সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের কাছে হলফনামা জমা দিতে হবে। নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ প্রমাণ করতে দুই শিবিরই নথিপত্র প্রস্তুত করেছে। কিন্তু সোমবার সকালে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা তথা তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ শিবিরের নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করলেন, সড়কপথে দিল্লিতে হলফনামা নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁদের ট্রাকে হামলা হয়েছে। নথিপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে দুষ্কৃতীরা। গোটা ঘটনার নেপথ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়পন্থী কালীঘাট শিবিরের হাত রয়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
ঋতব্রতের দাবি, কালীঘাট শিবিরের হলফনামা চার্টার্ড ফ্লাইটে করে রবিবার সন্ধ্যায় দিল্লি পৌঁছে গিয়েছে। কিন্তু তাঁর শিবিরের আর্থিক সঙ্গতি নেই। তাই সড়কপথে হলফনামা পাঠানো হয়েছিল। সোমবার ভোর সাড়ে ৩টে নাগাদ সেই ট্রাকে হামলা হয়। সমাজমাধ্যমে ভোর ৪টে নাগাদ ঋতব্রত লিখেছেন, ‘‘কালীঘাটের হলফনামা চার্টার্ড ফ্লাইটে করে ২৫ তারিখ সন্ধ্যাবেলা দিল্লি পৌঁছে গিয়েছে। আমাদের হলফনামা দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সড়কপথে। শনিবার সকালে কমিশনের দফতরে জমা দেওয়ার জন্য আমাদের কর্মীরা নথিপত্র নিয়ে রওনা দিয়েছিলেন। আধঘণ্টা আগে ওই ট্রাকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার এবং আমাদের নথিপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হল। আমাদের কর্মীরা বাধা দিয়েছেন। লড়াই জারি আছে। চার্টার্ড সংস্কৃতি এবং তৃণমূল স্তরের সংকল্পের মধ্যে এই লড়াই। স্বৈরাচারীরা সব জায়গায় সুসংগঠিত লুটপাটের চেষ্টা চালাচ্ছে। এই অপচেষ্টা সফল হবে না।’’
ঋতব্রতদের অভিযোগ মানতেই চাননি মমতাপন্থী বিধায়ক কুণাল ঘোষ। তিনি বলেন, ‘‘তৃণমূল ট্রাকে হামলা করবে? পাগল নাকি? ওরাই তো পুলিশ দিয়ে সন্ত্রাস চালাচ্ছে।’’
উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনে হলফনামা জমা দেওয়া নিয়ে ঋতব্রত শিবিরের বিরুদ্ধে আগেই সরব হয়েছিল কালীঘাট। মমতাদের দাবি, ঋতব্রতদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য বিজেপির নির্দেশে কাজ করছে পুলিশ। স্ট্যাম্প পেপারে ঋত শিবিরের পক্ষে হলফনামায় জোর করে সই করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। হাজার হাজার স্ট্যাম্প পেপার বেআইনি ভাবে থানায় পাঠানোর নির্দেশ দিচ্ছেন খোদ জেলাশাসকেরা। এর বিরুদ্ধে গত ১৪ অক্টোবর রাজ্য পুলিশের ডিজি, আইজি, এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে চিঠি দিয়েছিল মমতা শিবির। ১৫ অক্টোবর চিঠি দেওয়া হয় মুখ্যসচিবকেও। অবিলম্বে এই প্রক্রিয়ায় রাশ না-টানলে পরবর্তীকালে আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।
রবিবার মমতা নিজে এ প্রসঙ্গে মুখ খোলেন। দাবি, বিজেপি ভয় দেখিয়ে এবং টাকা দিয়ে মানুষকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। জেলাশাসক, বিডিও, ওসি, পুলিশ সুপারদের দিয়ে সাধারণ মানুষকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। মমতার কথায়, ‘‘পুলিশের অত্যাচার চরমে পৌঁছেছে। কমিশন আমাদের নথিপত্র জমা দিতে বলেছে। কিন্তু আইনি কাগজপত্র, স্ট্যাম্প পেপার, হলফনামা সরকারই পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছে, যাতে আমাদের জন্য সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি, ব্যক্তিগত ভাবে কেউ আমার অফিসে আসতে চাইলেও আসতে দেওয়া হচ্ছে না। এটা কল্পনা করা যায়? আমরা কি আদৌ স্বাধীন? বিজেপি টাকার বিনিময়ে মানুষকে কিনছে। আমাদের কর্মী, বিধায়কদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, তৃণমূলে যোগ দিলে জেলে পাঠানো হবে। সাহস থাকলে রাজনৈতিক ভাবে লড়াই করে দেখাক।’’
মমতার ওই অভিযোগের পরেই সকালে ঋতব্রত নথি ছিনতাইয়ের চেষ্টার অভিযোগ তুললেন। তাঁর শিবিরের বিধায়ক আখরুজ্জামান বলেন, ‘‘আমাদের কাছে অর্থনৈতিক সঙ্গতি নেই। তাই আমরা সড়কপথে ট্রাকে করে হলফনামা পাঠাচ্ছিলাম। কিন্তু হরিয়ানা সীমান্তের কাছে আমাদের ট্রাক ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা হয়। আমাদের সন্দেহ, যে কালীঘাট তৃণমূলের প্রত্যক্ষ মদতে এই কাজ করা হয়েছে।’’
ঋতব্রতদের অভিযোগ প্রসঙ্গে কুণালের বক্তব্য, ‘‘এগুলো অবান্তর কথা। ওঁদের কর্মী নেই, সমর্থক নেই। সকলে জানেন, ওঁরা বিজেপির দালাল এবং শুভেন্দুর এজেন্ট। তাই ওঁরা পুলিশ দিয়ে কাজ করাচ্ছে। আমাদের কর্মী-সমর্থক, সাংসদ, বিধায়কেরা ফর্ম পূরণ করেছেন। ওঁরা তাতেও বাধা দিয়েছে।’’ তাঁর পাল্টা প্রশ্ন, ‘‘ঋতব্রতকে যখন বিরোধী দলনেতা করা হয়, জোর করে থানাপুলিশ লাগিয়ে কত জনকে দিয়ে সই করানো হয়েছিল, জিজ্ঞেস করুন। কটা সই পেয়েছে? থানাকে দিয়ে যে ফর্ম ভরিয়েছে, তার মধ্যে কটা আসল, কটা নকল তদন্ত দরকার। সব বেরিয়ে আসবে।’’
ঋতব্রতদের দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন মমতাপন্থী সাংসদ দোলা সেনও। তাঁর কথায়, ‘‘নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকাই হয়। সাধারণত মিথ্যে শুনলে আমার খুব রাগ হয়। কিন্তু এটা শুনে হাসি পাচ্ছে। সত্য, ন্যায় আর মানুষই শেষ কথা বলবে। মানুষই জবাব দিচ্ছে। যাদের ২১ জুলাইয়ের জমায়েত থেকে শুরু করে সর্বত্র নিজেদের সদস্য সংখ্যার প্রমাণ জোগাড় করতে পুলিশ-প্রশাসনের মুখাপেক্ষী হতে হয়, তাদের মানুষই শিক্ষা দেবে।’’
উল্লেখ্য, তৃণমূলের প্রতীক জোড়াফুল ‘ফ্রিজ়’ করেছে কমিশন। নিজেদের আসল তৃণমূল বলে প্রমাণ করতে হবে মমতা এবং ঋতব্রত শিবিরকে। সুপ্রিম কোর্ট গত ২৮ সেপ্টেম্বর জানিয়েছিল, চার সপ্তাহের মধ্যে দুই শিবিরকে কমিশনের দফতরে হলফনামা জমা দিতে হবে। তিন মাসের মধ্যে তৃণমূলের এই মামলায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।
