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষ বর্তমানে ইসরায়েলকে অপছন্দ করে। তাই তিনি ইসরায়েলের নির্বাচন নিয়ে কথা বলে নিজের ভোট নষ্ট করতে চাচ্ছেন না।
ট্রাম্প মিত্র নেতানিয়াহুকে সমর্থন দেওয়ায় নেতানিয়াহুর ভক্তরা বেশ উজ্জীবিত। তবে ট্রাম্পের এমন সমর্থন যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রকৃত অবস্থানকেও ভোটারদের সামনে তুলে ধরছে বলেও মনে করছেন নেতানিয়াহু-বিরোধীরা।
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের আগে জেরুজালেমের মাহানে ইয়েহুদা বাজার পরিদর্শনে গিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন লিকুদ পার্টির নেতা ও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। জেরুজালেম, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
বিরোধীরা বলছেন, নেতানিয়াহুর কারণে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এই ব্যক্তির কারণে অনেকের কাছে ইসরায়েল গণহত্যাকারী দেশ হিসেবে ধিক্কৃত হচ্ছে। তাই ভোটের মাধ্যমে তাকে সরিয়ে দেওয়া উচিত।
আজ ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ভোট শুরু হয়ে স্থানীয় সময় রাত ১০টা পর্যন্ত চলবে।
মনে রাখা দরকার, ‘নেতানিয়াহুর মতো নেতা এক শতাব্দীতে একবার পাওয়া যায়,’ এমন দাবি করা মানুষেরও অভাব নেই ইসরায়েলে। তাদের মতে, নেতানিয়াহু সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতে পারেন। বিশ্ব-রাজনীতি ভালো বোঝেন। নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি কোনো ছাড় দেন না। বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তার সখ্যতা আছে।
গত প্রায় ২ দশক ধরে ইসরায়েলের শিক্ষাব্যবস্থায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘বিষ’ ছড়ানো হচ্ছে। সেখানকার তরুণরা বড় হচ্ছে উগ্র ডানপন্থি আদর্শ নিয়ে। এবার নতুন ভোটারদের ৭০ শতাংশের বেশি নিজেদের ফিলিস্তিনবিরোধী হিসেবে পরিচয় দেয়। তারা ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনিমুক্ত করতে এবং পুরো ফিলিস্তিন দখল করে নিতে চায়। তারা নেতানিয়াহুকেই ‘নেতা’ মনে করে।
তাই নির্বাচনে নেতানিয়াহু বিজয়ী হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
অন্যদিকে, তরুণদের অনেকে বলছেন, ‘জন্মের পর থেকে নেতানিয়াহুর মুখ দেখছি। এবার তাকে সরানো প্রয়োজন। তার হাতে আমাদের ভবিষ্যৎ বন্দি হয়ে আছে।’ ফলে, নেতানিয়াহুবিরোধীরা বিজয়ী হলে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না।
তবে যে জোটই সরকার গড়ুক না কেন এই নির্বাচনকে ইসরায়েল ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য এমনকি বহির্বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য করছেন অনেক বিশ্লেষক। তবে সব জল্পনা অবসানের আভাস পাওয়া যেতে পারে নির্বাচনের পরদিন, ২৮ অক্টোবর।