রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে টানা সড়ক অবরোধ, সংঘাত ও পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় জনজীবন ও স্থানীয় অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। টানা কর্মসূচির পাঁচ দিনের মতো সোমবারও সাজেক সড়কে অবরোধ পালন করা হয়েছে।
এদিকে সংকট নিরসনে প্রশাসনিক উদ্যোগ শুরু হলেও এর নেপথ্যে আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর আধিপত্য, জননিরাপত্তাহীনতা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকারসংক্রান্ত বিরোধ কতটা—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পাশাপাশি প্রশাসন আলোচনার উদ্যোগ নিলেও আন্দোলনকারীদের পক্ষে স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি না থাকায় স্থায়ী সমাধান নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয় প্রশাসনের মধ্যস্থতাকারী দল। এর আগে রোববার রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হেডম্যান-কারবারিদের সঙ্গে বৈঠকে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটিতে রয়েছেন- অ্যাডভোকেট ভবতোষ দেওয়ান, শান্তি বিজয় চাকমা ও কল্যাণমিত্র চাকমা। এতে প্রথমে সিএইচটি হেডম্যান অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জ্যোতির্ময় চাকমা কেরোলের নাম প্রস্তাব করা হলেও তার সম্পর্কে আপত্তি ওঠে। পরে লংগদুর হেডম্যান কল্যাণমিত্র চাকমাকে কমিটিতে চূড়ান্ত করা হয়।
খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া এবং রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ানও সংকট নিরসনের উদ্যোগে যুক্ত রয়েছেন। আলোচনার আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাঘাইছড়ির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে।
একই দিন দুপুরে সাজেকের গঙ্গারাম উজোবাজার এলাকা, যেখানে ২২ অক্টোবর অবরোধ চলাকালে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে, তা পরিদর্শন করেছেন সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া ও দীপেন দেওয়ানের নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের একটি প্রশাসনিক দল। এ সময় তারা সংকট নিরসনে স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
বাঘাইছড়ি উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মতবিনিময় সভা:
সোমবার বেলা ১১টায় তার কার্যালয়ে স্থানীয় হেডম্যান ও কারবারি এবং আন্দোলনকারীদের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী সদস্যদের মধ্যে আলোচনার আয়োজন করে বাঘাইছড়ির উপজেলা প্রশাসন; কিন্তু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময় সভায় মধ্যস্থতাকারী কমিটির তিন সদস্য, সাজেক থানার ওসি তোফাজ্জাল হোসেন, বাঘাইছড়ি থানার ওসি নাসির উদ্দিন মজুমদার কবির, সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমাসহ এলাকার কয়েকজন হেডম্যান ও কারবারি এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধি উপস্থিত হলেও আন্দোলনকারী দুটি সংগঠন ‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’ ও ‘সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন’-এর পক্ষে কেউ উপস্থিত হননি।
ফলে মূল বিষয়বস্তুর ওপর ফলপ্রসূ কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই এদিনের আলোচনা শেষ হয়েছে বলে জানান মধ্যস্থতাকারী দলের সদস্য শান্তি বিজয় চাকমা।
আন্দোলনকারীদের পক্ষে পাঠানো বার্তায় সাজেকের উজোবাজারে গিয়ে আলোচনায় বসার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে জানিয়ে পরবর্তী আলোচনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান বলেন, আন্দোলনকারী দুই সংগঠন সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের সভায় আহ্বান করা হয়েছিল; কিন্তু কী কারণে তারা এদিনের সভায় যোগ দেননি তা সঠিক কিছু জানা যায়নি। তা ছাড়া সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলটি সাজেকের উজোবাজার পরিদর্শনে গেছেন, সেখানে তারা সমস্যা সমাধানের বিষয়ে স্থানীয়দের মতামত নেবেন। তবে সভায় সাজেক থেকে কোনো হেডম্যান বা কারবারি উপস্থিত না থাকায় সংকটের স্থায়ী সমাধানে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সভায় সাজেকে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, এর সূত্রপাত, আন্দোলনকারীদের দাবি-দাওয়া এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। একই সঙ্গে সাজেকের পর্যটন খাত সচল রাখা, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য বজায় রাখা এবং পরিবহণসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে মতবিনিময় হয়।
এতে মধ্যস্থতাকারী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট ভবতোষ দেওয়ান বলেন, সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের নামে আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই সরকারি বেতনভুক্ত কারবারি নন, তাই তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানা নেই। তার অভিযোগ, একটি সশস্ত্র সংগঠন নিজেদের অবস্থান ও সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশে সাধারণ মানুষকে উসকে দিয়ে এ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
এ সময় বাঘাইছড়ি পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রহমত উল্লাহ খাজা বলেন, শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার বিষয়কে কেন্দ্র করে সাজেকে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আন্দোলনের মূল দাবি কী:
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে ২২ অক্টোবর থেকে তৃতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের উপস্থিতি বন্ধ করা এবং স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তাদের অভিযোগ, সশস্ত্র সদস্যদের কারণে বাসিন্দারা হুমকি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এছাড়া ২২ অক্টোবর শান্তিপূর্ণ অবরোধ চলাকালে নিরীহ জনগণের ওপর হামলার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, উজোবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং বাজার এলাকা থেকে সেনা ও পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার করা, হামলায় আহত ব্যক্তিদের সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যয় প্রশাসনকে বহন করা, সশস্ত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও জুলুম বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে গ্রেফতার, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তল্লাশি এবং হয়রানি বন্ধ করার দাবির বিষয়ও নিশ্চিত করেন সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা।
তিনি বলেন, তাদের পাঁচ দফা দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
তবে সাজেক থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন জানিয়েছেন, সাজেকের ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। তাই যেখানে কোনো মামলা হয়নি, সেখানে মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি ভিত্তিহীন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিজিবি, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল জোরদার রয়েছে।
নেপথ্যে আধিপত্য নিয়ে প্রশ্ন:
রাঙামাটির বাঘাইছড়ির সাজেকে চলমান অবরোধ ও সংঘাতের নেপথ্যে আঞ্চলিক দুই সংগঠন ইউপিডিএফ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের অভিযোগও সামনে এসেছে।
খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া রোববার (২৫ অক্টোবর) সাংবাদিকদের জানান, সাজেক আগে একটি আঞ্চলিক সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেখানে অন্য একটি সংগঠনের প্রবেশের পর বিরোধ বেড়েছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, একটি পক্ষ অন্য সংগঠনকে এলাকা থেকে সরানোর দাবি জানাচ্ছে। প্রশাসনের বিবেচনায় বিষয়টি শুধু অবরোধের নয়, বরং সশস্ত্র সংগঠনগুলোর উপস্থিতি ও নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
ক্ষতি পর্যটনেই সীমাবদ্ধ নয়:
অবরোধে সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় পর্যটক, পরিবহণ শ্রমিক, হোটেল-রিসোর্ট মালিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় আয়-রোজগারেও স্থবিরতা নেমেছে। সংঘাতের আশঙ্কা দীর্ঘায়িত হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।
সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সহ-সভাপতি রিন্টু চাকমা বলেন, সাজেক পর্যটন সড়কে তৃতীয় দফার টানা অবরোধের ফলে গত ৫ দিন ধরে পর্যটক যাচ্ছেন না সাজেকে। এতে রিসোর্ট-কটেজ এবং অন্যান্য খাতে প্রায় ২০-২৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। টানা অবরোধের কারণে সাজেক অচলে সেখানকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও খেটে খাওয়া মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেকে না খেয়ে দিনাতিপাত করছেন।
তিনি জানান, খাগড়াছড়ি জেলা সদর হতে মালবাহী ট্রাক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে না গেলে সাজেকের মানুষ খেতে পারে না। এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে সাজেকে। খেটে খাওয়া মানুষের কাজকর্ম নেই। পর্যটক না এলে সাজেকে কোনো আয়-উপার্জন নেই।
স্থায়ী সমাধানের পথ:
শুধু আলোচনা করে অবরোধ প্রত্যাহার করলেই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এ লক্ষ্যে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধে আইনসম্মত পদক্ষেপ, অভিযোগের বিচার, স্থানীয়দের নিরাপত্তা এবং সব পক্ষের অংশগ্রহণে নিয়মিত সংলাপ। পাশাপাশি জরুরি যান চলাচল নিশ্চিত করা ও ক্ষতিগ্রস্ত পর্যটন ব্যবসা পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নিতে হবে। সাজেকের সংকটের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে রাজনৈতিক অভিযোগের বাইরে গিয়ে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক তদন্তই এখন সবচেয়ে জরুরি।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের এলাকা পরিদর্শন:
অন্যদিকে সাজেক সংকটের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করতে সোমবার দুপুরে সাজেকের উজোবাজার সংঘর্ষের এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।
দলটিতে ছিলেন- পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবদুল ওয়াদুদ ভুঁইয়া এমপি, সাবেক পার্বত্যমন্ত্রী ও রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান, রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত, রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব ও খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো. মোরতোজা আলী খান।
এ সময় তারা উজোবাজারে স্থানীয় ও অবরোধকারীদের সঙ্গে কথা বলেন বলে জানা যায়।