মংলার আড়তে মাছওয়ালা যখন দুই বালতি থেকে দুই দরে কোরাল বিক্রি করেন, ক্রেতারা খুব একটা প্রশ্ন তোলেন না। একটি হয়তো মেঘনার মোহনা থেকে আসা, আরেকটি সরাসরি সাগর থেকে। দুটোই কোরাল, তবু দুটির স্বাদ ও দাম আলাদা। অথচ মৎস্যবিজ্ঞানের খাতা খুললে দেখা যাবে, দুটোই আসলে একই প্রাণী—Lates calcarifer। বাংলায় যাকে ভেটকি বা কোরাল বলা হয়। অস্ট্রেলিয়ায় তার নাম বারামুন্ডি, আর ইংরেজিতে এশিয়ান সিবাস (Asian seabass)।
পদ্মা-মেঘনা নদীর ভেটকি আর সাতক্ষীরা-খুলনা-বাগেরহাটের মোহনা লাগোয়া সমুদ্রের কোরাল—দুটোই মূলত একই মাছের দুই জীবন-পর্যায়ে, দুই ভৌগোলিক অবস্থানে ধরা পড়া নমুনা।
তাহলে পার্থক্য কোথায়
এই মাছ ইউরিহ্যালাইন স্বভাবের। অর্থাৎ মিঠাপানি আর লোনাপানি দুটোতেই এরা সমান স্বচ্ছন্দে বাঁচতে পারে। এদের জন্ম হয় সাগরের কাছাকাছি মোহনার নোনা জলে। পোনা অবস্থায় এরা স্রোতের উল্টো দিকে সাঁতরে নদীর গভীরে ঢোকে, মিঠাপানির খাল-বিলে গিয়ে বড় হয় এবং সেখানে বছরের পর বছর কাটায়। তারপর প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ডিম পাড়তে এরা আবার ফিরে যায় মোহনা বা সাগরের দিকে। জীববিজ্ঞানীরা একে বলেন ক্যাটাড্রোমাস জীবনচক্র। এটি স্যামন মাছের জীবনযাত্রার ঠিক উল্টো পিঠ, কারণ স্যামন মিঠাপানিতে জন্মে সাগরে বেড়ে ওঠে এবং ডিম পাড়তে আবার মিঠাপানিতে ফিরে আসে।
তাই পদ্মা-মেঘনা ‘নদীর ভেটকি’ আর সাতক্ষীরা-খুলনা-বাগেরহাটের মোহনা লাগোয়া ‘সমুদ্রের কোরাল’—দুটোই মূলত একই মাছের দুই জীবন-পর্যায়ে, দুই ভৌগোলিক অবস্থানে ধরা পড়া নমুনা। এদের প্রজাতি এক, শুধু ঠিকানা আলাদা।

স্বাদের যে ফারাক ক্রেতারা খুঁজে পান, তার একটি বড় কারণ পানির লবণাক্ততা ও খাদ্যাভ্যাস। যে মাছ বহুদিন নদীর মিঠাপানিতে ছোট মাছ বা চিংড়ি খেয়ে বড় হয়েছে, তার মাংসের গঠন একরকম হয়; আর যে মাছ মোহনা বা সাগরের কাছাকাছি জীবন কাটিয়েছে, তার স্বাদ হয় অন্য রকম।
ইলিশের বেলাও ঠিক একই যুক্তি খাটে—পদ্মার ইলিশ আর সাগরের ইলিশের স্বাদ কেন আলাদা, তার ব্যাখ্যাও লুকিয়ে আছে এই লবণাক্ততা আর অভিবাসনের দূরত্বে। তবে লবণাক্ততার তারতম্যে মাছে চর্বির পরিমাণ ঠিক কতটা বাড়ে বা কমে, সেই নির্দিষ্ট মাত্রাটা এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট গবেষণা দিয়ে প্রমাণ করা কঠিন। এটি এখনো পর্যবেক্ষণনির্ভর একটি ধারণা, চূড়ান্ত কোনো বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নয়।
যে মাছ বহুদিন নদীর মিঠাপানিতে ছোট মাছ বা চিংড়ি খেয়ে বড় হয়েছে, তার মাংসের গঠন একরকম হয়; আর যে মাছ মোহনা বা সাগরের কাছাকাছি জীবন কাটিয়েছে, তার স্বাদ হয় অন্য রকম।
আকারের ক্ষেত্রেও একটা পার্থক্য দেখা যায়। সাগর বা প্রশস্ত মোহনা থেকে ধরা পড়া কোরাল ৩-১৫ কেজি পর্যন্ত পূর্ণবয়স্ক আকারের হয়। কারণ, খোলা জলের বিশাল খাদ্যভান্ডার আর সাঁতরানোর বিস্তৃত পরিসর এদের দ্রুত বড় হতে সাহায্য করে। নদীর ভেটকি সাধারণত ছোট আকারেই বাজারে আসে, কারণ তখনো সেটি কিশোর বা মধ্যবয়সী দশায় থাকে। তবে ব্যতিক্রমও আছে—হাওর-বাঁওড়ের মতো বড় জলাশয়ে মাঝেমধ্যে বেশ বড়সড় ভেটকিও ধরা পড়ে।
এই মাছের একটি আশ্চর্য দিক হলো, বেশির ভাগ ভেটকি প্রথমে পুরুষ হিসেবেই পরিণত বয়সে পৌঁছায়। তারপর একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর এদের মধ্যকার বেশ কিছু মাছ লিঙ্গ বদলে স্ত্রী মাছে রূপান্তরিত হয়! বিশেষ করে জলাশয়ে স্ত্রী মাছের সংখ্যা কমে গেলে এই লিঙ্গ রূপান্তরের হার বেড়ে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় প্রোট্যান্ড্রাস হারমাফ্রোডিটিজম। প্রকৃতির এই অদ্ভুত কৌশল মূলত প্রজনন-ভারসাম্য টিকিয়ে রাখারই একটি দারুণ উপায়।

বাজারে নামেরও একটা ফাঁদ আছে। ‘কোরাল’ শব্দটি দিয়ে সব সময় ভেটকিকে বোঝায় না। ‘কৈ কোরাল’ নামে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মাছ রয়েছে, যার বৈজ্ঞানিক নাম Lobotes surinamensis। ভেটকির সঙ্গে এর দূরতম কোনো আত্মীয়তাও নেই। এর শরীর দুই পাশে চাপা এবং পোনা অবস্থায় এরা পানির ওপর এক দিকে কাত হয়ে ভাসে। তখন দেখতে অনেকটা ভাসমান শুকনো পাতার মতো লাগে বলে ইংরেজিতে এদের ডাকনাম লিফ ফিশ। মোহনায় এই মাছ প্রচুর ধরা পড়ে, আর নাম শুনে অনেকেই একে ভেটকির জাতভাই ভেবে বসেন।
কোরাল শব্দটি দিয়ে সব সময় ভেটকিকে বোঝায় না। কৈ কোরাল নামে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মাছ রয়েছে, যার বৈজ্ঞানিক নাম Lobotes surinamensis। ভেটকির সঙ্গে এর দূরতম কোনো আত্মীয়তাও নেই।
আসল ভেটকি বা কোরাল চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো, এদের নিচের চোয়াল ওপরের চোয়ালের চেয়ে একটু সামনের দিকে এগিয়ে থাকে, পিঠের দিকটা সবুজাভ ধূসর হয় এবং পেট হয় রুপালি চকচকে।
চাষের জগতে এই লবণ সহ্য করার ক্ষমতাই ভেটকিকে যেন সোনার ডিম পাড়া হাঁস বানিয়ে দিয়েছে। সাতক্ষীরা-খুলনা-বাগেরহাটের লোনাপানির ঘেরে চিংড়ির পাশাপাশি ভেটকি চাষ এখন বেশ লাভজনক একটি ব্যবসা। কারণ, একই জলাশয়ে এই দুটি প্রজাতি দিব্যি একসঙ্গে টিকে থাকতে পারে। রপ্তানির বাজারেও বারামুন্ডি নামে ইউরোপ আর মধ্যপ্রাচ্যে এর কদর দিন দিন বাড়ছে।
মাছওয়ালার কাছে অবশ্য এত জীববিজ্ঞানের হিসাব পৌঁছায় না। সে শুধু জানে, মেঘনার মাছ এক দামে বিক্রি হয় আর মোহনার মাছ বিক্রি হয় আরেক দরে। ক্রেতারাও পাতে তুলে স্বাদের পার্থক্যটা টের পান, কিন্তু তার পেছনের কারণ খুঁজতে যান না। অথচ একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, দুটোই একই মাছ, একই কঙ্কাল—শুধু যাত্রাপথে তাদের পানির ঠিকানাটা বদলে গেছে!
