ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এরশাদ হালিমের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগে গঠিত ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়ে স্থায়ী বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের দাবি।
গত জুনে ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সেপ্টেম্বরে সিদ্ধান্তের আশ্বাস দিয়েও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেনি।
মামলার অন্যতম সাক্ষী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিয়া শ্রাবনের অভিযোগ, অধ্যাপক এরশাদ হালিম ফেসবুকে তাকে ও ভুক্তভোগীকে নিয়ে নিয়মিত মিথ্যা অভিযোগ ও অপপ্রচার চালাচ্ছেন। এতে ভুক্তভোগী আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
পুলিশি তদন্ত, ফরেনসিক ও মেডিকেল প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন নথিতে তাদের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি। এরপরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই শিক্ষার্থী।
শাহরিয়া শ্রাবন বলেন, ‘তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে এবং এরশাদ হালিমকে স্থায়ী বহিষ্কারের সুপারিশ করেছে। তাহলে এত তালবাহানা কেন? নাকি দেরি করে অপরাধীকে বাচিয়ে দেওয়ার কোনো অপচেষ্টা চলছে?’
তবে তার এসব অভিযোগের বিষয়ে অধ্যাপক এরশাদ হালিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
সেপ্টেম্বরে সিদ্ধান্তের আশ্বাস, এখন কী অবস্থা
গত ৯ সেপ্টেম্বর কালবেলায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব শেখ আইয়ুব আলী জানিয়েছিলেন, চলতি সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। এর আগে ১ সেপ্টেম্বর অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, ‘হয়ে যাবে, এই মাসের মধ্যেই হয়ে যাবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘এটা কোনো মাস দিয়ে হয় না। দিনক্ষণ দিয়ে ঈদ হয়। তদন্ত কমিটি তাদের গতিতে চলে। আইয়ুব আলী ডেপুটি রেজিস্ট্রার। তার রেফারেন্সে উপাচার্যকে চার্জ করলে হবে না।’
তদন্তের সুপারিশের পরও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেন নয়
অধ্যাপক এরশাদ হালিমের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখে। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অভিযোগ তদন্তে বিভাগীয় কমিটির প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কাছে জমা হয়েছে এবং আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার পর বিষয়টি অধিকতর পর্যালোচনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন সেলে পাঠানো হয়েছে।
পরে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়ে ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর সিন্ডিকেট সভায় অধ্যাপক এরশাদ হালিমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অভিযোগের বিষয়ে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দিতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের কথাও জানায় বিশ্ববিদ্যালয়।
চলতি বছরের ২২ জুনের সিন্ডিকেট সভায় তদন্ত প্রতিবেদন অনুমোদনের পর অধ্যাপক এরশাদ হালিমকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করার সুপারিশের বিষয়টি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এরপর বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
মামলা ও ফরেনসিক প্রতিবেদন ঘিরেও আলোচনা
অভিযোগের ঘটনায় মিরপুর মডেল থানায় করা মামলায় ২০২৫ সালের নভেম্বরে অধ্যাপক এরশাদ হালিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। মামলার তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্রও জমা দেয় বলে এর আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন।
মামলার অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভিডিও ও স্থিরচিত্র সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। সেসব ভিডিও ও স্থিরচিত্রে সম্পাদনার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে পুলিশের চার্জশিটে দাবি করা হয়।
ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের উদ্বেগ
শাহরিয়া শ্রাবনের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় ভুক্তভোগী মানসিকভাবে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে তার দাবি।
এ অবস্থায় ট্রাইব্যুনালের বর্তমান অবস্থা, সিদ্ধান্তে বিলম্বের কারণ, বাকি প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য নিষ্পত্তির সময়সীমা প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা। তাদের প্রত্যাশা, প্রশাসন শুধু আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে অভিযোগের বিষয়ে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবে।
