ইরানযুদ্ধের ছায়া এবার আরও গভীরভাবে পড়েছে সৌদি আরবের ওপর। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী রিয়াদে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, দেশের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার রাস তানুরা এবং আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার দাবি করেছে।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি জানিয়েছেন, তার বাহিনী রিয়াদে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। গোষ্ঠীর মিডিয়া সেন্টারের টেলিগ্রাম চ্যানেলে এই দাবি প্রকাশ করা হয়। সৌদি আরব এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। এর পাশাপাশি সারি দাবি করেন, দক্ষিণাঞ্চলীয় আবহা আন্তর্জাতিক
বিমানবন্দরকে ড্রোন দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এ ছাড়া পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে অবস্থিত সৌদি আরবের বৃহত্তম শোধনাগারেও হামলা দাবি করা হয়েছে।
হুথিদের দাবির বিপরীতে সৌদি-নেতৃত্বাধীন জোট বলছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রিয়াদের দিকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আটকে ধ্বংস করেছে। এর আগে সৌদি সিভিল ডিফেন্স সংস্থা আল-হারিক ও আল-খার্জ গভর্নরেট এবং রিয়াদ শহরের জন্য সংক্ষিপ্ত সময়ের সতর্কতা জারি করে।
পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের দিকে ছোড়া তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও আটকে ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জোট। জোটের মুখপাত্র এক্সে দেওয়া পোস্টে ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু বা হতাহতের কথা উল্লেখ করেননি। এই ঘোষণার আগে পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ ও আল-খার্জ গভর্নরেটে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। এ ছাড়া দক্ষিণ সৌদি আরবের দিকে ছোড়া চারটি হুথি ড্রোনও ভূপাতিত করেছে সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা।
রিয়াদে মার্কিন দূতাবাস নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের জারি করা নির্দেশের সূত্র ধরে দূতাবাস জরুরি নয় এমন সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সৌদি আরব ছাড়ার তাগিদ দিয়েছে। কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক ইরান-সমর্থিত হুথি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কথা বলা হয়েছে। দূতাবাস আরও হামলার আশঙ্কা, আকাশসীমা বন্ধ, ফ্লাইট বাতিল এবং ভ্রমণে বিঘেœর সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে।
ইয়েমেনের ভেতরেও যুদ্ধ তীব্র হচ্ছে। ইয়েমেন সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, ‘ডন অব ইয়েমেন’ নামের চলমান আক্রমণের অংশ হিসেবে গত ২৪ ঘণ্টায় হুথি অবস্থানে ১ হাজার ২৭৬টি অভিযান চালানো হয়েছে। সামরিক মুখপাত্র কর্নেল মাজেদ আল-নুজাইলি জানান, এসব অভিযানে প্রায় ৩৮২ জন হুথি কমান্ডার ও যোদ্ধাকে ‘নিষ্ক্রিয়’ করা হয়েছে, তবে কতজন নিহত বা আহত, তা তিনি স্পষ্ট করেননি। তার দাবি, ১৪০টি সামরিক যান ও ভারী অস্ত্র ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি অস্ত্র ও গোলাবারুদের ডিপোও আঘাত পেয়েছে।
মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্য ছিল হুথিদের কমান্ড সেন্টার, প্রতিরক্ষা অবস্থান, সহায়ক বাহিনী ও সরবরাহ লাইন। তিনি বলেন, এতে হুথিদের সেনা চলাচল ও এক ফ্রন্ট থেকে অন্য ফ্রন্টে বাহিনী সরানোর সক্ষমতা ব্যাহত হয়েছে। তাইজে স্থানীয় প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গে মিলে সরকারি বাহিনী আকাশ সহায়তায় আকস্মিক হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে আল-জাওফ, মারিব, আল-বাইদা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ফ্রন্টেও অভিযান চলছে।
হুথি-সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল থেকে তাইজের দুবাব ও মোখা জেলায় সরকারি বাহিনী ভারী বিমান হামলা চালায়।
অন্যদিকে হুথিরা দাবি করেছে, বাব আল-মান্দেবের দক্ষিণ দিক থেকে সরকারি বাহিনীর অগ্রযাত্রা তারা ঠেকিয়ে দিয়েছে। এক্সে পোস্টে বলা হয়, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ভারী অস্ত্রে সরকারি বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এতে বহু হতাহত হয়েছে এবং কয়েকটি সামরিক যান ধ্বংস হয়েছে।
এদিকে গত সোমবার তেহরানে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের শীর্ষ কর্মকর্তারা ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর প্রধান লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমন। আগস্টে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরকারী এই তিন দেশের সঙ্গে ইরানের এটাই প্রথম উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় শুরু হওয়া যুদ্ধ সৌদি আরব ও ইয়েমেন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
সৌদি আরব জানিয়েছে, এই সফরের উদ্দেশ্য আলোচনার পথ খোলা এবং সামরিক উত্তেজনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো। বৈঠক শেষে চার দেশ শান্তি ও নিরাপত্তায় সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে চার আঞ্চলিক দেশের মধ্যে সহযোগিতা শক্তিশালী করতে সংলাপ অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মহসেন রেজাই বলেন, সব প্রতিনিধি বিশ্বাস করেন চার দেশ একসঙ্গে কাজ করলে অঞ্চলের অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলের কোনো দেশেই নিরাপত্তা আনতে ব্যর্থ হয়েছে এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়ার অক্ষমতা স্পষ্ট হয়ে গেছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মার্কিন পক্ষ আলোচনায় গম্ভীর নয়।
তবে পেজেশকিয়ান আলোচনার দরজা খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাতার ক্যাম্পাসের সরকারবিষয়ক অধ্যাপক মেহরান কামরাভা আল জাজিরাকে বলেন, এই সংকেত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, এখন প্রচুর কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। গত সপ্তাহে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ তেহরান সফর করেছেন এবং সম্প্রতি একটি উচ্চপর্যায়ের কাতারি প্রতিনিধিদলও সেখানে গেছে।
কামরাভার বিশ্লেষণে, মধ্যস্থতাকে সুযোগ দিতে অবিলম্বে কিছু পদক্ষেপ দরকার। তার ভাষায় আশু বাধা হলো হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা, প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরানের ধারাবাহিক হয়রানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি বন্দর অবরোধ। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মতভেদের বড় অংশ এই প্রশ্নে যে, আগে কে কোনো নিষেধাজ্ঞা বা পদক্ষেপ তুলে নেবে। এর যেকোনো একটি পদক্ষেপ চলমান সংঘাতের সমাধানে বাস্তব অগ্রগতি হবে বলে তিনি মনে করেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সঙ্গে নিরাপত্তা প্রধান মহসেন রেজাইয়ের বৈঠকের খবরও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এসেছে। সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, খামেনি বলেছেন, মার্কিন-ইরান যুদ্ধ শেষ করতে এবং না যুদ্ধ, না শান্তি অবস্থা থেকে বেরোতে ইরানের অধিকার ও স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি জর্ডান ও মিশরের সমকক্ষদের সঙ্গে পৃথক ফোনালাপ করেছেন। আলোচনায় কূটনীতি ও রাজনৈতিক পরামর্শ অব্যাহত রাখার গুরুত্বের কথা উঠে আসে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইব্রাহিম সুলতান আল-হাশমি জানান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত স্থায়ীভাবে শেষ করতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে একটি কাতারি প্রতিনিধি দল তেহরান সফর করেছে। তার মতে, সৌদি আরব ও মক্কা চুক্তির দেশগুলোর প্রচেষ্টা কাতার ও পাকিস্তানের উদ্যোগের পরিপূরক। তিনি বলেন, অঞ্চলের প্রয়োজন এমন এক নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে।
হরমুজ প্রণালি নিয়েও উত্তেজনা অব্যাহত। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর কমান্ডার দাবি করেছিলেন, মার্কিন বাহিনী প্রণালি ছেড়ে চলে গেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক্সে দেওয়া পোস্টে এই দাবিকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। সেন্টকমের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনী প্রণালি ও আশপাশের জলসীমায় উপস্থিত ও সতর্ক আছে। তারা আরও দাবি করে, মার্কিন বাহিনী ও আঞ্চলিক অংশীদাররা এই আন্তর্জাতিক জলপথ নিয়ন্ত্রণ করছে, স্পষ্টতই ইরান নয়।
এর মধ্যে ইরানের নৌবাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির পূর্ব দিকে নৌ-মাইনে আঘাত লেগে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন ধরেছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে বলা হয়েছে, ট্যাংকারটি ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ রেখে নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করেছিল।
এদিকে আল জাজিরার ওয়াশিংটন প্রতিনিধি অ্যালান ফিশার জানান, ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, আগামী মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কোনো হামলা হবে না। তবে ইসরায়েলের সঙ্গে তার আলোচনা চলছে। সম্প্রতি পিট হেগসেথ তেল আবিবে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। জল্পনা ছিল, নির্বাচনের আগেই হামলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু ট্রাম্প তা নাকচ করেছেন।
ফিশারের ভাষ্যমতে, ট্রাম্পের সামনে একাধিক সামরিক বিকল্প রাখা হয়েছে, যার পরিধি নিম্নমাত্রার অভিযান থেকে মাদার অব অল বোম্বস খ্যাত এমওএবি ব্যবহার পর্যন্ত। নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প এই উচ্চ-বিস্ফোরক বোমা ব্যবহারের কথা বলেছেন এবং ইরানকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার কথাও বলেছেন। গত মাসে জাতিসংঘে ভাষণেও তিনি এমন কথা বলেছিলেন। হোয়াইট হাউসের বক্তব্য, পরবর্তী পদক্ষেপ পুরোপুরি কমান্ডার-ইন-চিফ ট্রাম্পের হাতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে ইরান সংঘাত শিগগিরই, একভাবে না একভাবে শেষ হবে।
মিসিসিপির করিন্থে এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প যুদ্ধের পক্ষে সাফাই গেয়ে দাবি করেন, ইরানই যুদ্ধ শুরু করেছে। একজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার বক্তব্যের প্রতিধ্বনি তুলে তিনি বলেন, আমরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করিনি, ইরান আমাদের সঙ্গে শুরু করেছে। আগের যুদ্ধবিরতিকে তিনি সময়ের অপচয় বলে অভিহিত করেন।
অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে বেইজিং গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং অদূর ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে একজন দূত পাঠাবে।
পরিস্থিতি এখন দুই সমান্তরাল ধারায় এগোচ্ছে। এক দিকে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, ইয়েমেনের স্থলযুদ্ধ, হরমুজে মাইন ও জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং ওয়াশিংটনের কঠোর অবস্থান। অন্য দিকে তেহরানে আঞ্চলিক বৈঠক, কাতারের মধ্যস্থতা, রুশ ও চীনা কূটনৈতিক তৎপরতা এবং পেজেশকিয়ানের আলোচনার ইঙ্গিত। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি খোলা ও মার্কিন অবরোধ শিথিল করার প্রশ্নে কোনো একটি পক্ষ প্রথম পদক্ষেপ না নিলে অচলাবস্থা কাটবে না। আর মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ট্রাম্প কী সিদ্ধান্ত নেন, সেদিকেই এখন সবার নজর।
