বনাঞ্চলের দাবানল থেকে সৃষ্ট ধোঁয়া নিয়ে বিরোধের জেরে সিঙ্গাপুরে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ কমিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। শনিবার (২৪ অক্টোবর) থেকে দৈনিক ৩ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির তেল ও গ্যাস খাতের তদারককারী রাষ্ট্রীয় সংস্থা এসকেকে মিগাস।
সংস্থাটির প্রধান জোকো সিসওয়ান্তো বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জের নাতুনা গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক ১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট এবং সুমাত্রা থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট সরবরাহ কমানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’ পরিস্থিতি প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করা হবে বলেও জানান তিনি। আপাতত শুধু সিঙ্গাপুরেই এই সরবরাহ হ্রাসের প্রভাব পড়েছে।
সিঙ্গাপুরের জ্বালানি বাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরবরাহ কমানোর পরিমাণ দেশটির দৈনিক মোট গ্যাস চাহিদার ২ শতাংশেরও কম। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের বিকল্প পরিকল্পনাও রয়েছে।
সংস্থাটি এএফপিকে দেওয়া বিবৃতিতে বলেছে, গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের ঘটনায় চুক্তি অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক সব ধরনের প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সিঙ্গাপুরের আমদানিকারকরা উদ্যোগ নেবেন বলে তারা আশা করছে।
গ্যাস সরবরাহ কমানোর আগে এক সপ্তাহ ধরে এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে আসছিল ইন্দোনেশিয়া। বৃহস্পতিবার পূর্ব কালিমান্তানের উপকূলে গ্যাস স্থাপনা উদ্বোধনের সময় দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী বাহলিল লাহাদালিয়া বলেন, যেসব দেশ ইন্দোনেশিয়াকে সম্মান করে না, তাদের কাছে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
ইকো-বিজনেসের প্রতিবেদনে তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘আমি বিষয়টি পর্যালোচনা করব। ইন্দোনেশিয়াকে অসম্মান করে এমন দেশগুলোর কাছে রপ্তানি বন্ধের বিষয়টি বিবেচনা করতে দ্বিধা করব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘নীতিগত দিকটি স্পষ্ট: আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ প্রথমে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ব্যবহার করা হবে। এটি টিকে থাকার লড়াই।’
এর আগের দিন প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো বনাঞ্চলের আগুনের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তদন্তের নির্দেশ দেন। এ জন্য পুলিশ, কৌঁসুলি এবং বন মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিদেশে ইন্দোনেশিয়ার সমালোচকদেরও জবাব দেন তিনি।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে প্রাবোও বলেন, ‘ইন্দোনেশীয় জাতিকে অপমান করতে পছন্দ করে এমন কিছু দেশের জন্য সময় হলে আমরা প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম প্রকাশ করব।’
বনাঞ্চলের আগুনে ভূমিকা রাখার সন্দেহে ইন্দোনেশিয়ার ১০টি কোম্পানিকে ধোঁয়াবিরোধী আইনের আওতায় আইনি নোটিশ দিয়েছে সিঙ্গাপুর। দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। এ ছাড়া সিঙ্গাপুরের শেয়ারবাজার কর্তৃপক্ষ আগুনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তালিকাভুক্ত সাতটি কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে।
সিঙ্গাপুরের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বিদ্যুতের প্রায় ৯৫ শতাংশ উৎপাদিত হয় প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে। ইন্দোনেশিয়া থেকে মূলত পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানি করে সিঙ্গাপুর। এ সরবরাহের চুক্তিগুলোর মেয়াদ ২০২৮ সালের শেষ দিকে শেষ হওয়ার কথা।
২০২৪ সালে সিঙ্গাপুরের মোট গ্যাস আমদানির অর্ধেকের বেশি ছিল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)। এ জ্বালানি আমদানির সক্ষমতা বাড়াতে দেশটিতে দ্বিতীয় একটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইন্দোনেশিয়া সিঙ্গাপুরে ১৪৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করেছিল।
বন উজাড় পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নুসান্তারা অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে ইন্দোনেশিয়ায় বনাঞ্চলের আগুনে ১৯ লাখ হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে।
দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, আগস্টের মাঝামাঝি থেকে ইন্দোনেশিয়ার সাতটি প্রদেশে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪৭০ জনের বেশি মানুষ তীব্র শ্বাসতন্ত্রের অসুস্থতায় ভুগেছেন।
ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে মালয়েশিয়া ও পূর্ব তিমুরেও। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের পক্ষ থেকে বৈঠক ডাকা হয়েছে।
মালয়েশিয়ার পরিবেশমন্ত্রী আর্থার জোসেফ কুরুপ বলেছেন, ধোঁয়া সংকট মোকাবিলায় ইন্দোনেশিয়ার কাছ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করার অধিকার মালয়েশিয়া সংরক্ষণ করে। ম্যানিলায় আসিয়ানের বৈঠকেও বিষয়টি উত্থাপন করবে তার দেশ।
দাবানলের ধোঁয়া পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে ইন্দোনেশিয়ায় হাজারো শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করেছেন। শুক্রবার মধ্য কালিমান্তান প্রদেশের গভর্নরের কার্যালয়ের বাইরে ৫০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী জড়ো হয়ে দেশজুড়ে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণার দাবি জানান।
অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়ার সরকারি যোগাযোগ বিভাগের প্রধান সিয়াহগান্দা নাইঙ্গোলান বলেন, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার অক্সিজেন আসে ইন্দোনেশিয়ার বন থেকে। তার এ মন্তব্যের পর মালয়েশিয়ায় কিছু ভোক্তা ইন্দোনেশীয় পণ্য বর্জন শুরু করেছেন বলে জানিয়েছে দ্য স্ট্রেইটস টাইমস।
বনাঞ্চলের আগুন ও ধোঁয়া নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুরে গ্যাস সরবরাহ কমানোর সিদ্ধান্ত সংকটকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
সূত্র : দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউকে
