বিদেশি বিনিয়োগ একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এর গুরুত্ব আরও বেশি। কিন্তু নানা উদ্যোগের পরও দেশে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে না। বরং বিদ্যমান বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এটি একদিকে দেশের ব্যবসায়িক সম্ভাবনার প্রতি পুরনো বিনিয়োগকারীদের আস্থার ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে দুর্বলতার চিত্রও তুলে ধরে। অর্থনীতিকে গতিশীল করতে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে নিট বিদেশি বিনিয়োগ আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। বিপরীতে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ বেড়েছে। অর্থাৎ আগে থেকে ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণে আগ্রহ দেখালেও নতুন বিদেশি পুঁজি আকর্ষণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি নেই। পুনর্বিনিয়োগ ইতিবাচক হলেও তা নতুন বিনিয়োগের বিকল্প হতে পারে না। নতুন বিনিয়োগ এলে শিল্পকারখানা স্থাপন, প্রযুক্তির প্রসার, রপ্তানি বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের বিনিয়োগ আকর্ষণের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয়, বৃহৎ ভোক্তাবাজার এবং উৎপাদন খাতে সম্প্রসারণের সুযোগ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে পারে। কিন্তু এসব সুবিধা কাজে লাগাতে প্রয়োজন স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ, শিল্পকারখানার নিরাপত্তা এবং গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অভাব বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। এর সঙ্গে প্রশাসনিক জটিলতা ও নীতির ধারাবাহিকতার অভাব যুক্ত হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু মুনাফার সম্ভাবনা বিবেচনা করেন না, তারা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা পরিচালনার নিশ্চয়তাও চান। কারখানা স্থাপনের পর উৎপাদন সচল রাখা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া এবং বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফা নির্বিঘ্নে স্থানান্তরের সুযোগ তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা থাকলে কর-সুবিধা বা বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচার-প্রচারণা খুব বেশি কাজে আসে না। তাই বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন কিংবা নতুন বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণার পাশাপাশি বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধানে মনোযোগ দিতে হবে।
এজন্য প্রথমেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং শিল্পকারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। বিনিয়োগসংক্রান্ত অনুমোদন ও সরকারি সেবা সহজ করতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস কার্যকর করা জরুরি। বিভিন্ন দপ্তরের দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতা দূর করে নির্ধারিত সময়ে সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং কর ও বাণিজ্যনীতিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। এসব পদক্ষেপ বিনিয়োগের ব্যয় ও ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি ব্যবসায়িক আস্থা বাড়াবে।
বিদ্যমান বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিনিয়োগ বৃদ্ধিকেও কাজে লাগাতে হবে। তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের পথে বাধা দূর করা গেলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়তে পারে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সহায়ক হবে। তবে এক্ষেত্রে শুধু পুরনো বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভর না করে নতুন বিদেশি পুঁজি আনতে সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ঘোষিত বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো শুধু একটি অর্থনৈতিক লক্ষ্য নয়, দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যতের সঙ্গেও এটি সম্পর্কিত। তাই পুনর্বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধিতে সন্তুষ্ট না থেকে নতুন বিনিয়োগের পথ সুগম করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কথার চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ নতুন বিদেশি পুঁজি আকর্ষণে সক্ষম হবে।
