ইতালিতে গিয়ে মাসে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা আয়ের সোনালী স্বপ্নের হাতছানি দিয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার পাঁচটি পরিবারকে ফাঁদে ফেলেছিল একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র। ইউরোপের সেই রঙিন স্বপ্ন লিবিয়ার অন্ধকার বন্দিশালায় গিয়ে রূপ নেয় এক দুঃস্বপ্নে। দীর্ঘ ১০ মাসের নারকীয় বন্দিজীবন ও অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করে অলৌকিকভাবে প্রাণ নিয়ে দেশে ফিরলেও, ততক্ষণে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন ভুক্তভোগীরা। জমি, গবাদি পশু ও সারাজীবনের সঞ্চয় হারিয়ে এখন ঋণের পাহাড় মাথায় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তাঁরা।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আলমডাঙ্গা উপজেলার নিমতলা গ্রামের চায়ের দোকানি আসাদুল ওরফে আপানুরের ছেলে ইতালি প্রবাসী মোহাম্মদ আলী হাউসের মাধ্যমেই এই প্রতারণার জাল পাতা হয়। পরিচিত ও প্রতিবেশী হওয়ার সুবাদে তাঁর লোভনীয় প্রস্তাবে সহজেই বিশ্বাস করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। চুক্তি অনুযায়ী—অর্ধেক টাকা আগে এবং বাকি টাকা ইতালি পৌঁছানোর পর দেওয়ার শর্তে রাজি হন তাঁরা। কিন্তু সরাসরি ইতালি নেওয়ার কথা বলে কয়েকটি দেশ ঘুরিয়ে তাদের পাচার করা হয় লিবিয়ার একটি গোপন টর্চার সেলে।
লিবিয়ার বন্দিশালায় নারকীয় নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়
লিবিয়ায় পৌঁছানোর পরপরই জাহিদ, কামরুলসহ অন্যদের পাসপোর্ট, মুঠোফোন ও সব নথিপত্র কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর ৫৭ জন বন্দির সঙ্গে একটি ছোট ঘরে তাদের আটকে রাখা শুরু হয় আসল নির্যাতন। আলাদা ঘরে নিয়ে পাইপ ও লাঠি দিয়ে ভুক্তভোগীদের বেধড়ক পেটানো হতো, আর সেই কান্নার আওয়াজ মুঠোফোনে শুনিয়ে দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে আদায় করা হতো টাকা।
প্রাণ বাঁচাতে পরিবারগুলো জমি বন্ধক, গবাদি পশু বিক্রি এবং চড়া সুদে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে দফায় দফায় টাকা পাঠাতে থাকে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এভাবে পাঁচটি পরিবারের কাছ থেকে মোট ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। টাকা আদায়ের পর একপর্যায়ে টিউব দিয়ে তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। সাগরে নৌকাটি ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলে আন্তর্জাতিক জলসীমায় কোস্ট গার্ডের হাতে আটক হয়ে দীর্ঘদিন বিদেশি কারাগারেও বন্দি ছিলেন তাঁরা। পরবর্তীতে অন্য এক দালালের মধ্যস্থতা ও প্রশাসনিক তৎপরতায় কোনোমতে দেশে ফিরে আসেন তাঁরা।
সব হারিয়ে যারা আজ জীবন্ত লাশ
- জাহিদ হাসান (৫০), ফুলবগাদী: কুয়েতে ১২ বছর কঠোর পরিশ্রম করে দেশে ফিরে গড়েছিলেন ৩০০ ভেড়ার বিশাল খামার ও ট্রাক্টর। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে ২৯ লাখ টাকা দিয়ে আজ তিনি সম্পূর্ণ নিঃস্ব। শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন নির্যাতনের ক্ষত।
- কামরুল ইসলাম, ফুলবগাদী: ৬০টি ভেড়া ও ১২টি গরুর সমৃদ্ধ খামার ছিল তাঁর। খামারের সব পশু বিক্রি করে এবং বর্গা জমি হারিয়ে দালালকে দিয়েছিলেন ৩২ লাখ টাকা। আজ তাঁর ঘরে শুধুই শূন্যতা।
- জাহিদুল ইসলাম (২১), ফুলবগাদী: মাত্র ২১ বছর বয়সেই জীবনের বড় ধাক্কা খেয়েছেন। নিজের গরু-ছাগল ও সম্বল বিক্রি করে ৩৪ লাখ টাকা হারিয়ে এখন তিনি দিশেহারা।
- আলিফ, নিমতলা: দেশের সেবায় যোগ দিয়েছিলেন সেনাবাহিনীতে। কিন্তু ইতালির মোহে পড়ে চাকরিটি ছেড়ে দেন। আজ ৩০ লাখ টাকা হারানোর পাশাপাশি হারিয়েছেন নিশ্চিত ক্যারিয়ারও।
- ছাব্বির আলী, বড়গাংনী: দর্শনা সরকারি কলেজের ইসলামী ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের মেধাবী শিক্ষার্থী। পড়াশোনা ছেড়ে সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় ২২ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন দালালের হাতে।
টাকা ফেরত চাইলে হুমকি ও প্রশাসনের বক্তব্য
বর্তমানে দেশে ফিরে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো টাকা ফেরত চাইলে উল্টো পাচারকারী চক্রের সহযোগীদের কাছ থেকে নানামুখী হুমকি ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। তবে অভিযুক্ত মোহাম্মদ আলী হাউসের বাবা আসাদুল সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তাঁর ছেলে নির্দোষ এবং ভুক্তভোগীরা সাগরের ভয় পেয়ে নিজেরা পালিয়ে এসেছে।
এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীনুর আক্তার জানান, বিদেশ গমনেচ্ছুদের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (BMET) মাধ্যমে দক্ষ হয়ে বৈধ পথে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত সচেতন করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে প্রশাসনের কাছে এলে আইনি সহায়তাসহ সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখা হবে।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘরের ছেলেরা ঘরে ফিরলেও চুয়াডাঙ্গার এসব গ্রামে এখন শুধুই কান্নার রোল। দালালের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং খোয়ানো টাকা ফেরত পেয়ে ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সর্বস্বান্ত হওয়া এসব পরিবার।

