বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে মব সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা এখনও বিরাজমান। আঞ্চলিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মব সৃষ্টি করা হয়। কখনও তা চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। মবের দাপট অতীতের তুলনায় কিছুটা কমলেও পুরোপুরি এই ধারা থামানো যায়নি। কোথাও ছোট ছোট ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় বিশৃঙ্খল অবস্থা।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে মব তৈরি হয় খুবই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। প্রতিবেশীর সঙ্গে, আত্মীয়ের সঙ্গে বিবাদ-বিশৃঙ্খলা, ব্যবসায়ী, দোকানি ইত্যাদি যেকোনো কর্মকাণ্ডে তৈরি হয় মব। মানবাধিকারবিষয়ক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট অর্থাৎ প্রথম ৮ মাসেই মবের কারণে ১৫৪ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জানুয়ারি মাসেই ২৯টি ঘটনায় ২১ জন নিহত হয়। এর মাধ্যমেই বোঝা যায় মব সহিংসতা কোনো তুচ্ছ ঘটনা নয়, এটি মূলত আইনের শাসনের জন্য এক মারাত্মক হুমকির নাম। মব সহিংসতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এখানে প্রশাসনিকভাবে বিচার কার্যক্রম না করে জনগণ নিজের হাতে আইন তুলে নেয়। একটি রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সুষ্ঠু বিচারের নিশ্চয়তা দেওয়া। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্ত বলা যায় না। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে, সাংবিধানিক আইন অনুযায়ী বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু মব সহিংসতার ক্ষেত্রে এসব আইন উপেক্ষিত হয়। এ ধরনের সহিংসতা কেবল একজন ব্যক্তির ওপর প্রভাব ফেলে না, এটি পুরো একটি জাতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। মব প্রতিরোধে সর্বপ্রথম মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। সুষ্ঠু আইন প্রণয়ন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা থাকলে মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেবে না। কোনো ব্যক্তি অপরাধী হিসেবে অভিযোগ উঠলে তাকে যত দ্রুত সম্ভব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সোপর্দ করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো স্থানে যদি কেউ মব সৃষ্টি করে তাহলে তার রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক প্রভাব বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও অপতথ্যের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে এবং এসব প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সর্বোপরি বলা যায়, মব নির্মূল কেবল প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার কাজ নয়, সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের দায়িত্ব সম্মিলিতভাবে মব সংস্কৃতি দমন করা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতে প্রশাসনকে সহায়তা করা।
রাখি আক্তার : শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা
