আগামী পাঁচ বছরে ১০ লাখ নতুন ডিজিটাল কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে উন্নত টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো ও উচ্চগতির ব্রডব্যান্ডের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রযুক্তি খাতে অগ্রগতির জন্য নতুন প্রযুক্তির পেছনে ছোটা নয়, বরং দেশের বর্তমান প্রয়োজন অনুযায়ী বিনিয়োগ করার পরামর্শ দিয়েছে হুয়াওয়ে।
হুয়াওয়ে সাউথ এশিয়া অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট উ জি (জেসন) বলেছেন, বাংলাদেশের এখনই ফাইভ-জি অ্যাডভান্সড বা নেটওয়ার্ক সেন্সিংয়ের মতো উন্নত প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। বরং বিদ্যমান ফাইভ-জি নেটওয়ার্কের বিস্তার, যন্ত্রের দাম কমানো এবং বাস্তবভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা চালু করলে বিদ্যুৎ খরচ ও পরিচালন ব্যয় কমানো সম্ভব।
রাজধানীর শেরেবাংলানগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের সেলিব্রিটি হলে গতকাল মঙ্গলবার ‘বাংলাদেশ টেককানেক্ট ২০২৬’ অনুষ্ঠানে এসব পরামর্শ দেন তিনি। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং হুয়াওয়ে যৌথভাবে এ আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, সরকার জ্ঞানভিত্তিক ও বিনিয়োগবান্ধব অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়। এ জন্য নির্ভরযোগ্য টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় আগামী পাঁচ বছরে ১০ লাখ নতুন ডিজিটাল কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশকে বৈশ্বিক এআই ও তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্রে পরিণত করতেও কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে হুয়াওয়ের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
উ জি তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে প্রথম ফাইভ-জি কল করা হলেও এখনো এর আওতা ঢাকা ও কয়েকটি বড় শহরের কিছু এলাকায় সীমিত। দেশের প্রায় ১৭ কোটি মোবাইল গ্রাহকের অধিকাংশই ফোর-জি ব্যবহার করেন। চারটি অপারেটরের প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে স্পেকট্রামও সীমিত। এ অবস্থায় ফাইভ-জি অ্যাডভান্সড ব্যবস্থায় যাওয়ার আগে বর্তমান নেটওয়ার্কের পূর্ণাঙ্গ বিস্তার জরুরি।
তার মতে, যে প্রযুক্তির সুবিধা এখনই ব্যবহার করা সম্ভব নয়, তার জন্য বাড়তি অর্থ ব্যয় করলে প্রত্যাশিত সুফল মিলবে না। বরং তৈরি পোশাক কারখানায় শিল্পভিত্তিক ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) এবং কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তির মতো ব্যাবহারিক ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। নেটওয়ার্ক বিস্তার ও ব্যবহার বাড়লে পরবর্তী প্রযুক্তিতে যাওয়ার ভিত্তিও তৈরি হবে।
এআইয়ে কমবে বিদ্যুৎ খরচ : বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে আরেকটি বড় সুযোগ হিসেবে এআইভিত্তিক নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনার কথা বলেন হুয়াওয়ের এ কর্মকর্তা। তার ভাষ্য, সীমিত স্পেকট্রাম, বিদ্যুতের উচ্চ ব্যয়, বর্ষাকালের প্রতিকূলতা এবং দ্রুত বাড়তে থাকা গ্রাহকসংখ্যা সামাল দিতে অপারেটরদের চাপ বাড়ছে। নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান নেটওয়ার্ককে আরও দক্ষ করে তোলা প্রয়োজন।
এআইয়ের মাধ্যমে নেটওয়ার্কের ব্যবহার বিশ্লেষণ, আগাম ত্রুটি শনাক্তকরণ এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা চালু করা যায়। এসব সুবিধার অনেকটাই বিদ্যমান অবকাঠামোয় সফটওয়্যার হালনাগাদের মাধ্যমে যুক্ত করা সম্ভব। হুয়াওয়ের হিসাবে, এআইভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় বেস স্টেশনের বিদ্যুৎ খরচ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমানো যেতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহে সীমাবদ্ধতা থাকা দেশের জন্য এটি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সম্পদের কার্যকর ব্যবহারেরও সুযোগ।
তাই ফাইভ-জি অ্যাডভান্সড ব্যবস্থায় যাওয়ার আগে সব অপারেটরের নেটওয়ার্কে এআইভিত্তিক ব্যবস্থাপনা চালুর ওপর জোর দেন তিনি।
নেটওয়ার্ক সেন্সিংয়ে এখনই নয় : নেটওয়ার্ক সেন্সিং বা সমন্বিত সেন্সিং ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইএসএসি) নিয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে হুয়াওয়ে। এ প্রযুক্তিতে টেলিযোগাযোগের বেস স্টেশন ব্যবহার করে ড্রোন শনাক্ত, যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ কিংবা আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রযুক্তিটি এখনো তৃতীয় প্রজন্মের অংশীদারত্ব প্রকল্পের (থ্রিজিপিপি) রিলিজ-২০ পর্যায়ে গবেষণাধীন এবং এর মানদ- এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি।
এ ছাড়া কে কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে এবং স্পেকট্রাম ব্যবহারের নিয়ম কী হবেÑ এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রক কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। স্বচালিত গাড়ি বা ড্রোন চলাচলের নির্দিষ্ট করিডরের মতো সম্ভাব্য ব্যবহারও বাংলাদেশে নিকট ভবিষ্যতে ব্যাপকভাবে চালু হওয়ার মতো অবস্থায় নেই।
এ কারণে প্রযুক্তিটির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণের আলোচনায় অংশগ্রহণ এবং সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালানোর পক্ষে মত দেন উ জি। তবে তার মতে, বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য ২০২৭ সালের চেয়ে ২০৩০ সালকে লক্ষ্য ধরে এগোনো বাস্তবসম্মত।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, কার্যকর ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তুলতে শুধু দ্রুতগতির নেটওয়ার্ক থাকলেই হবে না। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা, দক্ষ জনবল এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে। শিল্প খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যয় কমানো এবং গ্রাহকসেবা উন্নত করতে পারে। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সরকারি সেবায় এআই ব্যবহারের সম্ভাবনার পাশাপাশি স্থানীয় ভাষায় সেবা, গোপনীয়তা এবং কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জনের বিষয়ও আলোচনায় আসে।
অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব ড. মো. কামরুজ্জামান, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মামুনুর রশিদ ভূঁইয়া এবং যুগ্ম সচিব সায়দা আফরোজসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। আয়োজনের অংশ হিসেবে প্রযুক্তি প্রদর্শনী ও অভিজ্ঞতা বিনিময়েরও ব্যবস্থা করা হয়।
উ জি’র মতে, বাংলাদেশের প্রযুক্তি কৌশল হওয়া উচিত বাস্তব প্রয়োজননির্ভর। এখন এআই দিয়ে নেটওয়ার্কের ব্যয় ও পরিচালনগত সমস্যা কমানো এবং ফাইভ-জি বিস্তারে মনোযোগ দিতে হবে। উন্নত প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের আগে তার ব্যবহারযোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করাই হবে কার্যকর পথ।