দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য হারাচ্ছে খাতুনগঞ্জ
ছবি সংগৃহীত
একসময় দেশের নিত্যপণ্যের বাণিজ্যে যার ছিল একচ্ছত্র প্রভাব, সেই চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাতুনগঞ্জ আজ হারাতে বসেছে তার চিরচেনা বাণিজ্যিক জৌলুস। দুই শতাব্দীর বেশি পুরোনো এই বাজারে চাল, ডাল, গম, চিনি ও ভোজ্যতেলের ব্যবসা মূলত আড়তদারদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সময়ের আবর্তে বদলে গেছে পুরো বাজারের কাঠামো। বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ আস্থার সংকটের সঙ্গে এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে অবৈধ ও চোরাই পণ্য এবং ব্যাংকগুলোয় ডলারের দরের চরম বৈষম্য। ফলে সময়ের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন খাতুনগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ব্যবসায়ীরা।
এই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে নিত্যপণ্যের আমদানির পরিসংখ্যানেও। চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশের বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ বহুগুণ বাড়লেও আমদানিতে ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ীদের আপেক্ষিক অংশীদারি কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় অর্ধেকে। ২০০২-০৩ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চাল, ডাল, গম, সয়াবিন তেল, পাম তেল ও চিনি—এই প্রধান ছয়টি নিত্যপণ্যের মোট আমদানি ছিল প্রায় ২০ লাখ টন। এর মধ্যে ১২ লাখ টন বা ৬২ শতাংশই এনেছিলেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসব পণ্যের মোট আমদানি প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে ৯৬ লাখ টনে পৌঁছায়। এই সময়ে পরিমাণের হিসাবে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের আমদানি ১২ লাখ টন থেকে বেড়ে ৩২ লাখ টন হলেও বাজারে তাদের মোট অংশীদারি ৬২ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে মাত্র ৩৩ শতাংশে।
আমদানির পরিমাণ বাড়লেও বাজারে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের অংশীদারি কমে যাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ নিত্যপণ্যের ব্যবসার ধরনে পরিবর্তন। খাতুনগঞ্জের বাণিজ্যের অন্যতম শক্তি ছিল বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করে আড়তের মাধ্যমে সারা দেশে সরবরাহ করা। তবে সময়ের সঙ্গে এই ব্যবসার ধরন বদলেছে। আশির দশকের মাঝামাঝি চট্টগ্রামে বড় ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানা গড়ে উঠতে শুরু করে। নব্বইয়ের দশকে এ খাতে বিনিয়োগ করে ১২টি প্রতিষ্ঠান। পরবর্তী সময়ে ঢাকাকেন্দ্রিক মেঘনা ও সিটি গ্রুপ পরিশোধনের পাশাপাশি মৌলিক শিল্পেও বিনিয়োগ বাড়ায়। চিনি, আটা-ময়দাসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের উৎপাদনে গড়ে তোলে কারখানা। প্রায় দুই দশক আগে ঢাকায় কারখানা স্থাপন করে টি কে গ্রুপও।
ব্যবসায়ীদের মতে, রাজধানী ও আশপাশে বড় ভোক্তাবাজার থাকায় সেখানে উৎপাদন ও পণ্য বিতরণের সুবিধা বেশি। পাশাপাশি বাড়ছে প্যাকেটজাত পণ্যের বাজার। ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, নিত্যপণ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এখন প্যাকেটজাত অবস্থায় বিক্রি হয়। সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি। ফলে খোলা পণ্যের বেচাকেনা কমছে, যা দীর্ঘদিন ধরে খাতুনগঞ্জের ব্যবসার অন্যতম ভিত্তি ছিল। উৎপাদন ও প্যাকেটজাত পণ্যের বাজার সমপ্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে আমদানি করা পণ্য সরাসরি কারখানা ও বিতরণব্যবস্থার মাধ্যমে বাজারজাত করার সুযোগও বাড়ছে। এতে ঐতিহ্যগতভাবে আড়তনির্ভর খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়িক কাঠামো চাপে পড়ছে।
আমদানির পরিসংখ্যানেও ব্যবসার ধরনে পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে দেশে মোট ১ কোটি ৪১ লাখ টন ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়েছে, যার মূল্য ৭০৫ কোটি ডলার। এসব পণ্য আমদানি করেছে ৪১৮টি প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ, আমদানির পরিমাণ বড় হলেও ব্যবসাটি সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যেও এই পরিবর্তনের চিত্র স্কষ্ট। চট্টগ্রামভিত্তিক আবুল খায়ের গ্রুপের মালিকানাধীন স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস ২০২৫ সালে প্রায় ৬৯ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের ভোগ্যপণ্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে ছিল ভোজ্যতেল, গম ও ডাল। অন্যদিকে ২০২৪ সালে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে শীর্ষ পর্যায়ে থাকা এস আলম গ্রুপ ২০২৫ সালে আলোচ্য পণ্যগুলো নতুন করে আমদানি করেনি।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি মাহবুবুল আলমের নেতৃত্বাধীন ডেল্টা এগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজও বড় আমদানিকারক হিসেবে উঠে এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২৮ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা নারায়ণগঞ্জে।
এসব তথ্য থেকে দেখা যায়, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের একটি অংশ এখনো বড় পরিসরে ভোগ্যপণ্য আমদানি করছে। তবে আমদানি করা পণ্যের ব্যবসা আগের মতো খাতুনগঞ্জের আড়তকেন্দ্রিক থাকছে না। বরং উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেটজাত পণ্যের বাজার সমপ্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসার কেন্দ্রও সরে যাচ্ছে নতুন শিল্পাঞ্চল ও ভোক্তাবাজারের কাছাকাছি। ফলে দেশের ভোগ্যপণ্যের বাণিজ্যে চট্টগ্রামের ভূমিকা থাকলেও খাতুনগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ব্যবসায়িক কাঠামো ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে।
বাজারের এই কাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আরেকটি বড় কারণ পরিবহন ব্যয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ওজনসীমা কার্যকরের কারণে ট্রাকপ্রতি পণ্য পরিবহনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় প্রতি টনে খরচ বাড়ছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। তারা বলেন, একই ভাড়ায় অন্য অনেক রুটে যে পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা যায়, চট্টগ্রাম থেকে তা সম্ভব হয় না। ফলে প্রতি টন পণ্যের পরিবহন খরচ বেড়ে যায়।
খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্কাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, সীতাকুণ্ড ও কুমিল্লায় স্থাপন করা ওজন স্কেলের কারণে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা ট্রাকে একসঙ্গে ১৩ টনের বেশি পণ্য পরিবহন করতে পারেন না। এতে পণ্য পরিবহনের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং অন্য অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তারা অসুবিধায় পড়েন। বাড়তি ব্যয় এড়াতে কিছু আমদানিকারক চট্টগ্রাম বন্দর থেকে লাইটার জাহাজে সরাসরি নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ কিংবা যশোরের নওয়াপাড়ায় পণ্য পাঠাচ্ছেন। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি হওয়া পণ্যের একটি অংশ খাতুনগঞ্জে না এসে সরাসরি অন্য পাইকারি বাজারে চলে যাচ্ছে। এতে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা শুধু পরিবহন ব্যয়ের
চাপেই পড়ছেন না, তাদের ঐতিহ্যবাহী বাজারে পণ্য কেনাবেচার সুযোগও কমছে।
পরিবহন ব্যয় ও বাজারের কাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়িক পরিবেশে দীর্ঘদিনের আস্থার সংকটও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশির দশক থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার বাণিজ্য বাড়তে থাকলে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়িক লেনদেনও সমপ্রসারিত হয়। আমদানি করা পণ্যের পাশাপাশি জমজমাট হয়ে ওঠে ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) বেচাকেনা। সে সময় কাগজভিত্তিক লেনদেনে ব্যবসায়ীদের পারস্করিক বিশ্বাস ও আস্থাই ছিল বড় মূলধন। লিখিত চুক্তি ছাড়াই অনেক ক্ষেত্রে শুধু মৌখিক প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে লেনদেন হতো। তবে ধারাবাহিক প্রতারণার ঘটনায় সেই আস্থার জায়গাটি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ব্যবসায়ীদের সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে খাতুনগঞ্জে প্রথম আর্থিক প্রতারণার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। ২০১৯ সাল পর্যন্ত সেখানে এ ধরনের ৬৮টি ঘটনা সামনে আসে। সামপ্রতিক সময়েও প্রতারণার অভিযোগ উঠছে। চলতি বছর প্রায় আট কোটি টাকা পাওনা রেখে এক ব্যবসায়ী গা-ঢাকা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের আবু বক্কর বলেন, ব্যবসায়ীদের মধ্যে পারস্করিক বিশ্বাস আগের অবস্থায় নেই।
আস্থার সংকটের পাশাপাশি এখন বৈধ আমদানিকারকদের জন্য নতুন চাপ তৈরি করছে সীমান্ত দিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পণ্য প্রবেশ এবং ব্যাংকভেদে ডলারের দরের পার্থক্য। এসব কারণে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সহ-অর্থ সম্কাদক মীর মোহাম্মদ সাজ্জাদ উল্লাহ বলেন, সামপ্রতিক সময়ে আমাদের ব্যবসার সবচেয়ে বড় ক্ষতি করছে সীমান্ত দিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আসা অবৈধ ও চোরাই পণ্য। শুল্ক ও কর দিয়ে আমরা যারা বৈধভাবে পণ্য আমদানি করছি, তাদের তুলনায় এসব চোরাই পণ্য অনেক কম দামে বাজারে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। ফলে নিয়ম মেনে ব্যবসা করা বৈধ আমদানিকারকেরা বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়ছেন এবং প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ছেন।
চোরাই পণ্যের কারণে বৈধ আমদানিকারকদের ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, ডলারের দরের বৈষম্য তা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। এ বিষয়ে মীর মোহাম্মদ সাজ্জাদ উল্লাহ বলেন, একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোতে ডলারের দরের চরম অসমতা বাজারে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে। সব ব্যাংকে ডলারের দাম এক রকম না থাকায় এলসি (ঋণপত্র) খোলার খরচে বড় পার্থক্য দেখা দিচ্ছে। বড় ও প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীগুলো তুলনামূলক কম দরে ডলার পেলেও আমাদের মতো মাঝারি ও ছোট আমদানিকারকদের চড়া দামে ডলার কিনতে হচ্ছে। ফলে সমপরিমাণ পণ্য এনেও খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের ক্রয় ও সরবরাহ খরচ বেশি পড়ে যাচ্ছে, যা বাজারে চরম বৈষম্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের এই সংকটের পেছনে বাজারব্যবস্থার পরিবর্তন, ব্যবসায়িক অনিয়ম এবং প্রতিযোগিতার পরিবেশে অসমতার বিষয়গুলো উঠে এসেছে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতির বক্তব্যেও।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, গত ২০ বছরে খাতুনগঞ্জে অনেক ব্যবসায়ী টিকে থাকতে পারেননি। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করা এবং ব্যবসার নামে লুটপাটের কারণে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ঐতিহ্যবাহী এই বাজারও হারিয়েছে আগের জৌলুস।
তিনি বলেন, আগে আমদানিতে লাইসেন্স প্রথা থাকায় কেবল লাইসেন্সধারীরাই অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে পণ্য বিক্রি করতেন। সেই ব্যবস্থা উঠে যাওয়ার পর যে কেউ আমদানি করার সুযোগ পেয়েছেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আমদানিকারক বাড়ায় খাতুনগঞ্জের অংশ কমেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, খাতুনগঞ্জের বাণিজ্য একদম বন্ধ হয়ে যায়নি; তবে বদলে যাওয়া আধুনিক বাজারব্যবস্থা, চোরাই পণ্যের দৌরাত্ম্য ও অস্থিতিশীল ডলার বাজারের মুখে টিকে থাকার লড়াইটা এখন বেশ কঠিন। নীতি সহায়তা, সীমান্ত শিথিলতা রোধ এবং সমতাভিত্তিক ব্যাংক সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা নিজেদের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ সক্ষমতা না বাড়ালে ঐতিহ্যবাহী এই বাজারের পুরোনো গৌরব ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
