কচড়া তেল তৈরির জন্য মহুয়া ফুলের বীজ বাছাই করা হচ্ছেEi Samay
Published on
:
2 min read
সমীর মণ্ডল, মেদিনীপুর
তেল দেখতে অনেকটা সর্ষের তেলের মতো। কিন্তু গন্ধ আলাদা। কিন্তু সেই তেলের উপরেই নির্ভর করেন এলাকার মানুষজন। পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলার বহু আদিবাসী ও প্রান্তিক পরিবারের কাছে মহুয়া ফলের বীজ থেকে তৈরি 'কচড়া তেল' এখনও দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার অনেক খাবারই হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কচড়া তেল তার মধ্যে এখনও বাঁচার লড়াইয়ে আছে।
কী ভাবে পাওয়া যায় এই তেল? গরম কালে মহুল গাছের নীচে ফল পড়ে। তা কুড়িয়ে সংগ্রহ করেন মানুষজন। সেই ফলের খোসা ছাড়িয়ে বীজ আলাদা করা হয়। তা দীর্ঘ সময় শুকিয়ে নেওয়ার পরে স্থানীয় ঘানি বা তেলকলের মাধ্যমে বীজ থেকে তেল বের করা হয়। বহু পরিবার রান্নার কাজে এই তেল ব্যবহার করে। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার শালবনির জঙ্গলঘেরা জোড়াকুশমা গ্রামের এক মহিলা পূর্ণিমা সরেন বলেন, 'ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি জঙ্গলমহলের মানুষ বিশেষ করে মহিলারা মহুয়া ফুল ও ফল কুড়িয়ে অর্থ উপার্জন করেন। মহুয়া ফুল থেকে মদ তৈরি করা হয়। আর ফল থেকে তেল বানানো হয়।
আগে প্রায় সব বাড়িতেই কচড়া তেল ব্যবহার হতো। এটাই ছিল জঙ্গলমহলের মানুষের প্রধান্য ভোজ্য তেল। এখন বাজারে সর্ষের তেল, রিফাইন তেল-সহ নানা ধরেনের তেল পাওয়া যায়। এই সব তেল মানুষ কিনে আনেন। এর জন্য কচড়ার ব্যবহার কমেছে ঠিকই। কিন্তু বন্ধ হয়ে যায়নি। কিনে আনেন। এর জন্য কচড়ার ব্যবহার কমেছে ঠিকই। কিন্তু বন্ধ হয়ে যায়নি।'
আরও এক আদিবাসী লক্ষ্মীমণি কিন্তুর কথায়, 'মহুয়া ফল কুড়িয়ে আনা থেকে শুরু করে বীজ পরিষ্কার করা পর্যন্ত বেশির ভাগ কাজ মহিলারা করেন। এই বীজ থেকে তেল পাওয়ার আগে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। পরিবারের সবাই মিলে কাজ করলে তবেই তেল বের করা সম্ভব হয়।' শালবনির রঞ্জা গ্রামের সন্ধ্যা মাহাতো বলেন, 'অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল পরিবারের কাছে এই তেল এখনও গুরুত্বপূর্ণ। বাজার থেকে তেল কিনতে খরচ হয়। কিন্তু এলাকায় প্রচুর মহুল গাছ থাকায় সহজে ফল সংগ্রহ করে নিজেরাই তেল তৈরি করলে খরচ বাঁচে। তাই এখনও অনেক পরিবার এই কচড়া তেল বাড়িতে ব্যবহার করেন।' একই বক্তব্য বিজলি মাহাতো, সুষমা মাহাতোর।
গ্রামবাসীদের দাবি, মহুয়া ফল শুধু তেলের উৎস নয়, জঙ্গলমহলের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রারও একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। মহুয়া ফুল থেকে খাদ্যদ্রব্য ও পানীয় তৈরি হয়, আবার ফলের বীজ থেকে মেলে তেল। ফলে মহুয়া গাছকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি স্বনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতি। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, একসময়ে প্রায় প্রতিটি আদিবাসী পরিবার মহুয়া ফল সংগ্রহ করত। বর্তমানে বনাঞ্চল কমে যাওয়া এবং বাজারজাত ভোজ্যতেল সহজলভ্য হওয়ার কারণে এই প্রথার পরিধি কিছুটা কমেছে। তবুও জঙ্গলমহলের বহু গ্রামে এখনও মহুলতলায় ভোরবেলা ফল কুড়ানোর দৃশ্য দেখা যায়। পিড়াকাটার সরস্বতী মাহাতো বলেন, 'এই তেল দেখতে ও স্বাদে অনেকটা সর্ষের তেলের মতো। এই তেল দিয়ে রান্না করা খাবারের স্বাদে কোনও পরিবর্তন হয় না। এই তেল খাওয়ার পাশাপাশি গায়েও মাখা যায়। কথিত আছে, এই তেল ব্যথা-বেদনার স্থানে মালিশ করলে আরাম পাওয়া যায়।'
অনেকেই মনে করেন, এই ঐতিহ্য শুধু খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে জড়িত নয়, বরং স্থানীয় জনজাতি সমাজের শ্রম ও বননির্ভর জীবনধারারও প্রতিফলন। জঙ্গলমহলের বহু মানুষের কাছে কচড়া তেল শুধুমাত্র একটি ভোজ্য তেল নয়, বরং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এক অমূল্য সংস্কৃতি।