শরৎ পূর্ণিমায় বাংলার ঘরে ঘরে পূজিতা হন ধন-সম্পদের দেবী। লক্ষ্মী হলেন গৃহের দেবী। বাংলার মাটিতে তিনি বরাবর মান্যের পুজো পেয়েছেন। আবার সর্বজনের দ্বারাও পূজিতা হয়েছেন। বারোয়ারি আয়োজনে তাঁর পুজো সচরাচর দেখা যায় না। কিন্তু ব্যতিক্রম রয়েছে। হাওড়া জেলার খালনা গ্রামের নাম হয়ে গিয়েছে ‘লক্ষ্মীগ্রাম’। দুর্গাপুজো নয়, আমতার এই গ্রামের প্রধান উৎসব কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো।
গোটা বাংলা যখন বিসর্জনের বিষাদে ডুবে থাকে, তখন খালনা সেজে ওঠে কোজাগরী পূর্ণিমা উপলক্ষে। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় একশোটির মতো লক্ষ্মীপুজো হয় গ্রামে। ৩০ থেকে ৪০টি বারোয়ারি লক্ষ্মীপুজো। নানা ‘থিম’-এ সেজে ওঠে মণ্ডপ। পুজোগুলির মধ্যে রীতিমতো থিমের টক্কর চলে। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোকে কেন্দ্র করে তিন দিন ধরে চলে উৎসব। হাজার হাজার মানুষ আসেন। দুর্গাপুজোর মতো সারা রাত ধরে চলে ঠাকুর দেখার পালা। খালনার ক্ষুদিরামতলার কোহিনূর ক্লাবের পুজোর মতো বেশ কিছু পুজোর বয়স ১৫০ বছরেরও বেশি। গ্রামের কৃষ্ণরায়তলা, বলাই স্মৃতি লক্ষ্মী মন্দির, করুণাময় কিশোর সঙ্ঘ, আমরা সবাই (হরিসভা), কালীমাতা তরুণ সঙ্ঘের মতো পুজোগুলিও বয়সে প্রাচীন।
খালনায় কী ভাবে শুরু হয়েছিল বারোয়ারি লক্ষ্মী পুজো?
২০০-২৫০ বছর আগে খালনায় প্রতি বছর ভয়াবহ বন্যা হত। বন্যার জলে নষ্ট হত চাষের ফসল। তখন কৃষকেরা দেবী লক্ষ্মীর পুজো শুরু করেন। শুরু হয় চারুময়ী লক্ষ্মীর আরাধনা। চাষাবাদ ছেড়ে ধীরে ধীরে ব্যবসা-বাণিজ্য খালনার মানুষদের মূল পেশা হয়ে ওঠে। সোনা, লোহা ও অন্যান্য ধাতুর ব্যবসায় সমৃদ্ধি আসে। কৃষকদের শুরু করা এবং ব্যবসায়ীদের হাতে এগিয়ে চলা সেই পুজোগুলিই আজ সর্বজনীন পুজোয় রূপান্তরিত হয়েছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শুরু হয়েছে থিমের পুজোও।
কেবল হাওড়া নয়, পশ্চিম বর্ধমানের রানিগঞ্জ এবং নদিয়া জেলার চাকদহে সর্বজনীন লক্ষ্মীপুজো হয়। পশ্চিম বর্ধমানের রানিগঞ্জে আটের দশক থেকে বারোয়ারি লক্ষ্মীপুজো আয়োজিত হচ্ছে। রানিগঞ্জ, আসানসোলে বেশ কিছু বাড়ির পুজোই আজ সর্বজনীন পুজোর আকার ধারণ করেছে। রানিগঞ্জের কুমারবাজারের যমজয়ী মন্দিরের লক্ষ্মীপুজো বয়সে শতাব্দী প্রাচীন। রানিগঞ্জের অন্যতম বড় সর্বজনীন লক্ষ্মী পুজোর আয়োজন করে বল্লভপুর হরিবোল সমিতি। পুজোর বয়স চল্লিশ বছরের বেশি। পূর্ব বর্ধমানের গুসকরার শিবদা গ্রামে, উত্তর দিনাজপুরের গোরাহার ও বিশাহার গ্রামে বারোয়ারি লক্ষ্মীপুজো দেখা যায়। নদিয়ার চাকদহে দরাপপুর-সহ বল্লভপুর, নেতাজি বাজার, চৌগাছা অঞ্চলে পাড়ায় পাড়ায় বারোয়ারি লক্ষ্মীপুজো হয়। পুজোগুলির শিকড় ওপার বাংলায়। দেশভাগের পরে এপারে এসে বাড়ির পুজোগুলিই সর্বজনীন পুজোর রূপ নিয়েছে। ইদানীং এ সব পুজোকে ঘিরে থিমের লড়াই চলে। ঠাকুরঘরের পারিবারিক পুজোর পরিচিতি ছেড়ে লক্ষ্মীপুজো হয়ে উঠেছে সর্বজনীন।
এই প্রতিবেদনটি 'আনন্দ উৎসব' ফিচারের একটি অংশ।
