ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে বিরোধীরা বেশি আসন পেলেও তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষমতা ছাড়তে নাও হতে পারে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারকে। নতুন সরকার গঠনে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। এ সময়ে তেহরানের সঙ্গে নতুন করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের হাতেই থাকতে পারে। ইউরোনিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ফেলো ইয়োসি মেকেলবার্গ।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ইসরায়েলিরা ভোট দেওয়ার সময় তিনি বলেন, নির্বাচনের পরদিনই দেশটিতে নতুন সরকার গঠিত হবে না। ফলে অন্তর্বর্তী সরকার উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা ধরে রাখবে, যার মধ্যে সামরিক অভিযান অনুমোদনের ক্ষমতাও রয়েছে। এতে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর এটিই ইসরায়েলের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। ওই হামলার পর প্রায় তিন বছর ধরে যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং হামলার আগে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার জবাবদিহির দাবি দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এ নির্বাচনকে গণভোটের মতো দেখা হচ্ছে। তবে সর্বশেষ জনমত জরিপগুলোতে ইঙ্গিত মিলেছে, নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন জোট কিংবা সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট কোনোটিই ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেনি।
ফলে বিরোধীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলেও সরকার গঠনের আলোচনা দীর্ঘায়িত হতে পারে। এ সময় নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থেকে যেতে পারেন।
ইসরায়েলের নির্বাচন শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পর, ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে জল্পনাও চলছে।
মেকেলবার্গের মতে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে সংঘাত শুরুর সময় নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে। ইসরায়েলের নির্বাচন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এ দুই নির্বাচনের ফলাফল ইরানে যুদ্ধ আবার শুরু হবে কি না, তা নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি মনে করেন, বিরোধীদের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তির ওপর ইসরায়েলের নির্ভরতা পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক স্বার্থ ভবিষ্যতের সামরিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
মেকেলবার্গ বলেন, নেতানিয়াহুর প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তার নীতির সঙ্গে দুর্নীতির বিচার এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার বিষয়টি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ইরানকে ঘিরে নতুন সংকট তৈরি করার সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইসরায়েলে সরকার পরিবর্তন হলে গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও প্রতিবেশী লেবাননের বিষয়ে দেশটির নীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। মেকেলবার্গের ধারণা, বিরোধীদের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে গাজা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্যোগে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা এবং লেবাননের সঙ্গে নিরাপত্তাবিষয়ক সমঝোতা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে নতুন জোটে কোন দলগুলো থাকবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো সরকারে যুক্ত হবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর বিষয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য থাকলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারির ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের অবস্থানে বিভেদ রয়েছে।
মেকেলবার্গ সতর্ক করে বলেন, দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান রাতারাতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তবে দখলদারির পরিস্থিতি শিথিল করা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
নতুন সরকার এসব মতপার্থক্য কতটা সমাধান করতে পারবে, তার ওপরই আঞ্চলিক নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নির্ভর করবে।
সূত্র : ইউরো নিউজ
